কানাডা অভিবাসনের টুকিটাকি ১৩: কানাডার ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে যেটুকু না জানলেই নয় 

কানাডার অনুমোদিত ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট বা আরসিআইসিদের প্রায় সবাই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কায়েন্ট এর কাছ থেকে প্রতিদিনই যে প্রশ্নটি শুনে থাকেন তা হলো- ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কানাডায় কীভাবে আসা যায়?

এম এল গনি, কানাডা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 Jan 2021, 05:35 PM
Updated : 5 Jan 2021, 05:35 PM

কানাডা সরকার বিদেশি নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন প্রকারের ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করে। যেমন, ওপেন ওয়ার্ক পারমিট, রেস্ট্রিক্টেড ওয়ার্ক পারমিট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ওয়ার্ক পারমিট, এমপ্লয়ার স্পেসিফিক ওয়ার্ক পারমিট, ইত্যাদি। এর মধ্যে কানাডা ইমিগ্রেশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলো পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ওয়ার্ক পারমিট, বা সংক্ষেপে পিজিডব্লিউপি। এ পর্বে তা নিয়েই কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়াস চালাবো।

কানাডায় যেসব বিদেশি নাগরিক পড়াশোনা করতে যান তাদের বলে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট, বা বিদেশি শিক্ষার্থী। কানাডার পিআর বা সিটিজেনদের তুলনায় ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট-দের টিউশন ফি কয়েকগুণ বেশি।

কানাডার অনুমোদিত কিছু স্টাডি প্রোগ্রাম আছে যেগুলোতে পড়তে গিয়ে তা সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হলে একজন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট পিজিডব্লিউপি প্রোগ্রামের আওতায় ওপেন ওয়ার্ক পারমিট পেতে পারেন। ওপেন ওয়ার্ক পারমিটের অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট ছাত্র কানাডার যে কোন এলাকায় যে কোন নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করার অনুমোদন পাবে।

অনুমোদিত স্টাডি প্রোগ্রাম শেষ করার একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিট'এর আবেদন দাখিল করতে হয়। আবেদনের তারিখে কানাডায় ভিজিটর বা স্টুডেন্ট হিসেবে ভ্যালিড (কার্যকর) ভিসা থাকতে হয়। অর্থাৎ, একজন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টকে তার ভিসার মেয়াদ বা পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে কিনা তা মাথায় রাখতে হয়। তাছাড়া, পড়ালেখাকালীন ফলাফলও সন্তোষজনক হতে হবে। অন্যথায়, পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিট এর আবেদন পর্যালোচনাকারী ভিসা অফিসার 'ডিড নট অ্যাকটিভ্লি পারস্যু স্টাডি' মন্তব্য লিখে অনুমোদন নাও করতে পারেন।

এ কারণে একজন শিক্ষার্থী যখন পড়াশোনার সাবজেক্ট বা স্টাডি প্রোগ্রাম পছন্দ করবেন তখন তা যেন খুব কঠিন কোন প্রোগ্রাম না হয় সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন্য কানাডায় পড়াশোনা করা ব্যয়সাপেক্ষ। এ বিবেচনায় পড়াশোনা চলাকালীন অবস্থায় কানাডা তাদের কাজ করার সুযোগ দিয়ে থাকে। সচরাচর সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা, এবং কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে বা ছুটির সময়ে ফুলটাইম কাজ করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ দেওয়া হয়।

স্টাডি পারমিটের শর্ত হিসেবে কয় ঘণ্টা কাজ করা যাবে বা আদৌ কাজ করা যাবে কিনা তা উল্লেখ করা হয়। একজন শিক্ষার্থীকে শর্তগুলো মনোযোগ সহকারে মেনে চলে কাজ করতে হয়। কারণ, শর্ত অমান্য করলে পরবর্তীতে পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

আরেকটি বিষয় একজন ছাত্রের পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিট এর অনুমোদন পেতে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তা হলো, বিশেষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া পড়াশোনায় বিরতি দেওয়া।

কানাডার রেজিস্টার্ড ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট (আরসিআইসি) হিসেবে একজন ছাত্রের এমন একটি ঘটনা কিছুদিন আগে আমাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। কলেজকে না জানিয়েই তিনি পারিবারিক প্রয়োজনে তার দেশে গিয়েছিলেন। ফলে, প্রায় তিন সপ্তাহ তার পড়াশোনায় বিরতি পড়ে গিয়েছিল, যদিও তিনি দেশ থেকে যোগাযোগ করে বিষয়টি পরবর্তীতে তার কলেজকে জানিয়েছিলেন। সঙ্গতকারণেই, পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিট এর আবেদন করার সময় এটি একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যাই হোক, বিভিন্ন নথিপত্র প্রমাণ হিসেবে হাজির করে শেষতক বিষয়টি নিস্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে।

পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিটপ্রাপ্ত একজন ছাত্র ফুলটাইম বা পূর্ণকালীন কাজ করতে পারেন। আগেই বলেছি, এ ধরনের ওয়ার্ক পারমিট ওপেন ওয়ার্ক পারমিট; অর্থাৎ, যে কোন এমপ্লয়ারের অধীনে কানাডার যে কোন প্রদেশে কাজ করা যায়। এভাবে কানাডায় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে একজন বিদেশি শিক্ষার্থী এক পর্যায়ে দক্ষ কর্মীতে (স্কিল্ড ওয়ার্কার) উন্নীত হয়, এবং আরো পরে তা তাকে কানাডার স্থায়ী অভিবাসী (পিআর) হতেও উপযোগী করে তোলে। এক কথায় পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিটে কাজ করার সুবিধা একজন বিদেশি নাগরিককে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ধাপে ধাপে প্রস্তুত করে তোলে।

পিজিডব্লিউপি প্রোগ্রাম নানাভাবে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের সাহায্য করে। যেমন, এ প্রোগ্রামের  আওতায় তারা কানাডা ইমিগ্রেশনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে; কানাডায় পড়াশোনা করতে তাদের যা খরচ হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ কানাডায় কাজ করে আয় করার সুযোগ লাভ করে, যে কারণে কানাডার পিআর (স্থায়ী অভিবাসন) পেতে ব্যর্থ হলেও তাদের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। যাদের পিআর আবেদন অনুমোদন পায় তাদের ক্ষেত্রে বলা চলে পিজিডব্লিউপি অস্থায়ী অভিবাসন (টেম্পোরারি রেসিডেন্স) ও স্থায়ী অভিবাসন (পিআর) এর মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।

একজন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট জীবনে কেবল একবার পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিট পেতে পারে। এ পারমিট বিভিন্ন মেয়াদের হতে পারে। সাধারণভাবে একজন শিক্ষার্থী কতো বছরের লেখাপড়া সম্পন্ন করেছেন তার উপর ভিত্তি করে এ ধরনের ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। তবে চলমান নিয়মানুযায়ী কোন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টকে একাধারে তিন বছরের বেশি সময়ের জন্য পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হয়না। দুই বা তিন বছরের স্টাডি প্রোগ্রাম সম্পন্ন করলে তিন বছরের ওয়ার্ক পারমিট পেতে আমি দেখেছি।

এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়। তা হলো, কানাডায় স্কিল্ড ওয়ার্কার হিসেবে ইমিগ্রেশন পেতে হলে পিজিডব্লিউপি ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে এনওসি জিরো, এ বা বি লেবেলের কাজ করতে হয়। এর নিচের লেবেলের কাজ করে স্কিল্ড ওয়ার্কার হিসেবে ইমিগ্রেশনের আবেদন দাখিল করা যায় না। এ বিষয়টি মাথায় রাখাও একান্ত জরুরি।

যাক, এ লেখা দীর্ঘ করে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাবো না। কানাডায় পড়াশোনা, বা ইমিগ্রেশন বিষয়ে কোনও বিশেষ প্রশ্ন থাকলে আমাকে নিচের ইমেইল ঠিকানায় জানাতে পারেন। পরের কোনও লেখায় আপনার আগ্রহের প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়াস থাকবে। অধিকন্তু, বর্তমান পর্বসহ এ সিরিজের অন্য পর্বগুলোতে কানাডা ইমিগ্রেশন বিষয়ে যে সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে তা যেন কোনভাবেই লিগ্যাল অ্যাডভাইস বা, আইনি পরামর্শ হিসেবে বিবেচনা করা না হয়। কারণ, সুনির্দিষ্ট আইনি পরামর্শ দেওয়া হয় ব্যক্তিগত সাক্ষাতে, সাধারণ আলোচনায় নয়।

এছাড়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ নিয়মিত চোখ রাখুন কানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে আমার নতুন নতুন লেখা পড়তে। ভবিষ্যতে আপনাদের সাথে আরো অনেক মূল্যবান তথ্য সহভাগের আগ্রহ নিয়ে আজ এখানেই শেষ করি।
 

লেখক: কানাডীয় ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট, আরসিআইসি।

ইমেইল: info@mlgimmigration.com / ফেইসবুক: ML Gani

এ সিরিজের বাকি লেখা:

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক