ট্রাম্পের নতুন শুল্ক সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সব প্রান্তে স্টক মার্কেটে ধস নেমেছে ।
Published : 04 Apr 2025, 06:03 PM
ট্রাম্প যা করবেন বলেছিলেন, তাই করলেন, হয়তো বা তার চেয়ে বেশিই করলেন। সারা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে তিনি ৬০টি দেশের ওপর ১০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসালেন। এই দেশগুলোর মধ্যে আছে চীন ও ইউরোপিয়ান ইউনিযনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো উন্নয়নশীল দেশ। রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু-অবন্ধু, প্রতিবেশী এবং গরিব-ধনী সব ধরণের দেশ।
ডনাল্ড ট্রাম্প নতুন শুল্ক নীতি ঘোষণা করতে গিয়ে, দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্প বলেন, “আজ খুব ভালো খবর। এই দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ দিন ধরে অপেক্ষা করছে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কখনো কখনো বন্ধু শত্রুর চেয়ে খারাপ হয়।”
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সব প্রান্তে স্টক মার্কেটে ধস নেমেছে । চায়না স্টক মার্কেট , হংকং স্টক মার্কেট এবং এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের স্টক মার্কেটে দামের বড় ধরনের পতন হয়েছে । খোদ মার্কিন মুল্লকে 'ডাও জোন্স’ হারিয়েছে ১৬৭৯ পয়েন্টস, যেটা গত তিন বছরের মধ্যে সর্ববৃহৎ।
সব দেশই ট্রাম্পের তালিকায় নিজেদের নাম খুঁজে নিচ্ছে এবং সংখ্যাগুলো খতিয়ে দেখছে।
কে হারল কে জিতল
নতুন শুল্ক আরোপের তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো হলো চীন, ভিয়েতনাম , থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশ। এইসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণ, বড় ঘাটতি ও 'রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বিবেচনা করে, এই দেশগুলোর ওপর বড় শুল্ক বসানো হয়েছে। এই দিক দিয়ে ভারত বেশ সৌভাগ্যবান। তারা যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির দুই দশমিক সাত শতাংশ (২,৭%) সরবরাহ করে, তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ঘটতিও বেশ বড়– ৪৬ বিলিয়ন, কিন্তু ভারতের ওপর বসানো হয়েছে মাত্র ২৬ শতাংশ শুল্ক । অন্যদিকে বাংলাদেশের থেকে মোট আমদানির মাত্র দশমিক তিন শতাংশ আমদানি করে এবং ৬ বিলিয়ন ঘাটতি নিয়ে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক বসানো হয়েছে ৩৭ শতাংশ। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, মোদী সরকার আগেভাগেই ট্রাম্পের সঙ্গে দর কষাকষি করে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে পণ্যের ওপর তাদের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫২ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। তাই তারা নতুন তালিকায় মাত্র ২৬ শতাংশ শুল্ক দেবে। এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করার উপায় নেই, তবে ভারত অনেকদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই নিয়ে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়। ট্রাম্পের নতুন ঘোষণায় ভারত যে খুব ভালো অবস্থানে আছে এবং রফতানিতে চীন ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সুবিধা পাবে তা এখনই বলে দেয়া যায়।
রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক
রেসিপ্রোকাল শুল্ক হলো অনেকটা প্রতিক্রিয়মূলক শুল্ক। তুমি আমার জিনিসের ওপরএত এত শুল্ক নিচ্ছ, আমিও তোমার জিনিসে বড় শুল্ক বসাব। ট্রাম্প এই পারস্পরিক শুল্কের একটা তালিকা প্রকাশ করেছেন , যেখানে দেখা যায় একটা দেশ আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত জিনিসের ওপর কত শুল্ক নিচ্ছে , আর ট্রাম্প তার প্রতিক্রিয়ায় কি ধরণের নতুন শুল্ক বসাচ্ছেন । বাংলাদেশও এই তালিকায় আছে।
এই তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন মার্কিন পণ্যের ওপর ৭৪ শতাংশ নিচ্ছে। ট্রাম্প যদিও বাংলাদেশ থেকে ৭৪ শতাংশ শুল্ক চেয়ে ফেলতে পারতেন, তিনি নতুন পারস্পরিক শুল্ক তার অর্ধেক মাত্র নেবেন ।
অর্থাৎ বাংলাদেশকে এখন ৩৭ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এই ‘দয়া’ তিনি তালিকায় থাকা সব দেশগুলোর ওপরই দেখিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে বাংলাদেশ বর্তমানে যে ১৫ শতাংশ শুল্ক দেয়, এটা তার অনেক বেশি। সুতরাং বাংলাদেশের রফতানির ওপর প্রকৃত শুল্ক হবে ৫২ শতাংশ।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প
বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যার মধ্যে তৈরি পোশাকই ৭৩৪ কোটি ডলারের। সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান অবশ্য পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী বেশিরভাগ দেশের ওপরও কাছাকাছি অংকের শুল্ক বসানোয় প্রতিযোগিতায় তেমন পিছিয়ে থাকার শঙ্কা দেখছেন না বলে মন্তব্য করেছেন।
মোস্তাফিজুর রহমান সঠিক কথাটিই বলেছেন । আমি বাংলাদেশের একটি দৈনিকে লেখা নিবন্ধে এই সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছি । গার্মেন্টস রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী হলো চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া । ভিয়েতনামের ওপর শুল্ক বসানো হয়েছে ৪৬ শতাংশ। চীন ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিতে শুল্কও প্রায় বাংলাদেশের সমান। তাই এই তিন দেশ বাংলাদেশের ওপর শুল্ক বৃদ্ধিতে কোনো সুবিধা পাবে না । ভারতের রপ্তানিতে শুল্ক যেহুতু ২৬ শতাংশ, যা বাংলাদেশের পণ্যের ৩৭ শতাংশের চেয়েও বেশ কম, ভারত সুবিধা পেতে পারে। এর মধ্যে আবার কোটা , প্রাধান্য এই সবের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভারতীয় পোশাক আবার যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের কাছে খুব জনপ্রিয় নয়। অন্য যেসব দেশ পোশাক রপ্তানি করে থাকে– কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান, তাদের ওপরও শুল্ক কম নয়, তাই তারাও খুব সুবিধা পাবে না ।
তাই বলে শঙ্কার কারণ নেই, তা ভাবলে ভুল হবে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের দাম বেশ বেড়ে যাবে, তাই প্রথমদিকে জনগণ কেনাকাটায় কিছুটা হিসেবে করবে। তাতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের পোশাকের চাহিদা ও রফতানি কমে যাবে । আস্তে আস্তে ভোক্তাদের নতুন দাম সয়ে যাবে, আবার চাহিদা বাড়বে। এই সাময়িক সময়টায় যেন গার্মেন্টস শিল্প বড় ধাক্কা না খায় তার জন্য সরকার ও শিল্পপতিদেরকে যৌথভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।
অপরদিকে আমাদেরকে সব বিকল্প ভাবতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পণ্যের ওপরআমদানি শুল্ক কমাতে হবে, তারা যদি নতুন পণ্য রপ্তানি করতে চায় তার সুযোগ দেয়া যায় কিনা সেটা দেখতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আশা করেছেন , যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের যে ঘোষণা দিয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধানে ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হবে।
ট্রাম্পের উদ্দেশ্য
এত বছরে যুক্তরাষ্ট্রের উদার বাণিজ্যিক নীতির ফলে দিন দিন তাদের বাণিজ্যিক ঘাটতি বাড়ছে । যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রতিবছর আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর থেকে ধার করছে দেশের বিভিন্ন কার্যক্রম চালাতে। সব মিলিয়ে তাদের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৩৫.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। ট্রাম্প চাচ্ছেন এই ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে। বাণিজ্যিক ঘাটতির তালিকায় দেখা যায় চীন , ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ভিয়েতনামের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ঘাটতি ৬৫৬ বিলিয়ন ডলার। এই রকম ঘাটতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণে প্রতিবছর যোগ হচ্ছে। তাই ঘাটতি কমিয়ে আনতে ট্রাম্প বদ্ধপরিকর।
এছাড়া ট্রাম্পের বড় একটা উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রে ম্যানুফ্যাকচারিং ভিত্তি ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেছেন , শুল্ক মুক্ত চাইলে, আমেরিকাতেই আপনাদের পণ্য তৈরি করুন। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো যারা এতদিন ডেমোক্রেটিক পার্টির বড় সমর্থক ছিল, এখন তারা উঁচুস্বরে ট্রাম্পকে প্রশংসা করছে।
ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (ইউ-এ-ডাব্লিও) হলো আমেরিকার গাড়ি তৈরির শিল্পে কাজ করা শ্রমিকদের ইউনিয়ন। তারা ট্রাম্পের প্রশংসা করেছে এই বলে যে , বিদেশী গাড়ি ও পার্টসের ওপর২৫ শতাংশ শুল্ক বসলে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ির কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের জন্য আরো অনেক বেশি কাজ মিলবে। ইউ-এ-ডাব্লিও প্রেসিডেন্ট আরো বলেছেন, “আমেরিকার গাড়ি শ্রমিক ও সাধারণ শ্রমিকদের জন্য এই শুল্ক আরোপ অতন্ত্য প্রয়োজন ছিল।”
মার্কিন ভোক্তারা ভুগবে
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষ ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে যে খুব ভুগবে তা প্রথম দিন থেকেই বুঝতে পারা যাচ্ছে । যেসব বড় বড় কোম্পানি বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভিরশীল, তাদের স্টক ঘণ্টায় ঘণ্টায় কমছে । আপেল, ওয়ালমার্ট, আমাজন এরা ৬ থেকে ৭ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে ।
যুক্তরাষ্ট্রে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যাবে, তা নিঃসন্দহে বলে দেয়া যায় । যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির ছোট খাটো জিনিসপত্র থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্রান্ডের বড় জিনিসপত্র বেশিরভাগ চীনে তৈরি হয় । একটা টিভি কিনতে গেলেও চীন, কোরিয়া বা ব্রাজিলের তৈরি কিনতে হবে। এখন সবগুলোরই দাম বাড়বে।
ট্রাম্প বিদেশী গাড়ির ওপর২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে আমেরিকাতে তৈরি গাড়িগুলোর ওপরযেহেতু শুল্ক নেই, সেগুলো সুলভে পাওয়া যাবে। তা নাও হতে পারে। আমেরিকায় তৈরি গাড়িগুলোর পার্টস আসে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে। চীন থেকে পার্টস আনতে যদি ৫২ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, তাহলে আমেরিকায় তৈরি গাড়ির দামও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এইসব অর্থনৈতিক ঘূর্ণি হয়তো চুপচাপ মেনে নেবে। এখানকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সহায়ক ব্যবস্থা খারাপ অবস্থাকেও সামাল দিতে পারবে। কিন্তু অন্যদেশগুলো বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাবধান থাকতে হবে। সম্ভবত ট্রাম্পের সঙ্গে বিবাদে না গিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা সহনীয় শুল্কে তাকে রাজি করাতে হবে। আমদানি শুল্কে যা ছাড় দেওয়ার দরকার তা দিতে হবে। নিজেদের জনগণকে সঙ্গে রাখতে হবে যেন প্রতিকূল অবস্থায় নিজেদের দেশে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে না পরে।