কানাডা অভিবাসনের টুকিটাকি ২২: কনসালটেন্ট এর এজেন্ট কি ইমিগ্রেশন সেবার চুক্তি করতে পারে?

কানাডা ইমিগ্রেশনের সেবার নামে প্রতারণা প্রসঙ্গে বলছি। গত এক মাসে  তিনজন প্রতারিত বাংলাদেশি আমার সহায়তা চেয়ে ইমেইল করেছেন। তিনজনের কাহিনী লিখলে এ লেখা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই, কেবল একটি ঘটনার বর্ণনা দেব এ লেখায়। উদ্দেশ্য, কানাডা অভিবাসনে আগ্রহীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

এম এল গনি, কানাডা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 19 August 2021, 05:15 PM
Updated : 19 August 2021, 05:15 PM

দুবাই থেকে যোগাযোগ করেছেন স্বপন (ছদ্মনাম)। 'অ্যাপেক্স কনসালটেন্ট' নামের এক কোম্পানির আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে তিনি তাদের সাথে যোগাযোগ করলেন। এ কোম্পানি কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন নিয়ে কাজ করে বলে তাদের বিজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল। এও লেখা আছে, কানাডার লাইসেন্সধারী এক কনসালটেন্টের তত্ত্বাবধানে 'এপেক্স' ইমিগ্রেশন সেবা দিয়ে থাকে।

তার মানে, দুবাইয়ে অবস্থিত 'এপেক্স কনসালটেন্ট' কানাডার লাইসেন্সধারী কোনও কনসালটেন্টের অনুমোদিত এজেন্ট। এ ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট একজন ভারতীয়-কানাডিয়ান; নাম, নবদ্বীপ। 'এপেক্স' এর বিজ্ঞাপনে এ তথ্যের উল্লেখ ছিল।

স্বপনকে বললাম তার সাথে সম্পাদিত রিটেইনার এগ্রিমেন্ট (চুক্তি) এর একটি কপি আমাকে পাঠাতে। দ্রুতই তিনি তা পাঠালেন। চুক্তিতে দেখলাম কনসালটেন্ট, মানে, নবদ্বীপের পক্ষে 'এপেক্স কনসালটেন্ট'- এর পরিচালক স্বাক্ষর করেছেন। কানাডার প্রতিষ্ঠান আইসিসিআরসি'র নিয়মানুযায়ী এ চুক্তি বৈধ নয়। কারণ, ইমিগ্রেশন বিষয়ক সার্ভিসের চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে হয় সরাসরি ক্লাইয়েন্ট এবং কনসালটেন্ট এর মধ্যে। কনসালটেন্টের এ দায়িত্ব এজেন্টকে ডেলিগেট করা, বা দেওয়া যায় না। অর্থাৎ, কনসালটেন্টের পক্ষে অন্য কেউ ক্লায়েন্টের সাথে ইমিগ্রেশন সেবার চুক্তি সম্পন্ন করতে পারেন না। করলে, তা হবে একটি অকার্যকর চুক্তি।

'কনসালটেন্টের নির্দেশনা’য় স্বপন সাহেবের কাছে পাঠানো একটি ‘ইনিশিয়াল অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ তিনি আমাকে দেখালেন। তিন পৃষ্ঠার ওই রিপোর্টের শেষে লেখা আছে, তিনি কানাডার ইমিগ্রেশনের আবেদন দাখিলের উপযুক্ত, বা ‘এলিজিবল’। একই সঙ্গে ইমিগ্রেশন আবেদন প্রস্তুত এবং সাবমিশনের জন্য কয়েক হাজার ডলার ফি দেওয়ার শর্ত সম্বলিত দ্বিতীয় একটি চুক্তিপত্রও স্বপন সাহেবকে 'এপেক্স কনসালটেন্ট' পাঠিয়েছে। দ্বিতীয় চুক্তিটি সম্পাদনের আগে পরিচিত কেউ একজন স্বপন সাহেবকে বলেছেন সার্বিক বিষয়টি আমাকে দিয়ে দেখিয়ে নিতে। সেভাবেই তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন।

প্রাথমিক অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টের জন্য মাত্র ১০০ ডলার ফি নেওয়া হয়েছে যা তেমন বড় অংকের নয়। স্বপন সাহেবের কাছে জানতে চাইলাম প্রফেশনাল ফি গ্রহণ করে কনসালটেন্ট নবদ্বীপ তাকে কোনও রসিদ দিয়েছেন কিনা। জানা গেল, নবদ্বীপ নয়, 'এপেক্স কনসালটেন্ট' তাকে একটা রসিদ দিয়েছে। নিয়মানুযায়ী, ফি নিয়ে কনসালটেন্ট স্বয়ং রসিদ দেওয়ার কথা।

এক্ষেত্রেও অনিয়ম দেখে ভাবলাম নবদ্বীপের সাথে যোগাযোগ করি। কারণ, একজন রেজিস্টার্ড কানাডীয় ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট (আরসিআইসি) এ বিষয়গুলো না জানার কথা নয়। নবদ্বীপের সঙ্গে যোগাযোগের আরো একটি কারণ হলো, ক্লাইয়েন্টের প্রোফাইল দেখে আমার আদৌ মনে হয়নি তিনি কানাডা ইমিগ্রেশনের আবেদন দাখিলের উপযুক্ত। বাস্তবতা হলো, তিনি এখনো আইইএলটিএস পরীক্ষাই দেননি।

কানাডার ইমিগ্রেশন কন্সাল্টেন্টদের পাবলিক রেজিস্ট্রি (https://secure.iccrc-crcic.ca/search-new/EN) থেকে নবদ্বীপ এর ইমেইল অ্যাড্রেস খুঁজে নিয়ে তাকে বিস্তারিত জানালাম। ই-মেইলের উত্তরে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে আমাকে বললেন,  “এপেক্স কনসালটেন্ট' তার নাম ব্যবহার করলেও বাস্তবে এ কোম্পানি তার এজেন্ট নয়, এবং তিনি এ বিষয়ে কিছুই অবগত নন।” এ কারণে নবদ্বীপ এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতেও অপারগতা প্রকাশ করলেন। নবদ্বীপের উত্তরটি আমি সাথে সাথে স্বপন সাহেবের কাছে ফরোয়ার্ড করে দিলাম। নবদ্বীপ আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, 'ভাগ্যিস আপনার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম, নইলে তো আমাকে কয়েক হাজার ডলার হারাতে হতো!'

চলুন, এবার ঘটনার যৌক্তিক পর্যালোচলা করি। দেখা যাক, কনসালটেন্ট নবদ্বীপ কি বাস্তবেই এ ঘটনায় জড়িত না, বা জড়িত থেকেও আমার হস্তক্ষেপ দেখে নিজেকে আড়াল করেছেন?- এর যে কোনওটিই কিন্তু হতে পারে। কিভাবে?

এরকম আরও কয়েকটি ঘটনায় আমি দেখেছি, কিছু সুযোগসন্ধানী কনসালটেন্ট আসলে দুবাই, ঢাকা, ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের 'এজেন্ট' নিয়োগ করে রাখেন। এ নিয়োগ মুখে মুখে, মানে, অফিসিয়াল নয়। যে সব ক্লাইয়েন্ট সহজ-সরল প্রকৃতির, বা বেশি খোঁজ খবর নিতে অনাগ্রহী তাদের কাছ থেকে যোগসাজসে বিভিন্ন কায়দায় অর্থ হাতিয়ে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করেন। আর, ধরা পড়ে গেলে, বা মাঝখানে আমার মতো কেউ হস্তক্ষেপ করে বসলে তখন কনসালটেন্ট ওই এজেন্ট বা ক্লাইয়েন্টকে চেনেন না বলে প্রতারণার জাল হতে নিজেকে আড়াল করেন।

এর বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে। অর্থাৎ, কনসালটেন্ট আসলেই জানেন না যে তার নাম ব্যবহার করে কেউ অবৈধ ব্যবসা করছে। এ প্রেক্ষাপটে আমরা শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারিনা আদতে এ ঘটনায় নবদ্বীপের সংশ্লিষ্টতা আছে, কি নেই।

এভাবে কানাডার অভিবাসন পরামর্শকের তথাকথিত এজেন্টের হাতে প্রতিদিনই হাজার হাজার ইমিগ্রেশন প্রত্যাশী প্রতারিত হচ্ছেন। এ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে বিষয়গুলো জেনে নেবার বিকল্প নেই। ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট, রেগুলেশন, বাই ল ইত্যাদির বেশি গভীরে না গিয়েও সাধারণ কিছু বিষয়ে নজর রাখলেই এজেন্ট নামক দুষ্টচক্রের হাতে আপনি প্রতারিত হচ্ছেন কিনা আঁচ করতে পারবেন।

মনে রাখুন, কনসালটেন্টের এজেন্ট কখনোই আপনার সাথে ইমিগ্রেশন সেবার চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে না, আপনার কাছ থেকে প্রফেশনাল ফি নিতে পারে না, আপনার ইমিগ্রেশন সম্ভাবনার অ্যাসেসমেন্ট করতে পারে না, বা আপনাকে ইমিগ্রেশন বিষয়ক কোন পরামর্শ (যেমন, প্রোগ্রাম নির্ধারণ) দিতে পারে না।

বিধি অনুযায়ী, এসব কাজ সরাসরি কনসালটেন্ট-কেই করতে হয়। এজেন্ট কেবল ক্লাইয়েন্ট এবং কনসালটেন্টের মধ্যে ডকুমেন্টের আদান-প্রদান করতে পারেন, বা কনসালটেন্টের পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারেন। এর বাইরে কিছু করলে সেই এজেন্টকে সন্দেহের চোখে না দেখাই বোকামো। সন্দেহজনক এজেন্টের ক্ষেত্রে তার কন্সাল্টেন্টকে সরাসরি ইমেইল বা ফোন করে এজেন্টের পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেন। উপরে প্রদত্ত ওয়েবলিংক ব্যবহার করেও মুহূর্তেই এজেন্টের তথ্য যাচাই করে নিতে পারেন। উল্লেখ্য, পৃথিবীর কোথাও আমাদের কোম্পানি, এমএলজি ইমিগ্রেশন- এর কোন এজেন্ট নেই।

এ লেখা আর দীর্ঘ না করি। বর্তমান লেখা বা, কানাডায় পড়াশোনা, বা অভিবাসন বিষয়ে কোনও বিশেষ প্রশ্ন থাকলে আমাকে নিচের ইমেইল ঠিকানায় জানাতে পারেন। পরের কোনও লেখায় আপনার আগ্রহের প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়াস থাকবে। তবে, বর্তমান পর্বসহ এ সিরিজের আগের পর্বগুলোতে কানাডা ইমিগ্রেশন বিষয়ে যে সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে, তা যেন কোনভাবেই আইনি পরামর্শ হিসেবে বিবেচনা করা না হয়। কারণ, সুনির্দিষ্ট আইনি পরামর্শ দেওয়া হয় ব্যক্তিগত সাক্ষাতে, সাধারণ আলোচনায় নয়।

এছাড়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ নিয়মিত চোখ রাখুন কানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে আমার নতুন নতুন লেখা পড়তে। ভবিষ্যতে আপনাদের সাথে আরো অনেক মূল্যবান তথ্য সহভাগের প্রত্যাশা নিয়ে আজ এখানেই শেষ করি।

লেখক: কানাডীয় ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট, আরসিআইসি।

ইমেইল: info@mlgimmigration.com; / ফেইসবুক: ML Gani

এ সিরিজের বাকি লেখা:

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক