পাউবো বলছে, মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ায় পানি সরতে পারছে না; আরও সময় লাগবে।
Published : 03 Sep 2024, 01:33 AM
টানা বৃষ্টি আর ভারতের উজান থেকে নেমে আসা বানের পানি বাড়িঘরে উঠতে শুরু করলে সেদিন পরিবার-পরিজন নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটতে শুরু করে ফেনীর মানুষজন; ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও সদর, দাগনভূঞা ও সোনাগাজী উপজেলার সেই পানি সরার কোনো লক্ষণ নেই।
অন্য চার উপজেলার আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষজন বাড়ির দিকে গেলেও সদর ও দাগনভূঞা উপজেলার বানভাসী মানুষ এখনও আশ্রয়কেন্দ্রেই চরম ভোগান্তি নিয়ে দিন পার করছেন। এর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগ।
ত্রাণের ওপর ভরসা করে সেই ২১ অগাস্ট থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে অন্তত ১৫ হাজার মানুষের। এছাড়া গ্রামীণ জনপদে যারা আটকা পড়েছেন তারা না পারছেন বাইরে যেতে, না পারছেন পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।
এদিকে ১৩ দিন ধরে পানিবন্দি ফেনীতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ জনে। সন্ধ্যায় নতুন করে আরও দুইজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
পাউবো বলছে, দাগনভূঞার মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ায় পানি নামতে পারছে না; পানি সরতে আরও সময় লাগবে।
সোমবার বন্যা কবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সদর উপজেলার ধলিয়া ও লেমুয়া ইউনিয়নের অনেক গ্রামে এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে মানুষজন। ঘরবাড়িতে পানি থাকায় উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে তিন হাজারের মতো লোকজন রয়েছেন। বাড়ির সামনে পানি থাকায় যাতায়াতে কলাগাছের ভেলা ব্যবহার করতে দেখা গেছে বাসিন্দাদের।
সদরেরে পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের ডমুরুয়া নতুন বাড়ির বাসিন্দা অটোরিকশা চালক মীর হোসেন বলেন, “ঘরে ১৩ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছি। বাড়ি থেকে পানি কবে নামবে কেউই কিছু বলতে পারছে না।”
এলাহিগঞ্জ মমতাজ উদ্দিন উচ্চ বিদালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, খাবার পানি পর্যাপ্ত থাকলেও নিত্য ব্যবহারের পানির সংকট রয়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে বন্যার পানি ব্যবহার করছেন।
এই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা সেমনা খাতুন বলেন, “আশ্রয়কেন্দ্রে গোসলের সমস্যা হচ্ছে। অনেকে বন্যার পানিতেই গোসল সারছেন।”
তুলাবাড়িয়া গ্রামের হারাধন নাথ বলেন, বন্যার পানিতে তার ঘরের সব জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে। ছেলের পড়ার বইও ভিজে গেছে। সকালে তিনি ভেজা মালপত্র ও বইগুলো রোদে শুকাতে দিয়েছেন।
সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান বলেন, “সদরের কিছু এলাকায় এখনও পানি রয়েছে। এজন্য আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো প্রায় তিন হাজার মানুষ অবস্থান করছেন।”
দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ও সিন্দুরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা এখনো পানির নিচে রয়েছে।
উপজেলার পূর্ব চন্দ্রপুর, রাজাপুর, করমুল্লাপুর, জয়নারায়ণপুর, চন্দ্রদ্বীপ, উত্তর করিমপুর, সাপুয়া, বৈঠারপাড় ঘুরে দেখা গেছে, বাড়িঘরে পানি থাকায় লোকজন এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
উত্তর করিমপুর এলাকায় চলাচলের সড়কটি এখনও হাঁটুপানিতে নিমজ্জিত। উত্তর করিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিচতলা ও দোতলায় আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো শতাধিক লোক অবস্থান করছেন।
রঘুনাথপুর আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন প্রায় দুইশ লোক। সেখানে আশ্রিতদের জন্য রান্নাকরা খাবার বিতরণ করেন স্থানীয় কাজী হাবিবুল্লাহ সুমন।
তিনি বলছিলেন, “আশ্রয়কেন্দ্রে লোকদের পাশে অন্তত একবেলা থাকতে পেরেছি। এর আগে আমি সিন্দুরপুর ইউপির দরবেশের হাটের সুজাতপুর আশ্রয়কেন্দ্রে দেড় শতাধিক লোককে একবেলা রান্না করা খাবার দিয়েছি।”
স্বেচ্ছাসেবক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “বন্যায় অনেকের বাড়িঘরের পাশাপাশি টয়লেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দরিদ্র মানুষের টয়লেট তৈরি করতে কাজ শুরু হয়েছে। এজন্য অর্থ সংগ্রহ শুরু হয়েছে।”
দাগনভূঞার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিবেদিতা চাকমা বলেন, “রোববার পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন। পানিবন্দি থাকা গ্রামগুলো থেকে ধীরে ধীরে কমছে পানি। আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি বন্যা কবলিত এলাকায় প্রচুর ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।”
অপরদিকে সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের অনেক নিচু এলাকায় এখনো পানি রয়েছে। তবে, অনেকদিন হয়ে যাওয়ায় মানুষ পানির মধ্যেই নিজেদের বাড়িঘরে ফিরছেন।
সোমবার পর্যন্ত প্রায় সব আশ্রয়কেন্দ্র খালি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান।
‘পানিবন্দির কারণ রেগুলেটর ভেঙে যাওয়া’
দীর্ঘ সময় ধরে পানি আটকে থাকার কারণ জানতে চাইলে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, “মুহুরী নদীর পানি কমে যাওয়ায় ফুলগাজী ও পরশুরামে বন্যার পানি নেমে গেছে। তবে দাগনভূঞা উপজেলায় পানিবন্দি থাকার কারণ হচ্ছে, মুসাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়া। জোয়ারের পানি দাগনভূঞা ও সোনাগাজী অংশে ঢোকার কারণে দাগনভূঞার নিচু এলাকা পানিবন্দি হয়ে আছে।
“অপরদিকে সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ও শর্শদি ইউনিয়নের কিছু এলাকা পানিবন্দি থাকার কারণ হচ্ছে, ভারতীয় সীমান্তবর্তী কাঁকড়ি নদীতে এখনও পানি উপচেপড়া অবস্থায় রয়েছে। এজন্য এই এলাকার পানি নামতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।”
পাউবো ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, “কুমিল্লা ও নোয়াখালীর পানি নামে ছোট ফেনী নদী হয়ে। মুছাপুর রেগুলেটরটি ভেঙে যাওয়ায় জোয়ার-ভাটার কারণে ছোট ফেনী নদী হয়ে পানি নামতে ধীর গতি রয়েছে; সময় লাগছে।
“এছাড়া কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে এখনও বন্যা চলমান। সেদিকের পানি দাগনভূঞার বেশ কিছু ইউনিয়ন এবং সদরের বেশ কিছু ইউনিয়নে এসেছে। সে কারণেই এখানে এখনও পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। আজও ফেনীতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। এদিকের পানি নামতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।”
মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের দাবি
চলতি বন্যায় ছোট ফেনী নদীর ওপর ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুছাপুর রেগুলেটর পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। সেটি পুনর্নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন করেছে সোনাগাজীবাসী।
সকালে সোনাগাজী পৌর শহরের জিরো পয়েন্টে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, সাবেক সভাপতি জয়নাল আবদীন বাবলু, সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সেন্টু, জেলা কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক শামছুদ্দিন খোকন, উপজেলা জামায়াতে ইসলামির আমির মাওলানা মোহাম্মদ মোস্তফা, সেক্রেটারি মো. বদরুদ্দৌজা, পৌর আমির মাওলানা কালিমুল্লাহ, ইসলামী আন্দোলনের নেতা মাওলানা হিজবুল্লাহ, সাংবাদিক জসিম উদ্দিন।
বক্তারা সোনাগাজী-কোম্পানীগঞ্জসহ আটটি উপজেলার ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি জোয়ারের লোনা পানি থেকে বাঁচতে মুছাপুর রেগুলেটরটি দ্রুত পুনর্নির্মাণের দাবি জানান।
তারা রেগুলেটর তৈরিতে দুর্নীতির অভিযোগ করে এর সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের শাস্তি দাবি করেন।
সোনাগাজী পৌরসভার সাবেক মেয়র জামাল উদ্দিন সেন্টু বলেন, সোনাগাজী উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এবং নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার সীমানায় ছোট ফেনী নদীর ওপর ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে রেগুলেটরটি নির্মাণ করা হয়।
“সোনাগাজী ও নোয়াখালী এলাকার ১ দশমিক ৩০ লাখ হেক্টর জমির ফসলকে লবণাক্ততা থেকে সুরক্ষা এবং জোয়ারের পানি থেকে এলাকাকে সুরক্ষার জন্য জনগণের দীর্ঘ দিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মুছাপুর ২৩ দরজা বিশিষ্ট রেগুলেটরটি নির্মাণ করা হয়েছিল।”
চর দরবেশ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, “এটি নির্মাণের সময় ব্যাপক দুর্নীতি করা হয়েছিল। যার কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে রেগুলেটরটি ভেঙে পড়েছে।”
২৬ অগাস্ট বানের পানির চাপে রেগুলেটরটি ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এতে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এলাকার মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮
তের দিন ধরে বন্যার সঙ্গে লড়াই করতে থাকা ফেনীতে সন্ধ্যায় নতুন করে আরও দুইজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোমেনা আক্তার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, জেলায় বন্যায় এ পর্যন্ত ২৮ জনের মুত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সদরে সাতজন, ফুলগাজীতে সাতজন, সোনাগাজীতে ছয়জন, ছাগলনাইয়ায় তিনজন, দাগনভূঞায় তিনজন এবং পরশুরাম উপজেলায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলাগুলোতে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন
বন্যার ক্ষতে বেহাল সড়ক, চলাচল ব্যাহত
প্রাণে বাঁচার পর এবার কিস্তি শোধের দুশ্চিন্তা
'অনেক ত্রাণ, কিন্তু সবাই পাইতেছে না'
'চতুরমুই হানি, ঘরেত্তে মারে দাফন কইচ্চি
মৃত্যুর 'কু' ডেকে যাওয়া প্লাবিত প্রান্তরে
ফেনীর বন্যা: 'হিন্দনের কাফোর ছাড়া কিছু নেই আন্ডার'
বন্যা: ফেনীতে কলার ভেলায় লাশ, সঙ্গে চিরকুট
ফেনী হাসপাতালে মোমের আলোয় ডেলিভারি, বেড়েছে সাপেকাটা রোগী
স্রোতের মুখে বাঁচতে পারবেন ভাবেননি, এখন ভবিষ্যতের ভাবনায় কপালে ভাঁজ
ঘরে ফিরে দেখেন সব শেষ, ত্রাণের জন্য রাস্তায়
অজানা দুশ্চিন্তায় ফিকে বন্দিদশা কাটার স্বস্তি
বানের পানি মাড়িয়ে হেঁটে দুই দিনে ভাগ্নের কাছে মামা
বন্যায় ৪৬২ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি
ফেনীতে পানিবন্দি এক লাখ মানুষ, স্বজনদের খোঁজ পেতে মরিয়া
বিদ্যুৎ-মোবাইল-নেটহীন ফেনী, পানিবন্দি ৪ লাখ মানুষ
মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন ফেনীর অর্ধেক মানুষ
ভয়াবহ বন্যায় বিচ্ছিন্নপ্রায় ফেনী, মহাবিপদে সাড়ে তিন লাখ মানুষ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৭ কিলোমিটার প্লাবিত, চালকরা আতঙ্কে
বন্যা: ফেনীতে ২০০ গ্রাম প্লাবিত, প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি