ত্রাণ বিতরণের সমন্বয়হীনতা নিয়ে কিছু অভিযোগ থাকলেও ফেনী জেলা প্রশাসক মোছাম্মাৎ শাহীনা আক্তার তা অস্বীকার করেছেন।
Published : 30 Aug 2024, 12:47 AM
ফেনী সদর উপজেলার সত্তরোর্ধ্ব প্রিয়বালা বর্মন আগে থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। দারিদ্র্যের কারণে খুব যে বেশি চিকিৎসা করাতে পেরেছেন তা নয়। ২১ অগাস্ট বিকাল থেকে যখন পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের ভগবানপুর গ্রামে পানি প্রবেশ করতে থাকে তখনি সবাই প্রমাদ গুনতে থাকেন। সন্ধ্যার পর থেকেই প্রিয়বালাদের উঠান ডুবিয়ে পানি ঘরে ঢুকে পড়ে।
রাত বাড়তে থাকলে ঘরে পানিও বাড়তে থাকে। ঘরে প্রিয়বালার ছেলে সুকুমার চন্দ্র বর্মন, তার স্ত্রী ও সন্তানরা আছেন। ঘরে কোমর সমান পানি দেখে প্রিয়বালা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। সুকুমার ও তার স্ত্রী ঘরের মধ্যে মাচা করে ভেজা কাপড়ে মাকে সেখানে বসিয়ে রাখেন।
বানের পানিতে এই অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে ছয় দিন থাকার পর প্রিয়বালা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। মায়ের শরীর খুব খারাপ অবস্থার দিকে গেলে মঙ্গলবার দুপুরে সুকুমার অনেক কষ্ট করে একটি নৌকা ভাড়া করেন। তিনি ও তার স্ত্রী মিলে প্রিয়বালাকে নিয়ে বের হন হাসপাতালের দিকে। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর পরই প্রিয়বালা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
মায়ের মরদেহ নিয়ে আবার ঘরে ফিরে আসেন সুকুমার। চারদিকে পানি; শ্মশানে দাহ করার মত অবস্থা নেই। এবার শুরু হয় প্রিয়বালাকে সমাধিস্থ করার নতুন যুদ্ধ। উঠানে, ঘরে পানি। কোথাও সমাধিস্থ করার কোনো উপায় নেই।
পেশায় দর্জি সুকুমার চন্দ্র বর্মন বলছিলেন, মাকে যখন রান্নাঘরের মেঝেতে দাফন করার জন্য মাটি খুঁড়ছিলেন তখন ওই কক্ষে পানি ছিল না। অন্য সব কক্ষে পায়ের পাতা অবধি পানি ছিল। একপর্যায়ে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকলে গর্তের মধ্যে পানি উঠা শুরু করে। একদিকে তিনি মাটি খুঁড়ছিলেন আরেকদিকে স্ত্রী পানি সেচে ফেলছিলেন।
মোটামুটি কিছুটা গর্ত করার পর প্রিয়বালাকে যখন শোয়ানো হচ্ছিল তখন সেখানে পানি ঢুকে যাচ্ছিল। তারপরও কোনোরকমে তাকে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
সুকুমার আক্ষেপ করে বলছিলেন, “চতুরমুই হানি, মা রে কই নিমু, কন্ডে দাহ করমু, কন্ডে কবর দিমু! মাথাই কিচ্ছু ডুকের না। একবার চিন্তা করচ্চি কলার ভেলায় ঘরের পাশের নদীতে ভাসায় দিমু, আবার চিন্তা কইচ্চা একমাত্র মা, কেন্নে ভাসামু নদীতে? হরে ঘরের ভিত্তে পাকের ঘরের মেঝের মাডি খুঁড়ি হানির ভিত্তে দাফন দিসি।”
(চারদিকে পানি, মা কে কোথায় নেব, কোথায় দাহ করব, কোথায় কবর দেব! মাথায় কিছুই আসছিলো না। একবার ভেবেছি কলাগাছের ভেলায় ঘরের পাশের নদীতে ভাসিয়ে দেব, আবার চিন্তা করেছি একমাত্র মা, কেমনে নদীতে ভাসাব? পরে রান্নাঘরের মেঝের মাটি খুঁড়ে পানির মধ্যে দাফন করেছি।)
বৃহস্পতিবার সুকুমার বলছিলেন, ঘরের পানি কমলেও উঠানে এখনও হাঁটু পানি। মায়ের এমন শেষ পরিণতি হবে তিনি কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি।
আশ্রয়কেন্দ্রে মারা গেলেন বানভাসি
বন্যা শুরুর পর ২১ অগাস্ট রাতে বাড়ি ছেড়ে দাগনভূঞার বিরলী বাজার আব্দুস সাত্তার মার্কেটের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিবার নিয়ে উঠেছিলেন অটোরিকশার চালক ষাটোর্ধ্ব আবুল কাশেম। পানিতে ডুবেছে ঘর, নষ্ট হয়েছে উপার্জনের একমাত্র অটোরিকশাটিও। এ নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার বিকালে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
আবুল কাসেম দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের বক্তারপুর কাজী বাড়ির দেলুমিয়ার ছেলে।
মার্কেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাসের বলেন, “আবুল কাশেমের পরিবারের মতো আরো অনেক পরিবার আমাদের এই উঁচু মার্কেটে আশ্রয় নিয়েছিল। আমরা ও বিভিন্ন সংস্থা তাদের ত্রাণ দিয়েছি। বন্যায় সব হারিয়ে আবুল কাশেম অনেকটা উদ্বিগ্ন ছিলেন। আজ বিকালে তিনি মারা যান।”
তিনি জানান, রাজাপুরের চারিদিকে পানি। আবুল কাশেমের গ্রামের বাড়িঘর পানিতে ডুবে আছে। এ অবস্থায় পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে রাতে সিন্দুরপুর বাজারের অলাতলী গ্রামের একটি উঁচু স্থানে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
জানাজায় আবুল কাশেমের দুই ছেলেসহ আশপাশের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
পানিবন্দি হয়ে সপ্তাহ পার
নয় দিন ধরে পানিবন্দি ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামের বাসিন্দারা। ছোট ফেনী নদীর তীরবর্তী ফেনী-কোরেস মুন্সী সড়কের বিরলি বাজারের পাশেই গ্রামটি। ২১ অগাস্ট রাতে বানের পানিতে গ্রামটি ডুবে যায়। নয় দিন পরেও সেখান থেকে পানি নামেনি।
শুধু রতনপুর নয়; পাশের বিরলি, বক্তারপুর, জয় নারায়ণপুর, রামচন্দ্রপুর, নুরুল্লাপুর, রাজাপুর ঘোনাসহ এই ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রাম এখনো পানির নিচে। পানিতে তলিয়ে থাকায় ভেঙে গেছে গ্রামীণ সড়ক, ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি মুরগির ফার্ম ও গরুর গোয়াল ঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বলেন, “বাড়িতে এখনো কোমর পর্যন্ত পানি। নয় দিনে ঘরের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ কোনো আসবাবপত্রই বের করতে পারিনি। পানি কবে নামবে তাও কেউ বলতে পারছে না। আর কতদিন যে এই ভোগান্তি পোহাতে হবে?”
গ্রামের অপর বাসিন্দা জোহরা বেগম বলেন, “কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় ছেলের বউ ও নাতনিকে নিয়ে নয় দিন ধরে ঘরেই আছি। এত জনে এত ত্রাণ পায়, আমরা কোনো ত্রাণ পেলাম না। মানবেতরভাবে জীবন কাটাচ্ছি আমরা। কেউ আমাদের খোঁজও নিচ্ছে না।”
ছোট্ট শিশু সোনিয়া আক্তার বলেন, বন্যার পানিতে তার সব বই ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এতদিন পানিতে থাকতে তার আর ভালো লাগছে না।
পানি ভেঙে কিছু দূর এগোতেই দেখা গেল ছোট্ট একটি নৌকায় দুই শিশু ও দুই নারীকে পার করছেন এক বৃদ্ধ। তারা অনেকদিন বাড়িতে পানির মধ্যে থেকে অতিষ্ঠ হয়ে উঁচু স্থানে এক স্বজনের বাড়িতে যাচ্ছেন। কবে বাড়ি ফিরবেন তারাও বলতে পারলেন না।
ত্রাণ নিয়ে অসন্তোষ
সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আমিনুল শাহিন একজন কলেজ শিক্ষক। নিজের ইউনিয়নের বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেছিলেন। তাকে কিছু ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে টানা চারদিন কার্যালয়ে বারবার ধরনা দিয়েও বরাদ্দকৃত ত্রাণের প্যাকেট সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি।
আমিনুল শাহিন বলছিলেন, “জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ত্রাণ শাখায় দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবক আমাকে বলেছেন, আপনাকে যে পরিমাণ ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেই পরিমাণ ত্রাণ আমাদের কাছে মজুত নেই। আপনি পুনরায় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”
পরে অবশ্য আমিনুল শাহিন বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে এলাকায় বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে বিতরণ করেছেন।
একই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের (বিরলী ও রতনপুর) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আইয়ুব আলী বলেন, “২১ অগাস্ট থেকে এ ইউনিয়নে বন্যা শুরু হলেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তার ওয়ার্ডে সরকারিভাবে কিংবা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি।”
টিম ইজিলাইফ এর স্বেচ্ছাসেবক শহিদুল মিশু বলেন, “বন্যাদুর্গত এলাকায় রান্না করা খাবার পাঠিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সাহায্য করা হচ্ছে। বন্যা পরবর্তী সময় মোকাবেলা করার জন্য চাল, ডাল, তেল বিতরণ করে হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি, যারা সরকারিভাবে সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি তাদের কাছে পৌঁছানোর।”
ত্রাণ বিতরণের সমন্বয়হীনতা নিয়ে কিছু অভিযোগ থাকলেও ফেনী জেলা প্রশাসক মোছাম্মাৎ শাহীনা আক্তার তা অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসন ত্রাণ বিতরণে তৎপর রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ত্রাণের ৮৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বুধবার রাত পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় হেলিকপ্টার, সড়ক ও নৌকায় করে আরও ৬০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বৈষমবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা, সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র্যাব, পুলিশ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে।”