উপস্থিত লোকজনের মধ্য থেকে তিনজন প্রতিবেশি সাহসী পুরুষ পাওয়া যায়। তারা এর আগে মৌয়াল হিসেবে সুন্দরবনের ভেতর প্রবেশ করেছিল।
Published : 04 Apr 2025, 12:53 AM
বিকেল গড়িয়ে কখন মেঘ জমা আকাশে টুপ করে সন্ধ্যার আঁধার নেমে গেছে বোঝা যায়নি। ঈদের আনন্দঘন দিনটা তাই শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই যেন শেষ হয়ে গেছে। তাড়াহুড়ো করে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি শেষ করে বাসায় ফিরে আসেন মুরাদুল হাসান। ভ্যাপসা গরমে ঘামে ভেজা পাঞ্জাবিটা হাত গলিয়ে খোলার সময় রান্নাঘর থেকে শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মুরাদুল হাসানের স্ত্রী নাবিলা এগিয়ে আসেন। মাসুলভ আহ্লাদিত বিরক্তভাব নিয়ে ছেলের খোঁজে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার ছেলেটা কোথায় টো টো করে বেড়াচ্ছে বলো তো? সেই যে ভরদুপুরে নাকে-মুখে কয়েকটা ভাত গুঁজে বের হয়েছে, সারাদিন আর তার তো কোনো খবর নেই!’
‘কোথায় আর যাবে! এতদিন পর ঈদ করতে গ্রামে এসেছে, নিশ্চয়ই বন্ধু-বান্ধবদের সাথে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ ‘সন্ধ্যা তো হয়ে গেল, এখন তো বাসায় আসতে পারে। আমার মোবাইলটা তো সাথে করে নিয়ে গেছে। একটা ফোন দিয়ে বাসায় আসতে বলো না!’ নাবিলা কথাটা শেষ করার আগেই মুরাদুল হাসানের মোবাইলটা বেজে ওঠে। মশারির স্ট্যান্ড থেকে তোয়ালে নিয়ে বাইরের টিউবওয়েলে হাতমুখ ধুতে গিয়েও দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে মোবাইলটা হাতে নেন মুরাদ।
মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নাবিলার নাম ও ছবি দেখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একটা হাসি ছড়িয়ে বলেন, ‘এই দেখ তোমার ছেলে নিজেই ফোন করেছে। তোমাদের মা-ছেলের দেখছি ভালোই টেলিপ্যাথি আছে।’ বলতে বলতেই ফোনটা রিসিভ করে কানে দেন। একটা গর্বিত হাসির উজ্জ্বলতা নিয়ে খাটের কাছে দাঁড়িয়ে বাবা-ছেলের ফোনালাপ শুনতে উৎসুক হয় থাকেন নাবিলা। ‘হ্যালো আদনান, কই তুই? হ্যালো...হ্যালো কোথায় বললি! ...হ্যালো আদনান...কী বললি, সুন্দরবন!’
এতটুকু শুনেই নাবিলা খাটের কাছ থেকে পাতলা পদক্ষেপে ছুটে এসে স্বামীর কাছে দাঁড়ান। মুরাদুল হাসান নিজের প্রান্তের নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্য ঠিকমতো কথা শুনতে পাচ্ছেন না মনে করে, ‘হ্যালো কী বললি, শুনতে পাচ্ছি না’– বলতে বলতে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। যতটুকু শুনতে পেয়েছেন তাতেই নাবিলার চোখে মুখে আতঙ্কের ছায়া পড়ে। ‘হায় হায়! ও সুন্দরবন গেছে কার সাথে!’ বলে প্রায় চিৎকার করতে করতে স্বামীর পেছন পেছন ঘর থেকে বের হয় সেও।
‘পথ হারিয়ে ফেলছিস? ...আচ্ছা বাবা, আমরা আসছি… তোরা কোনো চিন্তা করিস না... আচ্ছা আচ্ছা বাবা আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি... ভয়ের কিছু নেই...হ্যালো আদনান…হ্যালো...হ্যালো... সাথে কে কে আছে বললি? ইমরান... জিহান...আর?...মিঠু..হ্যালো...’
কথা ঠিকঠাক শেষ না হতেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নাবিলার চিৎকার শুনে ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে মুরাদুল হাসানের মা আর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী দৌড়ে উঠানে এসে হাজির হয়েছেন। ঠিক কোনকিছু বুঝতে না পারলেও খারাপ কিছু একটা ঘটেছে বুঝে দুজনই মুরাদুল হাসান আর নাবিলাকে হতবিহ্বল দৃষ্টিতে ঘিরে থাকেন। মুরাদুল হাসানের মা দুজনকেই ‘কী হইছেরে মুরাদ? ও বউ কী হইছে?’ প্রশ্নে ব্যস্ত করে তুলেন।
মুরাদুল হাসান চট করে মায়ের প্রশ্নের উত্তরে বলার মতো কিছুই যেন খুঁজে পান না। মাকে ঝাপটে ধরে চিৎকার করে অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করলেও তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হয় না। মায়ের মুখের দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে আবারও মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শাশুড়ির কয়েকবারের জিজ্ঞাসায় নাবিলা এপ্রান্তে স্বামীর কথা শুনে যতটুকু যা বুঝতে পেরেছেন, তাই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকেন, ‘আমাদের আদনান, জিহান, মিঠু আর কার সাথে যেন সুন্দরবন গেছে। পথ হারিয়ে এখন ওরা বনের ভেতর থেকে বের হতে পারছে না’।
নাবিলার কথা শুনে দাঁড়িয়ে থাকা হতবিহ্বল বউ-শাশুড়ি দুজনই ‘হায় হায়’ করে চিৎকার করে উঠেন। কয়েক বছর পর বাড়িতে ঈদ করতে আসা মুরাদুল হাসান, সে মুহূর্তে নিজের করণীয় ঠিক করতে পারেন না। শুধু তিন রমণীয় জটলা থেকে কয়েক পা দূরে সরে গিয়ে মোবাইলে ছেলের সাথে আরেকবার কথা বলার চেষ্টা চালাতে থাকেন। কিন্তু ইথারীয় কোনো সংযোগ স্থাপন করতে না পেরে, তার হাতে থাকা যন্ত্রটি বারবার যান্ত্রিক স্বরে নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়ে দেয়।
এসবের ফাঁকে আদনানের চাচি দৌড়ে ঘরে গিয়ে নিজের মোবাইল থেকে স্বামী শরিফুল হাসানকে ফোন করে সংক্ষেপে ঘটনা জানিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে বলেন। খবর পৌঁছায় ইমরান, জিসান ও মিঠুদের বাড়িতেও। ঈদের আনন্দ ছাপিয়ে দিনের শেষ মুহূর্তে চার কিশোরের বাড়িতে আহাজারি ওঠে। পাড়া জুড়ে এক শোকাবহ শোরগোল শুরু হয়। দুরন্ত উদ্দাম কিশোরদের সমূহ বিপদের সম্ভাবনা নিয়ে সবার মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দেয়।
এতক্ষণে কী কী ঘটতে পারে, কোনদিক দিয়ে কীভাবে তাদের উদ্ধার করা যেতে পারে অথবা আদৌ তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব কি না সেসব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। নানাজনের নানা মত ও পরামর্শ শুনতে গিয়ে করণীয় নির্ধারণে সময় নষ্ট হয়। দ্রুত উদ্ধার করা না গেলে, হারিয়ে যাওয়া কিশোরদের ভবিতব্য অনেককেই ভাবিয়ে তোলে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে চার কিশোরের মায়েদের চিৎকার উপস্থিত সবাইকে বিশেষ করে অন্যান্য কোমলমনা রমণীদের শোকাচ্ছন্ন করে দেয়।
উপস্থিত লোকজনের মধ্য থেকে তিনজন প্রতিবেশি সাহসী পুরুষ পাওয়া যায়। তারা এর আগে মৌয়াল হিসেবে সুন্দরবনের ভেতর প্রবেশ করেছিল। চার কিশোরের পরিবারের সদস্যদের সাথে উদ্ধার অভিযানে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে এগিয়ে আসেন তারা।
শেষ পর্যন্ত অনেককিছু বিবেচনা করে সব মিলিয়ে দশজনের একটি দল চার কিশোরের উদ্ধারে সুন্দরবনের দিকে রওয়ানা দেন। সিদ্ধান্ত হয় তারা আগে শরণখোলা পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে ঘটনা জানিয়ে রিপোর্ট করবেন এবং সেখান থেকে পুলিশ ও বনবিভাগের সহযোগিতা এবং পরামর্শ নিয়ে যা যা করা দরকার, তাই করবেন।
পথে যেতে যেতে জিসানের বাবার মোবাইলে জিসানের ফোন আসে। কিন্তু তারা গাড়িতে থাকার কারণে এবং ওপ্রান্তে নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনার কারণে কোনো কথাই ঠিকমত শোনা যায়নি। মুরাদুল হাসান প্রথমবার কথা বলার পর থেকে এতবার চেষ্টা করেও আর আদনানের সাথে মোবাইলে কথা বলতে পারেননি। আর ইমরানের বাবা রওয়ানা হওয়ার আগেই নিজের শ্বশুরবাড়িতে ফোন করে ঘটনা জানিয়ে শ্যালক শিশিরকে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে বলে দিয়েছেন।
চার কিশোরের বাবা, চাচা ও প্রতিবেশিরা তাদের উদ্ধারের পথে, গাড়িতে। আর বাড়িতে তাদের মা, চাচি ও দাদা-দাদিরা শোকের মাতমে করছে। ‘কেন গেল গো, এতক্ষণে কী জানি হইছে গো, কী কী জানি করতেছে রে, কত কত ডর-ভয় জানি পাচ্ছে গো, কেউ একবার আমার জাদুসোনার সাথে কথা বলাই দেও রে, আহারে আমার জাদুটা সারাদিন না খাইয়া রইছে রে-সেই কখন দুইটা ভাত মুখে দিয়া গেছে গো, আহারে সোনা-তুই সুন্দরবন যাইতে চাস আমারে বলতি-আমি তোরে তোর আব্বার সাথে, না হয় তোর কাকার সাথে পাঠাইতাম রে সোনা।’ এমন করে একেকজন একেক কথা বলে, আফসোস করে, স্মৃতিচারণ করে আহাজারি করছেন।
কেউ বুক চাপড়ে কাঁদছেন, কেউ মাথা কুঁড়ে কাঁদছেন, কেউ কেউ শুধু শূন্য দৃষ্টিতে নীরবে নিঃশব্দে অশ্রুপাত করছেন। সেসব কান্না দেখে দেখে অনেক প্রতিবেশিরাও কান্নায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। সান্ত্বনা দিতে এসে তাদের নিজেদেরই গলা ধরে যাচ্ছে। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে তবু বিভিন্ন কথা বলে সান্ত্বনা দিয়ে তাদের শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের চোখের মণি, কোলের ধন, সোনা জাদু, মানিক রতন কে কী করছে আর কেমন আছে, সেসব চিন্তা তাদের অস্থির ও ব্যাকুল করে রাখে।
চলবে...