Published : 01 Sep 2024, 12:21 AM
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীর চার উপজেলা থেকে পানি নামলেও সদর ও দাগনভূঞা উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন থেকে এখনও সরেনি। এসব এলাকার বাসিন্দারা এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
বানভাসি মানুষ ত্রাণের পাশাপাশি বাড়িঘর পুনর্নির্মাণে সহায়তা চেয়েছেন।
বানের পানির তোড়ে ফুলগাজী উপজেলার পঞ্চাশোর্ধ হালিমা খাতুনের ঘরটি ভেঙে মাটিতে মিশে শুধু টিনের চাল পড়ে আছে। একটি সংগঠনের পক্ষে স্বেচ্ছাসেবকরা তাকে ত্রাণ দিচ্ছিলেন। কথা বলার পুরো সময়টাই কাঁদছিলেন হালিমা খাতুন।
হালিমা বলেন, “হাইল্লা তোয়াই হাইয়ের না চাইল দি কিয়া করমু?” (পাতিল খুঁজে পাচ্ছি না, চাল দিয়ে কী করব?)
জেলা সদর উপজেলার শর্শদি ইউনিয়নের আবুপুর গ্রামের বাসিন্দা যতন শীল বলেন, বন্যায় তার টিন শেডের ঘরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরের সব মালামাল নষ্ট হয়েছে। নতুন করে কীভাবে এসব মালামাল যোগাবেন সেই চিন্তায় ঘুম নেই তার।
ফেনী শহরের দক্ষিণ সহদেবপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মন্দিরা বিশ্বাস বলেন, “জীবনের যত অর্জন এক বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। স্কুলের চাকরির কাগজপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, বিগত সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অর্জিত সবকিছু নষ্ট হয়েছে পানিতে। কান্না করলেতো আর এসব ফিরে পাব না।”

পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের কাউতলী গ্রামের বাসিন্দা শরিফা খাতুন বলেন, “বন্যায় ঘরভিটার সব মাটি ধসে গেছে। ভেসে গেছে আসবাবপত্র। শুধু ঘরের টিনগুলো রয়েছে।”
এ ঘর আবার কীভাবে ঠিক করবেন জানেন না তিনি।
একই অবস্থা পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার কমবেশি সব ইউনিয়নের মানুষের। পানি নামার পর বাসিন্দাদের চোখে-মুখে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাকুলতা। সবাই সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা চেয়েছেন।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ফেনী শাখার জ্যেষ্ঠ প্রো অর্গানিয়ার (অর্গানাইজার) রুবায়েত-ই-তামান্না জানান, তাদের সংস্থার পক্ষ থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র কিছু পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে।
সংবাদমাধ্যমে আসা প্রতিবেদনের আলোকে জেলার ছাগলনাইয়ার দরিদ্র জোহরা বেগমের ধসে পড়া মাটির ঘরটি পরিদর্শন করা হয়েছে। ঘরটি পুনর্নির্মাণ করার জন্য সংস্থার পক্ষ থেকে জোহারার পাশে দাঁড়াবে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন।
বেড়েছে ডায়রিয়া রোগী
বন্যা পরবর্তী ফেনীর প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রে বেড়েছে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।
প্রতিদিন উপচে পড়া রোগী সামলাচ্ছেন চিকিৎসক ও সেবিকারা। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বন্যাদুর্গত এলাকায় নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন সেনাবাহিনী বিশেষ মেডিকেল টিম ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি’র) মেডিকেল টিম।
ডায়রিয়াজনিত কারণে ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সত্তরোর্ধ্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের।
তিনি বলেন, গত দু'দিন আগে ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনব্যাগ স্যালাইন তার শরীর দিতে হয়েছেন। এখন তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন।
ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর চাপ সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে ডাক্তার ও নার্সদের।
জেনারেল হাসপাতালে শুধু শিশু ও বৃদ্ধরা নয় সেবা দেওয়া নার্সরাও আক্রান্ত হয়েছেন ডায়রিয়ায়।
শুক্রবার হাসপাতালে ডায়রিয়াসহ মোট রোগী ছিল ৪৬৮ জন।
জেনারেল হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালে ডায়রিয়া নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ১২২ জন ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্ত রোগীর ৯০ ভাগই শিশু বলে জানান চিকিৎসকরা।
ফুলগাজী থেকে দুই মাস বয়সি শিশু রাসেলকে জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন বাবা মো. সুমন।

তিনি বলেন, “ঘরে পানি ওঠলে ২১ আগস্ট থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম। আশ্রয়কেন্দ্রেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয় ছেলেটি। এখন না পেরে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।”
২৫০ শয্যার ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আসিফ ইকবাল বলেন, “হাসপাতালটিতে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে মোট শয্যা ১৮টি। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এখানে ডায়রিয়ার রোগী ছিল ১৫৬ জন। শয্যার আট গুণ বেশি ডায়েরিয়ার রোগী হাসপাতাল ভর্তি রয়েছে।”
হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক মোমেনা বেগম বলেন, “বন্যায় ২২ অগাস্ট হাঁটুপানি ভেঙে হাসপাতালে এসেছি। আমাদের কয়েকজন নার্স আসতেই পারেননি। এখন ডায়রিয়ার চিকিৎসা দিতে গিয়ে আমাদেরই অনেকে ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তবুও চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি।”
জেলা সিভিল সার্জন মো. শিহাব উদ্দিন বলেন, “বন্যা পরবর্তী ডায়রিয়ার চাপ খুব বেশি। জেলা সব হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী রয়েছে। তবে ডায়রিয়ার স্যালাইন এবং ওআরএসের সংকট আপাতত তেমন নেই। রোগী আরও বাড়লে স্যালাইনের জোগান দরকার হবে।”
সেতুর মাটি দেবে সংযোগ সড়কে বিশাল গর্ত, যান চলাচল বন্ধ
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার ছোট ফেনী নদীর ওপর নির্মিত সাহেবের ঘাট সেতুর সংযোগ সড়কে মাটি দেবে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল গর্ত। এতে সড়কটি দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় সোনাগাজী উপজেলার সাথে নোয়াখালীর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শনিবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, সাহেবের ঘাট সেতুর পশ্চিম অংশে সংযোগ সড়কের মাঝখানে তৈরি হয়েছে বিশাল গর্তটি। গর্তটি দেখতে উৎসুক মানুষের জটলা।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হক বলেন, গত ২১ অগাস্ট ফেনীর সোনাগাজীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পানির চাপে সোনাগাজী-নোয়াখালী সড়কের সাহেবের ঘাট সেতুর পশ্চিম অংশে সেতুর নিচ থেকে দুই পাশের গার্ডার ব্লক ও মাটি সরে গেছে। একপর্যায় সেতুর সংযোগ সড়কেও ভাঙন দিলে স্থানীয় লোকজন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বালুভর্তি বস্তা দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা করেন।
সোনাগাজী উপজেলার চর চান্দিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান সামছুদ্দিন খোকন বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পার্শ্ববর্তী নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারাও তাদের সঙ্গে সেতুটি রক্ষায় কাজে যোগ দেন। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বালুভর্তি বস্তা ফেলে কিছুটা রক্ষার চেষ্টা করা হয়। তবে রাত থেকে আবারও ভাঙন শুরু হলে শুক্রবার বিকালে সংযোগ সড়কে ভাঙন দেখা দেয় বলে জানান সাবেক এই ইউপি চেয়ারম্যান।

সামছুদ্দিন খোকন আরও বলেন, “সেতুটি নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে সেতুর বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে নির্মাণের ছয় বছরের মধ্যে সেতুর সংযোগ সড়ক ভেঙে সেতুটি হুমকির মুখে পড়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদুর রহমান বলেন, “অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে বন্যার পানির চাপে সেতুতে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা।”
নোয়াখালী সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী সৌম্য তালুকদার বলেন, “সোনাগাজী উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়নের সাহেবের ঘাট ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের সংযোগস্থল ছোট ফেনী নদী ওপর ২০১৬ সালের জুন মাসে সাহেবের ঘাট সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় থাকলেও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার।
“নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সেতুটি উদ্বোধন করেন।”
সওজ'র নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, বন্যার পানির চাপে সাহেবের ঘাট সেতুর সংযোগ সড়ক ভেঙে পড়ার তথ্য পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঢাকা থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষজ্ঞ দল এসে সেতু এলাকা পরিদর্শন করে করণীয় বিষয়ে মতামত দেবেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে।
এর আগে গত ২৬ অগাস্ট সকালে বন্যার প্রবল পানির চাপে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের ২৩ গেইট বিশিষ্ট মুছাপুর রেগুলেটর (স্লুইসগেট) নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
এটি পুনর্নির্মাণ এবং সাহেবের ঘাট সেতুর সংস্কারের দাবিতে শুক্রবার বিকালে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জে কয়েকশ মানুষ সেতু এলাকায় জড়ো হয়ে মানববন্ধন করেন।