কানাডা অভিবাসনের টুকিটাকি-০৩: কনসালটেন্ট কতটা জরুরি?

প্রাসঙ্গিক বলেই বাবার কথা দিয়ে শুরু করছি আজকের পর্ব। তিনি একজন সরকারি কর্মচারী ছিলেন। সব চাকরিতে উপরির সুযোগ সমান নয়। তবে, তিনি যেখানে চাকরি করতেন সেখানে তার উপরে বা নিচের পদের অনেকেরই একাধিক বাড়িগাড়ি ছিল।

এম এল গনি, কানাডা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 July 2020, 04:28 PM
Updated : 16 July 2020, 07:08 PM

আর, তিনি মারা গেছেন আমাদের গ্রামের সেমিপাকা বাড়িতে। চট্টগ্রাম শহরেও আমাদের কোনও প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি, গাড়ি দিয়ে যাননি তিনি। দুর্নীতি করে হজে যাবার বিরোধী ছিলেন বলে তাও তাকে দিয়ে হয়ে উঠেনি।

এ অবস্থায়ও গ্রামের কিছু টাউট-বাটপার তাকে নিষ্কৃতি দেননি। একে একে পঁয়ত্রিশটি ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে তাকে বিব্রত ও হয়রানি করার চেষ্টা করা হয়েছে বিভিন্ন সময়। কোর্টে এই মামলাগুলোতে উকিল নিয়োগ দেওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না বাবার। তাই, প্রায় প্রতিটি মামলায় তিনি নিজেই নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন। আইনে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও অনেক নতুন আইনজীবী সে আমলে তার কাছে বিভিন্ন আইনের ব্যাখ্যা শুনতে আসতেন সময়-অসময়। জেনে অবাক হবেন, প্রতিটি মামলায় তার পক্ষেই রায় হয়েছিল।

বাবার গল্প এ কারণে, আদালতে কোন মামলায় নিজেকে উপস্থাপন করতে উকিল নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়, তিনি যা প্রমাণ করেছেন। আইনের ধারা-উপধারা ঠিকমত জানলে আপনি নিজেই নিজেকে আদালতে উপস্থাপন করতে পারেন। কানাডায় অভিবাসনের বিষয়টিও ব্যতিক্রম কিছু নয়।

সবকিছু ঠিকঠাক জানা থাকলে আপনি নিজেই আপনার কনসালটেন্ট বা আইনজীবীর ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে প্রশ্ন হলো, দ্রুত পরিবর্তনশীল কানাডা অভিবাসনে চাহিদা বা নিয়মনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে আপনি নিজেকে কতটা হালনাগাদ রাখতে সক্ষম, এবং একইসাথে, ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট, রেগুলেশন, মিনিস্টারিয়াল ইন্সট্রাকশন, প্রোগ্রাম ডেলিভারি আপডেইটস, ইত্যাদির যথাযথ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম তার উপরই নির্ভর করছে এ গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে নেবেন কিনা।

মোটকথা, ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট বা আইনজীবী ছাড়াই আপনি কানাডা অভিবাসনের আবেদন করতে পারেন, যদি আপনার পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সময় হাতে থাকে। একজন ইমিগ্রেশন প্রফেশনাল (কনসালটেন্ট বা লইযার) কোনোভাবেই আপনার আবেদন ত্বরান্বিত করতে পারেন না। আপনার কাজ ‘হয়ে যাবে’ - এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার এখতিয়ারও তাদের নেই। দিলে তা বেআইনি। এবার আপনাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেব যা একজন ইমিগ্রেশন প্রফেশনাল নিয়োগ দিলে আপনার অবশ্যই জানা উচিত।

ইমিগ্রেশন প্রফেশনাল আপনাকে ফি না নিয়ে কাজ করে দিলে তার সঙ্গে কোনো লিখিত চুক্তি না করলেও চলে। কিন্তু, তিনি যদি আপনার কাছ থেকে এক টাকাও ফি নেন, তাহলে লিখিত চুক্তি করতে তিনি বাধ্য। চুক্তি ইলেকট্রনিক্যালিও হতে পারে। এ ধরনের চুক্তিতে কনসালট্যান্টকেই সই করতে হয়; তাঁর কোনো রিপ্রেজেনটেটিভ নয়। তাঁর নামের পাশে মেম্বারশিপ নম্বর থাকাও বাধ্যতামূলক। মেম্বারশিপ নম্বর শুরু হয় ইংরেজি বর্ণ ‘আর’ দিয়ে, যেমন, আর৯৩০৫০০। এই নম্বরটি গুগলে দিয়ে সার্চ করলেই আপনি বুঝে যাবেন, এ আসল না নকল। অনেক সময় দেখা যায়, কোম্পানির অন্য কোন কর্মকর্তা, যিনি নিজে কনসালটেন্ট নন, তিনি আপনার সাথে চুক্তিতে সই করছেন। তা কিন্তু আইনের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়।

মনে রাখবেন, চুক্তিতে অনেক কঠিন শর্ত লুকিয়ে থাকে। তাই চুক্তির সবকিছু মনোযোগ দিয়ে না পড়ে ‘রাজি আছি’ বা, 'আই এগ্রি'; লিখে না দেন যেন। কেননা, আপনি কোনো কারণে কানাডার প্রতিষ্ঠান আইসিসিআরসির কাছে আপনার কনসালটেন্ট বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করলে তারা চুক্তির বাইরে গিয়ে আপনার জন্য কিছু করতে পারবে না। আমি ইংরেজি বুঝিনি- বলেও কোন সুবিধা পাবেন না। আইসিসিআরসি হলো কানাডার একটি সংস্থা, যা কানাডার রেজিস্টার্ড ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টদের আচরণবিধি প্রণয়ন ও তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। এটি একটি রেগুলেটরি বডি। এই বডিই কনসালটেন্টদের লাইসেন্স দেয় বা ফিরিয়ে নেয়, বা উপযুক্ত ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়।

কিছু কিছু কনসালটেন্ট আপনাকে ফ্রি ইনিশিয়াল পরামর্শ দিচ্ছেন দাবি করে তড়িঘড়ি আপনার সঙ্গে ফুল ইমিগ্রেশন আবেদনের চুক্তি করে কয়েক হাজার ডলার নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সাধারণত চুক্তিতে লেখা থাকে টাকা অফেরতযোগ্য। এ ধরনের অবস্থায় নিজেকে রক্ষার দায়িত্ব কিন্তু আপনারই। এর চেয়ে বরং লিখিত চুক্তির মাধ্যমে দুই-তিনশ ডলার খরচ করে হলেও একটা ডিটেইল ইনিশিয়াল অ্যাসেসমেন্ট করিয়ে নিয়ে আপনার প্রাথমিক যোগ্যতা বা এলিজিবিটি পরখ করে নেওয়াই উত্তম। অ্যাসেসমেন্টের পর উপযুক্ত বা এলিজিবল সাব্যস্ত হলে তবেই ফুল ইমিগ্রেশনের আবেদনে গেলেন, না হয় গেলেন না। এভাবে নিজেকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারেন।

আরেকটি কথা, রেজিস্টার্ড ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টরা আপনার আবেদন কানাডার ইমিগ্রেশন অফিসে (আইআরসিসি) জমা দেওয়ার আগে আবেদনে উপস্থাপিত সব তথ্য সঠিক আছে বলে আপনার কাছ থেকে একটা লিখিত সম্মতি আদায় করে নেন। এ ধরনের সম্মতিতে স্বাক্ষর করার আগে শতভাগ নিশ্চিত হবেন যে আবেদনে আপনার সম্পর্কে যেসব তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে, তা সঠিক। কারণ, ভুল হলে তার পুরো দায়ভার কিন্তু আপনার, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টের নয়। ইমিগ্রেশনের ভাষায় এই ভুলকে বলে ‘মিসরেপ্রেজেন্টেশন'। এটি একটি অপরাধ। এ ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আপনার আবেদন বাতিল তো হবেই, বরং আপনাকে কয়েক বছরের জন্য কানাডা প্রবেশে নিষিদ্ধও করা হতে পারে। এমন ঘটনা নেহায়েত কম নয়।

গুগল রিভিউ দেখে অনেকে ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট সিলেক্ট করেন। কিন্তু সব রিভিউ যে সত্যিকারের ক্লায়েন্টরা দিচ্ছেন তা নাও হতে পারে। এ ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন। সবচেয়ে কার্যকর, কারও মৌখিক রেফারেন্স।

এছাড়া কোন কনসালটেন্ট সম্পর্কে আগে থেকেই আপনার ইতিবাচক ধারণা থাকলে তাও কাজে লাগাতে পারেন। ইন্টারনেটের তথ্য শতভাগ কোনোভাবেই বিশ্বাস করবেন না। এভাবে অন্ধ বিশ্বাস করে অনেকে ঠকছেন।

এবার শুনুন, আপনি যাকে কনসালটেন্ট বলে মানছেন তিনি আসলে কানাডার অনুমোদিত কনসালটেন্ট (আরসিআইসি) কিনা। কানাডার আইন অনুযায়ী আপনাকে কানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে পরামর্শ দিতে পারেন একমাত্র কানাডার অনুমোদিত ইমিগ্রেশন প্রফেশনাল, অন্য কেউ নয়। প্রশ্ন জাগে, কনসালটেন্ট ভুয়া হলে ক্ষতি কী? ক্ষতি অবশ্যই আছে। ভুয়া কনসালটেন্ট নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি কানাডার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের নজরে এলে আপনার ইমিগ্রেশন আবেদন বাতিল হতে পারে। মিসরেপ্রেজেন্টেশনের কারণে আপনাকে কানাডা ইমিগ্রেশনের আবেদন দাখিলে কয়েকবছরের অযোগ্যও ঘোষণা করা হতে পারে।

নিচের লিংক/রেজিস্ট্রিতে নাম নেই এমন কোন ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার কানাডার রেগুলেটর, বা আইসিসিআরসি'র নেই। ফলে, কনজ্যুমার প্রটেকশন নিশ্চিতকরণ কানাডার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পরে। কানাডা কখনোই চায় না বিশ্বের কোথাও কানাডা ইমিগ্রেশনের আবেদনকারীরা কোনও ঠগবাজের পাল্লায় পড়ুক। কানাডা সরকারপ্রণীত নিচের লিংক বা রেজিস্ট্রি থেকে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন আপনার কনসালটেন্ট আদৌ কানাডার ইমিগ্রেশন অফিসের অনুমোদিত কিনা: https://iccrc-crcic.ca/find-a-professional/

এ লেখা আর দীর্ঘায়িত না করি। কানাডায় পড়াশোনা, বা ইমিগ্রেশন বিষয়ে কোনও বিশেষ প্রশ্ন থাকলে আমাকে নিচের ইমেইল ঠিকানায় জানাতে পারেন। পরের কোনও লেখায় আপনার আগ্রহের প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়াস থাকবে।

এছাড়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ নিয়মিত চোখ রাখুন কানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে আমার লেখা পড়তে। আপনাদের সাথে আরো অনেক মূল্যবান তথ্য সহভাগের আগ্রহ নিয়ে আজ এখানেই শেষ করি।

লেখক: কানাডীয় ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট, আরসিআইসি।

ইমেইল: info@mlgimmigration.com

এ সিরিজের বাকি লেখার লিংক:

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক