ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্যও জরুরি।
Published : 04 Apr 2025, 05:15 PM
বাংলাদেশের দিক থেকে অনেক দিন ধরেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাতের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু ভারতের দিক থেকে এক ধরনের উপেক্ষার মনোভাব দেখানো হয়েছে। শেষ পর্যযন্ত অবশ্য বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে এই প্রতীক্ষিত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো। এই বৈঠক নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দুই দেশের মধ্যে জমে থাকা শীতল সম্পর্ক উষ্ণ করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি, তবে এটি ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয়।
বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের বহুমুখী প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা বিমসটেক (BIMSTEC) একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক উদ্যোগ। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড নিয়ে বিমসটেক নামে এটি গঠিত হয়, যা পরে মিয়ানমার, ভুটান ও নেপাল যুক্ত হওয়ার ফলে বিমসটেক নামে পরিচিত হয়। এই সংস্থাটির মূল লক্ষ্য হলো বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়কে ত্বরান্বিত করা। আঞ্চলিক সহযোগিতা যদি কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, তবে তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য লাভজনক হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য বিমসটেক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। সাফটা (SAFTA) বা সার্ক (SAARC) যখন রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন বিমসটেক একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে বিমসটেকের সাফল্যের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা অপরিহার্য। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কোন্নয়ন বিমসটেকের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে জটিল। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য ও টানাপোড়েন বিদ্যমান। তবে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উভয় দেশের স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্যও জরুরি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা, ট্রানজিট সুবিধা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা অনেকাংশে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থেও ভারতের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, বাণিজ্যিক অংশীদার ও নিরাপত্তা সহযোগী। অন্যদিকে, ভারতের জন্যও বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা অপরিহার্য। দুই দেশের মধ্যে ট্রানজিট সুবিধা, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করা গেলে উভয়েই লাভবান হবে।
সেই দিক থেকে মোদী-ইউনূসের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বৈঠকের প্রভাব এখনই পুরোপুরি বোঝা যাবে না, তবে এটি সম্পর্কের উন্নয়নে একটি প্রাথমিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের উচিত ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় সচেতন থাকা। একইভাবে, ভারতকেও বাংলাদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহযোগিতামূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান অসম্ভব নয়, যদি উভয় দেশ আন্তরিকভাবে একসঙ্গে কাজ করে। একথা ঠিক গত আট মাস ধরে যে তিক্ততা গড়ে উঠেছে তাতে চটজলদি সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে না। তবে ধাপে ধাপে তা নিরসন সম্ভব। এর জন্য রাজনৈতিক বোঝাপড়ার প্রয়োজন, যেখানে উভয় দেশের নেতৃত্ব পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পারস্পরিক সহযোগিতা তখনই সফল হয় যখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে শ্রদ্ধা করে। এক দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত মন্তব্য করেন, তবে তা সমস্যা সমাধানের পথ আরও কঠিন করে তোলে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের ইতিহাসে সহযোগিতা ও সংঘাত পাশাপাশি বিদ্যমান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান, জলবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত হত্যা, ট্রানজিট ও বাণিজ্য ঘাটতি— এসব নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নানা মতপার্থক্য রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে সম্প্রতি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ভারতের ‘একতরফা’ ও ‘অতিরঞ্জিত’ প্রচারণা এবং বাংলাদেশের কোনো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির ‘বিতর্কিত মন্তব্য’কে কেন্দ্র করে, যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলো নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক ও আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভরতের এক ধরনের বৈরিতা সৃষ্টি হয়েছে। পক্ষান্তরে ভারতের জন্য স্পর্শকাতর রাষ্ট্র পাকিস্তান ও চীনের প্রতি বাংলাদেশের অধিকমাত্রায় ঝুঁকে পড়ার বিষয়টিও ভারত ভালোভাবে নিয়েছে বলে মনে হয় না। মূলত এসব বিষয় নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বোঝাপড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত মন্তব্য করেন, তবে তাতে কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। বিশেষত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে বাংলাদেশের কোনো নেতার মন্তব্য ভারতীয়দের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সম্পর্ক উন্নয়নের পথে এগুলো বড় ধরনের অন্তরায়। সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হলে উভয় পক্ষকেই সংযত ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
প্রতিবেশী দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা কেবল নৈতিকভাবেই অনুচিত নয়, বরং কূটনৈতিকভাবেও ক্ষতিকর। তাই বাংলাদেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়, যা ভারতের জনগণের মনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একইভাবে, ভারতেরও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা উচিত। সবখানে ‘দাদাগিরি’ না করে বাস্তবতা মেনে বাংলাদেশকে প্রাপ্য সম্মান প্রদান করা দরকার।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলো একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয়, তবে সংলাপ ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সমাধানের দিকে এগোনো যেতে পারে। এ জন্য নিয়ত কূটনৈতিক উদ্যোগ চালাতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে:
· বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা: বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারতকে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য আরও বাজার সুবিধা দিতে হবে।
· জলবণ্টন চুক্তি: তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দ্রুত সমঝোতা প্রয়োজন।
· সীমান্ত নিরাপত্তা: সীমান্ত হত্যা বন্ধ করে মানবিক সীমান্ত নীতি গ্রহণ করা উচিত।
· কানেকটিভিটি: ট্রানজিট, রেলওয়ে ও সড়ক সংযোগ বৃদ্ধি করে আঞ্চলিক বাণিজ্য ত্বরান্বিত করা যায়।
· সাংস্কৃতিক বিনিময়: দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক বিনিময় বাড়ানো গেলে জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
মোদী-ইউনূস বৈঠক সেই দিকেই একটি আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। তবে এই সম্পর্ককে টেকসই করতে দুই দেশেরই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে উভয়দেশের সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। গুজব, অপপ্রচার, বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে অবশ্য গুজব ও অপপ্রচার এমনিতেই কমবে।
বাংলাদেশের স্বার্থেই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। একইভাবে, ভারতেরও উচিত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নকে সম্মান করা। কূটনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বাস্তবসম্মত সমাধানের মাধ্যমেই দুই দেশ একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। মোদী-ইউনূস বৈঠক সেই সম্ভাবনারই একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এখন প্রয়োজন এই গতি বজায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
মোদী-ইউনূস বৈঠক এই বার্তা দিয়েছে যে সমস্যাগুলো যতই জটিল হোক না কেন, আলোচনা ও সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা শুধু বাংলাদেশ বা ভারতের স্বার্থে নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তার স্বার্থ রক্ষা করেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এই বৈঠক দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।
বরফ গলতে শুরু করেছে, এখন সময় তা বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ দেওয়ার। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপমূলক বক্তব্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য থেকেও বিরত থাকা উচিত। এই বৈঠক যদি দুই দেশকে নতুন করে সংলাপের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যই মঙ্গলজনক হবে।