Published : 15 Jun 2026, 01:41 PM
আজকের দিনে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাসের কারণে যে রোগগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা দিচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হল ‘ফ্যাটি লিভার’। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে লিভার বা যকৃতের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়।
সাধারণত লিভারে সামান্য চর্বি থাকা স্বাভাবিক, তবে এই চর্বির পরিমাণ যখন লিভারের মোট ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়, তখনই তাকে ‘ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ বলা হয়।
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে তা ধীরে ধীরে হেপাটাইটিস, সিরোসিস বা ‘লিভার ফেইলিওর’-এর মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
ফ্যাটি লিভারের প্রকারভেদ
হেপাটাইটিস সি, থাইরয়েড ও ডায়াবেটিসের মতো বিপাকীয় ব্যাধির কারণে ফ্যাটি লিভার হতে পারে। মূলত এই রোগকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এএফএলডি): অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা মদ্যপানের কারণে এই রোগ হয়। এর প্রধান চিকিৎসা হলো অ্যালকোহল সেবন পুরোপুরি বন্ধ করা। নয়তো এটি লিভার ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি): যারা মদ্যপান করেন না, মূলত অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ এবং অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে তাদের এই রোগ হয়। এর মূল চিকিৎসা হল, জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন।
ফ্যাটি লিভার নিরাময়ে আঁশের ভূমিকা
কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার একা ফ্যাটি লিভার ভালো করতে পারে না। তবে ওজন কমানো এবং শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি খাবারে পর্যাপ্ত ফাইবার বা আঁশ রাখলে লিভারের চর্বি দ্রুত কমে।
শস্য, ডাল, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও বীজ থেকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক অন্তত ৩০ গ্রাম আঁশ গ্রহণের লক্ষ্য রাখা উচিত।
এটি লিভারের এনজাইম (এএলটি এবং এএসটি)-এর মাত্রা কমায় এবং লিভারের চর্বি গলাতে সাহায্য করে।
আঁশ মূলত আমাদের হজমে সাহায্য করে এবং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মোকাবেলা করার মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দূর করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে:
ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো: যখন শরীর ইনসুলিনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খায়, তখন লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে থাকে। ওটস, মটরশুঁটি এবং বিভিন্ন ফলে থাকা ‘দ্রবণীয় আঁশ’ পরিপাকতন্ত্রে জেলের মতো তৈরি করে রক্তে শর্করা শোষণের গতি কমায়।
ফলে ইনসুলিনের মাত্রা হুট করে বাড়ে না। এই গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণ লিভারে সঞ্চিত চর্বি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। ‘ওট বিটা-গ্লুকান’ এবং ইসবগুলের ভুসি-র মতো আঁশ এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
চর্বি বিপাক বা ফ্যাট মেটাবলিজম: আঁশ সমৃদ্ধ খাবার লিভারকে দক্ষতার সঙ্গে চর্বি ভাঙতে ও তা ব্যবহার করতে সহায়তা করে। এছাড়া দ্রবণীয় আঁশ অন্ত্রে পিত্ত অ্যাসিডের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে শরীর থেকে কোলেস্টেরল বের করে দিতে সাহায্য করে। ফলে লিভারে নতুন করে চর্বি জমতে পারে না।
অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা: শাকসবজি বা লাল চালের ভাতে থাকা ‘অদ্রবণীয় আঁশ’ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা মাইক্রোবায়োমের খাদ্য জোগায়।
এই ব্যাকটেরিয়াগুলো ‘ফাইবার ফারমেন্টেইশনের’ মাধ্যমে ‘শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড’ তৈরি করে, যা লিভারের ভেতরের প্রদাহ কমাতে এবং কার্যকারিতা উন্নত করতে কার্যকর।
ফ্যাটি লিভারের জন্য সেরা ৩টি আঁশ-সমৃদ্ধ খাবার
বেরিজাতীয় খাবার: স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি এবং রাস্পবেরির মতো পুষ্টিগুণে ভরপুর ফলগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং আঁশে পরিপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বেরিতে থাকা পলিফেনল লিভারের ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও, এর উচ্চ আঁশ ধর্মী উপাদান অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড উৎপাদনে সহায়তা করে।
তিসি বা ফ্ল্যাক্সসিডস: আকারে ছোট হলেও শক্তিশালী এই তিসির বীজ আঁশ, লিগনান এবং ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডসে ভরপুর। এই শক্তিশালী বীজগুলো প্রদাহ কমিয়ে, লিভারের চর্বি ভাঙতে সাহায্য করে এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করার মাধ্যমে লিভারের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে।
এতে দ্রবণীয় আঁশ প্রচুর পরিমাণে থাকে। ওটসের ওপর ছিটিয়ে, স্মুদিতে মিশিয়ে কিংবা দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে অনায়াসে খাওয়া যায়।
ডালধর্মী শস্য: ডাল ধরনের শস্য আঁশ এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের একটি চমৎকার উৎস। আরও আকর্ষণীয় বিষয় হল, এতে থাকা আঁশটি ‘প্রিবায়োটিক’, অর্থাৎ এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ফলে প্রদাহ-বিরোধী উপজাতের উৎপাদন বাড়ে, যা লিভারের প্রদাহ এবং চর্বি জমা কমাতে সাহায্য করে।
দৈনিক আঁশ গ্রহণ বাড়ানোর উপায়
সকালের নাস্তা হোক আঁশ যুক্ত: বেরি ও গুঁড়া তিসি দিয়ে তৈরি ওটস দিয়ে সকালের নাস্তা করা উপকারী।
সহজ কিছু অদলবদল: সাদা ভাতের বদলে লাল চালের ভাত খাওয়া। বাজারে ‘রিফাইন’ বা প্রক্রিয়াজাত করা সাধারণ পাস্তা বা সাদা পাউরুটির পরিবর্তে ‘হোলমিল পাস্তা’ এবং বাদামি পাউরুটি নির্বাচন করুন।
খাবারে ডাল যোগ করা: নিয়মিত তরকারিতে মসুর ডাল মেশান। বিকেলের সালাদে সেদ্ধ ছোলা যোগ করা যেতে পারে। অথবা গরম গরম স্যুপ তৈরিতে ডাল ব্যবহার করাও যায়।
স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস: চিপস বা প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকসের পরিবর্তে খোসাসহ তাজা ফল বা এক মুঠ লবণবিহীন বাদাম বেছে নিন।
প্রতিটি খাবারে সবজি রাখা: দুপুরের ও রাতের খাবারে প্লেটের অর্ধেকটা শ্বেতসারবিহীন (নন-স্টার্চি) সবজি দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করতে হবে।
লেখক- পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
আরও পড়ুন