Published : 27 Jun 2026, 03:17 PM
ডনাল্ড ট্রাম্প আসলে ঠিক কেমন—তা অনুধাবন করতে এখনো অনেকেরই ঢের বাকি। তার প্রথম মেয়াদের শাসনামল মূল্যায়ন করতে গিয়ে অনেকেই তাকে একপ্রকার যুদ্ধবিরোধী প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। এই দাবির সপক্ষে তাদের প্রধান যুক্তি হলো—সেই চার বছরে ট্রাম্প নতুন করে কোনো দেশে হামলা করেননি। উপরন্তু, তার শান্তির ললিত বাণী অনেকের কানেই মধু বর্ষণ করেছে।
তবে এই সরলীকরণ ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ও চতুর পররাষ্ট্রনীতিকে আড়াল করতে পারে না। যারা তাকে পুরোপুরি যুদ্ধবিরোধী ভাবেন, তারা বিস্ময়করভাবে ভুলে যান যে, এই ট্রাম্পেরই প্রচ্ছন্ন ইন্ধনে ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে ড্রোন হামলায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও দশকের পর দশক ধরে চলা কূটনৈতিক সমঝোতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনিই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তার এই একক ও উসকানিমূলক সিদ্ধান্ত আরব বিশ্বে এবং সামগ্রিক ভূরাজনীতিতে নতুন করে যে তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছিল, তার আঁচ এখনো শেষ হয়নি। তাই ট্রাম্পের আপাত শান্তিবাদী অবয়বের আড়ালে যে চরম আগ্রাসী ও অস্থিতিশীল নীতি লুকিয়ে ছিল, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
ট্রাম্প-ভক্ত গোষ্ঠির অনেকে এখনো মনে করেন যে, ট্রাম্প আসলে ইসরায়েলকে বেকায়দায় ফেলার জন্যই ইরানে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় নেমেছেন; যে যুদ্ধে ফেব্রুয়ারির এক হামলাতেই ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে শতাধিক শিশুসহ ২০০ জনকে প্রাণ হারাতে হয়েছে; যে যুদ্ধে তিন হাজার বছরের পারস্য সভ্যতাকে এক রাতে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। যেন ইরান তার সামরিক শক্তি, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও রাষ্ট্রনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধকে নিজেদের অনুকূলে নেয়নি, ট্রাম্পের মতো এক বর্ণচোরা রাষ্ট্রনেতাই কৌশলে ইরানকে জিতিয়ে দিচ্ছেন। ট্রাম্প তার এই নাকানিচুবানিকেও বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করবেন সেইসব বিশ্বাসী ভক্তদের সামনে। প্রথমবার যখন প্রেসিডেন্ট হলেন তখন ট্রাম্পকে পুতিনের এজেন্ট মনে করা হতো। এই ট্রাম্পভক্তরা এবার তাকে ইরানের এজেন্ট বলে মনে করতে শুরু করেছেন হয়তো।
অন্ধ ট্রাম্পভক্ত গোষ্ঠির জন্য যে আরও কত বড় চমক অপেক্ষা করছিল, তা প্রকাশ পেল যখন ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে স্বয়ং ‘যীশু খ্রিস্টের’ আধুনিক রূপ হিসেবে হাজির করলেন। গত এপ্রিলে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি এমন এক অদ্ভুত পোস্ট করেন, যা দেখে চোখ কপালে ওঠার দশা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি সেই ছবিতে ট্রাম্পকে দেখা যায় যীশুর মতো শুভ্র সাদা পোশাকে এক অসুস্থ ব্যক্তির কপালে দীপ্তিময় হাত রেখে আশীর্বাদ করছেন—যা যীশুকে নিয়ে আঁকা প্রচলিত ঐতিহাসিক ছবিগুলোর হুবহু নকল। অথচ ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে ছিল স্ট্যাচু অব লিবার্টি আর আধুনিক যুদ্ধবিমান।
যীশুর রূপ ধরে মানুষকে ঠকাচ্ছেন ট্রাম্প। এই লোক ঠকানোর ব্যবসায় তার সহযোদ্ধা কট্টরপন্থী ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানরা, যারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ট্রাম্পের এই ধর্ম ব্যবসাকে চোখ বুজে সমর্থন দেয়। বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় ট্রাম্প পরে সেই ছবিটি সরিয়ে ফেলেন।
তবে এখনকার অনলাইনের যুগে চাইলেই কিছু মুছে ফেলা যায় না; বহু স্থানে তা অবিকৃতভাবে থেকে যায়। তিন দিন পর ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যমে আবার আরেকটি ছবি পোস্ট করেন যাতে দেখা যায়, যীশু খ্রিস্ট তার বাম কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। ট্রাম্প লিখেছেন, “গোঁড়া বামপন্থী উন্মাদরা এটা পছন্দ করবে না, কিন্তু আমি মনে করি এটা সুন্দর।” ট্রাম্পের সৌন্দর্যরুচি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম। ইতিপূর্বে একটি কৃত্রিম উপায়ে তৈরি ছবিতে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার স্ত্রী মিশেল ওবামাকে বানর আকারে উপস্থাপন করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাদা চামড়ার জাতীয়তাবাদী খ্রিস্টানদের বড় অংশ ট্রাম্পকে তাদের ধর্মীয় নেতা মনে করে—ধর্মীয় জীবনযাপনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক। আর্থিক দুর্নীতি, যৌন কেলেঙ্কারি, যুদ্ধাপরাধ ইত্যাদি সত্ত্বেও ট্রাম্প তাদের কাছে ঈশ্বর মনোনীত নেতা, কেননা দেশকে ধর্মীয় গোঁড়ামির পথে নিয়ে যেতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টায় যে গুলি চালানো হয়, এ সম্পর্কে ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের নেতা রেভারেন্ড ফ্রাঙ্কলিন গ্রাহাম বলেন, “যে বুলেটটা তার কানের মধ্য দিয়ে চলে যায়, সেটা তার মস্তিষ্কে ঢোকেনি এক মিলিমিটারের জন্য। তার মাথাটা ঘুরে গেছে শেষ সেকেন্ডে যখন গুলি ছোড়া হয়।” গ্রাহামের দৃঢ় বিশ্বাস, ”ঈশ্বর নিজ হাতে তার মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছেন।”
১ মিলিমিটার দূরত্ব ও ১ সেকেন্ডের ব্যবধানে যে ট্রাম্পকে ঈশ্বর নিজ হাতে রক্ষা করেছেন, তিনি ঈশ্বরের মনোনীত না হয়ে পারেন কি? তাকে এই যীশু সাজানোর কাজটা মৌলবাদী খ্রিস্টানরা অনেক দিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছে। হাস্যকর হলেও সত্য, তার মাঝে যীশুর পুনরাবির্ভাব দেখছেন ভক্তদের অনেকেই। তারা মাথায় এমন টুপি দেন, যাতে লেখা থাকে: ‘যীশু আমার ত্রাতা, ট্রাম্প আমার প্রেসিডেন্ট’। এছাড়াও একেবারে হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকেই তাকে ধর্মীয় ত্রাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে; কেননা সরকার যত বেশি দুর্নীতিবাজ ও রাষ্ট্রনেতা যত বেশি অনৈতিক হয়, তত বেশি ধর্মের মুখোশ পরা দরকার পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্টও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন; জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য প্রিয় ধর্মের চেয়ে ভালো উপায় আর কিছু নেই।
ট্রাম্পের এইসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ১০ এপ্রিল পোপ লিও তাই বলেছেন, “ঈশ্বর সংঘর্ষ সমর্থন করেন না। যে শান্তির বরপুত্র খ্রিস্টের শিষ্য, সে কখনো তাদের পক্ষে থাকতে পারে না যারা একসময় তলোয়ার ছুড়তো আর এখন বোমা মারে। সামরিক পদক্ষেপ কখনো স্বাধীনতা ও শান্তির ক্ষেত্র সৃষ্টি করে না; কেবল ধৈর্যশীল সহাবস্থান ও মানুষে মানুষে সংলাপেই তা আসতে পারে।”
ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে পোপের এই সমালোচনা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরান আক্রমণকে পবিত্র ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার প্রচারণার বিরুদ্ধে। ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ ব্যাপারে সবার চেয়ে এগিয়ে। এইরূপ অপচেষ্টার জবাবে পোপ তাই আরও লিখেছিলেন, “খ্রিস্টান প্রাচ্যের পবিত্র ভূমি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে উদ্ভট ও আমানবিক হিংস্রতা। তা অপবিত্র হচ্ছে যুদ্ধের অধর্ম ও বাণিজ্যের নৃশংসতা দিয়ে যা মানুষের জীবনকে ন্যূনতম মূল্য দেয় না, কেবল স্বার্থের বেদিতে বলি দেওয়া ছাড়া। কিন্তু দুর্বলের, শিশুর ও পরিবারের জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। নিরীহ মানুষের রক্তপাত কোনো কিছু দিয়েই বৈধ করা যাবে না।”
পোপের যৌক্তিক সমালোচনার জবাবে ডনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে নির্লজ্জভাবে নিজেকেই ‘যীশু খ্রিস্ট’ হিসেবে দাবি করে পোস্ট করতে শুরু করলেন, তা চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আরও দুর্ভাগ্যজনক হলো, তার এই ভণ্ডামিকে জায়েজ করতে একদল অন্ধ ধামাধরারও দেখা মিলল। ট্রাম্প পোপকে অপরাধের ব্যাপারে দুর্বলচিত্ত এবং পররাষ্ট্র বিষয়ে হতাশাজনক বলে মনে করেন; এমনকি তার অহংকার এতটাই যে, তিনি ভাবেন তার সমর্থন ছাড়া লিও পোপই হতে পারতেন না। তবে পোপ লিও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ভয়ে তিনি যুদ্ধবাজদের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকবেন না। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের এই কুরুচিপূর্ণ কৌশল কোনো সত্যিকার ধর্মপ্রাণ মানুষ কখনোই মেনে নিতে পারে না।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ আজ বিশ্বব্যাপী লুটেরা সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে গভীর গাঁটছড়া বেঁধে এগোচ্ছে, যার অন্যতম প্রধান প্রতিভূ ডনাল্ড ট্রাম্প। এই অপশক্তি পুরো বিশ্বকে নিজ নিজ ধর্মের রঙে রাঙাতে চায়। আপাতদৃষ্টিতে এরা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও, নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে কিন্তু সবাই একাট্টা। বিভিন্ন দেশে ধর্মপ্রীতির মোড়কে এরা আসলে এমন এক উন্মাদনা তৈরি করছে, যা যুদ্ধ-ব্যবসায়ীদের জন্য দারুণ অনুকূল।
এই মতাদর্শ সহমর্মিতা নয়—ঘৃণা প্রচার করে; উদারতা নয়—গোষ্ঠি সংকীর্ণতার চর্চা করে। ধর্মের মানবিক আত্মাকে বিসর্জন দিয়ে এরা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে পড়ে থাকে। সহাবস্থানের বদলে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা এবং সংলাপ-যুক্তি বাদ দিয়ে আক্রমণ ও যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের কল্পিত সত্য প্রতিষ্ঠাই এদের মূল লক্ষ্য। স্বভাবতই, এদের অভিন্ন শত্রু হলো মানুষের উদারতা, যুক্তি, সাম্য ও শাশ্বত মানবতা।
আলমগীর খান কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: [email protected]