Published : 28 Aug 2024, 11:57 PM
পরশুরামের পশ্চিম অলকা গ্রামের বাসিন্দা পিকআপ চালক গোলাম আব্বাস দুপুর বেলা কাজ থেকে বাড়ি ফিরে ভাত খাচ্ছিলেন। তার পিকআপটি রাখা ছিল আঙিনায়। খাওয়ার মাঝমাঝি সময়ে তিনি উঠানে বানের পানি দেখতে পান।
খাওয়া দাওয়া ফেলে আব্বাস পিকআপটি রেখে আসেন বাজারে একটু উঁচু জায়গায়। এরপর বাড়ি ফিরে দেখেন উঠানে পানি আরো বাড়ছে।
দেরি না করে স্ত্রী আর দেড় বছরের সন্তানকে নিয়ে ভাইয়ের পাকা ঘরে উঠলেও রক্ষা মেলেনি। ওই রাতে আব্বাসের ভাইয়ের পাকা ঘরেও পানি উঠে যায়। পরদিন সবাই মিলে ওঠেন এক বন্ধুর পাকা বাড়ির দোতলায়।
গত ১৯ অগাস্টের ওই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আব্বাস জানালেন, তাড়াহুড়ো করে ঘরের কিছুই সঙ্গে নিতে পারেননি। বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার সময় কেবল ফ্রিজে থাকা খাবার আর গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। পরে বন্ধুর বাসাতেই রান্নাবান্না করে খেয়েছেন।
গোলাম আব্বাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমরা ছিলাম স্রোতে, পানির সাথে যুদ্ধ কইচ্ছি আমরা। মুহুরী নদীর বাঁধ ভাঙ্গি প্রথমে আমরা পানির ধাক্কাটা খাইছি।"
পানি কমে এলে বাড়ি ফিরে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখেন আব্বাস। তিনি বলেন, “পানি নামার পর বাড়ি আই দেখি, ভাইয়ের ঘরত হাঁটু সমান মাটি। আমার ঘরের সব শেষ হই গেছে। পরে ভাইয়ের ঘরটা পরিষ্কার করে সেইখানে উইঠছি। সেখানেই থাইকতেছি।”
ফেনীতে স্মরণকালের ভয়াবহ এই বন্যার পানি প্রথমে আঘাত হানে পরশুরাম উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে। দূরে থাকা স্বজনদের অনেকের ধারণা হয়েছিল পরশুরামের অনেকেই আর হয়ত বেঁচে নেই।
কিছু বুঝে উঠার আগেই মুহুরী নদীর বাঁধভাঙা পানির তীব্র স্রোতের মুখে প্রাণ বাঁচাতে তাৎক্ষণিকভাবে টিনের চালা, ঘরের সিলিং, গাছের ডালায় আশ্রয় নেন ওই এলাকার কেউ কেউ।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ফেনীর মানুষ বন্যায় ভুগছে আর পরশুরামের মানুষ পানির সঙ্গে যুদ্ধ করেছে।

পানি যখন হু হু করে বাড়ছিল, স্থানীয়রা যে যার মত আশপাশের পাকা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কেউ ঘরগৃস্থালির সব কিছু চোখের সামনে ভেসে যেতে দেখেছেন। কেবল প্রাণটুকু বাঁচাতে অনেকে টিকে ছিলেন ঘরের চালে।
আর যারা ঘর-বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পেরেছিলেন শেষ পর্যন্ত তিন-চারদিন পর তারা বেঁচে ফিরতে পেরেছেন বাড়িতে। এসে বাড়ি ঘরের করুণ অব্স্থা দেখে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে।
প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর আবার থাকার উপযুক্ত করতে এই মানুষগুলোকে নতুন করে সংগ্রাম শুরু করতে হয়েছে। তাদের ফসলি জমি পানিতে ডুবেছে, ভেসে গেছে জলায়শের মাছ। গোয়ালের গবাদি পশু কিছু বাঁচানো গেছে, কিছু ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আর যা বাড়িতে রেখে গেছেন সেগুলোর কোনো খোঁজ নেই।
একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষগুলো খেয়ে-না খেয়ে টিকে আছেন বটে, কিন্তু সামনে কী হবে জানেন না কেউ।
মুহুরী নদীর উপরের ব্রিজ দিয়ে সামনে যেতেই দেখা গেল বয়ে চলা শান্ত এক নদী। এই নদীর পানিই বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার উপরে উঠে গিয়েছিল। এলাকাবাসী জানান, এত উঁচু ব্রিজও পানিতে ছুঁই ছুঁই করছিল বন্যার কদিন।
নদীর বাঁধের রাস্তা হয়ে সামনে এগিয়ে কিছুদূর যেতেই দেখা গেল বাঁধ ভাঙার চিহ্ন। স্থানীয়রা জানান, সবচেয়ে বড় ভাঙনটা হয়েছে কাউতলি ইউনিয়নের কাশীনগর ও চম্পকনগরের মাঝের দিকটায়।
বড় ভাঙনের জায়গাটি দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি বেশ প্রশস্ত পাকা রাস্তা ছিল। ভাঙা অংশের সামনের বাড়ির বাসিন্দা শিরিন আক্তার জানিয়েছেন, ১৯ অগাস্ট সন্ধ্যায় বাঁধ ভেঙে পানি আসতে থাকায় এলাকাবাসী মেরামতের চেষ্টা করেন। কিন্তু উঁচু আর তীব্র স্রোতের কারণে ব্যর্থ হন তারা।
ঘরের কিছুই অবশিষ্ট নেই জানিয়ে শিরিন আক্তার বলেন, "আমরা ঘরের উপরে আছিলাম। ঘরের কিচ্ছু নাই। আমার দুইটা ছেলের একটা এইবার আইএ-তে (ইন্টারমিডিয়েট) পড়ে। তাই বই-খাতাগুনও ভাসি গেছে।"

একই বাড়ির সদস্য মো. শাহজাহান বলেন, "কেউ ভাবে ন আমরা বাঁচি আছি। আল্লাহর রহমতে আমরা প্রাণে বাঁচি আছি।"
ওই এলাকায় লিপি আক্তার বলেন, "আমি গতকাল ছাগলনাইয়া থেকে আসছি। এইটা আমার বাপের বাড়ি। এই কয়দিন কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি।”
পরিস্থিতি বর্ণনা করে লিপি বলেন, "ছাগলনাইয়াতে দুইতলা ফ্ল্যাট ডোবার মত পরিস্থিতি, এইখানেতো একতলাও নাই। আশ্রয়কেন্দ্র নাই, ৩-৪ তলা স্কুলও নাই। আমিতো মনে করছি যে সব মারাই গেছে। বাড়িঘরতো নাইযে, ওই আশা বাদ দিছি। গরুছাগল বাদ দিছি। শুধু মানুষের চিন্তা কইচ্ছি। মানুষজন বাঁচুক।"
ধ্বংস হয়েছে সবকিছু
অলকা গ্রামের কোনো কাঁচা ঘর অক্ষত নেই। কিছু ঘর একেবারে ভেঙে পড়েছে। এসব ঘরের আসবাব ও বিভিন্ন অংশ ভেসে গেছে পানির তোড়ে।
ভিটের মাটি সরে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠা ঘরগুলোতে নিজেরাই মাটি ফেলে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন বাসিন্দারা।
কাউতলির বাসিন্দা বেলাল বলেন, "আমরা দমদমার (সিলিং) উপরে আছিলাম। গরীবের লেপ তোষক যা আছিল বেগগুন ভাসি গেছে, কিচ্ছু নাই। আমরা এককেরে নিরুপায়।
"আগেরবার পানি আসি কমি যায় গই, কিন্তু এইবার আর টিহন যায় না। পরে মানুষজন আই উদ্ধার কইচ্ছে, সাঁতরাইয়া গেছি পাশের একটা পাকা বাড়িত।"
ঘরে স্বামী, দুই ছেলে ও তাদের স্ত্রীদের নিয়ে বসবাস খোদেজা আক্তারের। তার বাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খাট, আলমিরার ভাঙাচোরা অংশ। ভিটের মাটিও সরে গর্ত তৈরি হয়েছে।
খোদেজা বলেন, "গলা ভাঙ্গি লাইছি, ঘরের লাই কান্নাকাডি করি। ছেলে দুইডা মেস্তুরি কাম করি সংসার চালাইছে। এখন কত লাখ টেকার তলে হইচ্ছি। এগুলা কেমনে মেরামত কইরমু। নিজস্ব কোনো সম্পত্তি নাই।"

ঘরের একই রকম অবস্থা দেখিয়ে কাঁদছিলেন ইয়াসমিন আক্তার। স্বামী থাকেন বিদেশে, নিজেই তিন ছেলেসহ বন্যায় টিকে ছিলেন তোনমতে। এখন কী হবে ভেবে বার বার চোখ ভিজে উঠছিল ইয়াসমিনের।
তিনি বলেন, "একটা কাপড় চোপড় যদি বাচাইতাম পাত্তাম। সকাল বেলা ছোড হোলাডা ঘুমে আছিল, তাড়াহুড়া করি যদি তারে না নিয়া বাইর অইতাম ঘুমের মইদ্যেই মরি যাইত।"
পাশেই দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয় বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ইয়াসমিন, এখনও আছেন সেখানেই।
ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় কিছু হাঁস মুরগী উঁচু টেবিলের উপর রেখে যাওয়ায় সেগুলো বেঁচে আছে। এখন প্রতিদিন বাড়ি এসে ঘরে মাটি ভরাট করার চেষ্টা করছেন।
স্বাভাবিক হয়নি সড়ক যোগাযোগ
মঙ্গলবার পর্যন্ত ফেনীর সঙ্গে পরশুরামের যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি। সড়কের কিছু স্থানে এখনও পানি জমে থাকায় প্রয়োজনে যোগাযোগের ভরসা ট্রাক-পিকআপ।
পানি তেমন না থাকলেও পরশুরাম থেকে গ্রামগুলোতে যাতায়াতেও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। পরশুরাম উপজেলা বাজার ছাড়া প্রায় পুরোটাই ডুবে যাওয়ায় সড়কও ভেঙেছে বিভিন্নস্থানে।
মুহুরীর বাঁধ হয়ে পাকা রাস্তাও বিভিন্নস্থানে ভেঙে পড়ায় বেশকিছু গ্রামে যাতায়াত করতে হচ্ছে পায়ে হেঁটে।
ফসলের মাঠে কিছুই নেই
এমন সময় বন্যায় ভাসলো ফেনী, যখন জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছিল কিছুদিন আগেই। পানি নামার পর পরশুরামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দুয়েকটি বাদে কোনো জমিতেই ধানগাছ দেখা যায়নি।
কাশীনগর গ্রামে চার ছেলে, এক মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে আলমগীর মিয়ার সংসার। তিনি বলেন, "ধান ক্ষেত আছিল আখ খেতও আছিল, সেটাও নাই। ফসল সব শেষ। বাড়িঘর থাকিয়ত লাভ বেগগুন হচি গেছে। পানি যতদুরা লাইগছে ঘরে সব হচি গেছে। ঘর যাওন যায়না গন্ধের লাই।"
কাউতলির খোদেজা আক্তার জানান, তার স্বামী ৫০ হাজার টাকা কিস্তি তুলে তিনকানি জমি বন্ধক রেখে ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু পানিতে আর কিছুই নেই।
তিনি বলেন, "বন্যা ধরলেকি আর থায়েনি? সামনে একটা দানাও হাইতান্নো খাইবার লাগি। ভাততো খাইতো অইবো। হুদিনকালে (গ্রীষ্ম) কী খামু এইবার?"
ক্ষতি হয়েছে গবাদি পশুর
বানের টানে কিছু রক্ষা করতে না পারলেও মানুষ চেষ্টা করেছে পোষা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী বাঁচাতে। যারা পেরেছেন গরু নিয়ে গেছেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও মাদ্রসার ভবনে।
সেটিও না পারলে গরু ছাগল ছেড়ে দিয়েছেন, যদি নিজের মত বেঁচে থাকে এই আশায়। তারপরেও অনেক জায়গায় মৃত গরু পানিতে ভাসতে দেখা গেছে।
অলকা গ্রামের বাসিন্দা গোলাম আব্বাস বলেন, "মানুষ স্রোতে দাঁড়াইতে ফারে না, এরমইদ্যে আমার ভাইয়ের দুইটা গরু আমরা তিন বন্ধু মিলি টানি নিয়া এক স্কুলঘরে তুইলছি। আর একটু দেরি করলেই এগুন মরি যাইত।"
ত্রাণ পৌঁছায়নি, খেয়ে-না খেয়ে যাচ্ছে দিন
পরশুরাম আক্রান্ত হওয়ার পর পানির স্রোত ধেয়ে যায় ফেনী শহরের দিকে। যখন পরশুরামে মানুষের পুরোদমে সহায়তা প্রয়োজন, তখন ফেনীর মানুষও বিপদে। কয়েকদিনের মধ্যে পরশুরাম পর্যন্ত ত্রাণ পৌঁছাতে পারলেও পায়নি আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ।
সড়কের পাশে মানুষজন প্রয়োজনের চেয়েও বেশি পাচ্ছে, আর দূরের মানুষ কিছুই পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করলেন তুলাতুলি এলাকার রিপন দাস।
কাশীনগরের মো. শাহজাহান বলেন, "সব ত্রাণ এদিক ওদিক চলি যায়। আমরা কাশীনগর ও চম্পকনগরের মানুষ বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে কোনরকম খেয়ে আছি। তিনবারেরটা একবার খাই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্তু ঘুরি আইলাম কিছুই পাই নাই।"
চম্পকনগর গ্রামের যুবক সানিয়াত সাহেল শরীফ বলেন, "এদিকে ত্রাণ আসতেছে না, ফেনীতে পানি। আমাদের এখানে যখন বন্যা শেষ তখন তাদের শুরু। কেউতো এ পাশে আসতে পারে নাই। কালকে প্রথম ত্রাণ আসছে।
“এক প্যাকেট বিস্কিট, হাফকেজি চিড়া, হাফকেজি মুড়ি এসব। এর আগে ব্যক্তিগতভাবে ৩০০ পরিবারকে বিস্কিট দেওয়া হইছিল।"
প্রবাসীর স্ত্রী কাউতলির ইয়াসমিন বলেন, "ছোড বাইচ্চাটা ক্ষুধা লাগলে এক মিনিটও সইয্য করে না, কান্দাকাটি শুরু করে। বাইচ্চাগো বাপ এতোদিন পরে সোমবার ফোন দিয়ে কান্দাকাডি শুরু করছে। জামাই কয় আই হুনছি তোমরা মরি গেছগই।"
বন্যার পরে কোনরকম শুকনা খাবার খেয়ে বেঁচে থাকা বেশিরভাগের পরিবারেই এখনও চুলা জ্বলেনি। কেউ কেউ দুয়েকদিন হল চুলা জ্বেলেছেন কিন্তু চাল-ডালের সংকটে দিন পার করার চিন্তায় অস্থির তারা।