কানাডা অভিবাসনের টুকিটাকি ১১: একজন কানাডিয়ান কাকে কানাডায় স্পনসর করতে পারেন, কাকে পারেন না?

দেশ থেকে এক বোন আমাকে ফেইসবুকে মেসেজ দিলেন এভাবে- 'ভাইয়া, কানাডা-প্রবাসী এক লোক দেশে এসেছেন কিছুদিন আগে। তিনি বলেছেন, তিনি নাকি আমাকে স্পন্সর করে কানাডা নিয়ে যেতে পারবেন। ভাবলাম, আপনার সাথে কথা বলে নিশ্চিত হই। এটা সম্ভব কিনা জানাবেন?'

এম এল গনি, কানাডা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Dec 2020, 01:59 AM
Updated : 8 Dec 2020, 01:59 AM

তার কাছে জানতে চাইলাম, 'তিনি কি আপনার নিকটাত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ কেউ?'

- না, এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় হয়েছে মাস দুয়েক আগে। তবে, প্রায়ই কথা হয় তার সাথে, দেখাও হয়।

একটু বিস্তারিত জানতে মন চাইলো। তাই মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি কী করেন জানতে পারি?'

- আমি একজন ডিভোর্সি; তবে, বাচ্চাকাচ্চা নেই।

উনি কি আপনাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক?

- জ্বি, উনি তাই বলছেন।

তাহলে বিয়ে করে ফেলতে বলুন আগে।

- না, উনি বলেছেন বিয়ে করে বউ হিসেবে কানাডায় নিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তাই, আগে গেস্ট হিসেবে স্পন্সর করে কানাডা নিয়ে যাবেন; তারপর, ওখানেই বিয়েশাদির ব্যবস্থা হবে...

যা বোঝার বুঝে নিলাম- এই মেয়ে কোন এক প্রতারকের পাল্লায় পড়েছে। কারণ, কানাডায় এভাবে কাউকে স্পন্সর করে নেওয়া যায় না। এ ঘটনা মাথায় রেখে আজকের এ লেখায় কানাডার স্পনসরশিপ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবো ঠিক করেছি।

প্রথমেই বলছি কে বা কারা স্পন্সর করার যোগ্যতা রাখেন? ধরুন, কানাডায় কেউ একজন পড়াশোনা করতে গেছেন, বা চাকরি নিয়ে গেছেন। তিনি কি তার কোনও স্বজনকে বাংলাদেশ বা অন্য কোন দেশ স্পন্সর করে কানাডায় আনতে পারবেন?

উত্তর- না। স্পন্সর করার যোগ্যতা রাখেন কেবল কানাডার কোনও স্থায়ী অভিবাসী (পিআর) বা নাগরিক (সিটিজেন)। শুধু পিআর বা সিটিজেন হলেই হবে না, স্পন্সরশিপের যোগ্যতা অর্জনের জন্য তাকে কানাডায় বসবাসও করতে হবে, বা, নিদেনপক্ষে যাকে স্পন্সর করছেন তিনি কানাডার মাটিতে পা রাখার সাথে সাথে স্পন্সরকারিকেও তার সাথে কানাডায় বসবাস করার অঙ্গীকার করতে হবে। এ কারণে অনেক কানাডিয়ান কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না বলে, তারা চাইলেও স্বজনদের কানাডায় স্পন্সর করে আনতে পারেন না। বলার অপেক্ষা রাখে না, কানাডার অনেক নাগরিক চাকরির কারণে পাশের দেশ আমেরিকায় বসবাস করেন।

প্রশ্ন জাগে, কেন স্পন্সরকারিকে কানাডায় বসবাস করতে হবে? কারণ শুনুন। স্পন্সরশিপ নিয়ে যে স্বজন কানাডায় আসছেন তার বা তাদের দেখভাল এবং নিত্য প্রয়োজনীয় খরচাদি মেটানোর জন্য তাদের আশেপাশে থেকেই এক ধরনের পাহারা দিয়ে থাকতে হয়। কানাডা সরকারের সাথে স্পন্সরকারির এ বিষয়ে লিখিত চুক্তি হয়, যে স্বজনকে দেশ থেকে স্পন্সর করে নিয়ে আসা হচ্ছে তার বা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে তিনি বাধ্য। ক্ষেত্রবিশেষে এ বাধ্যবাধকতা অনেক দীর্ঘ সময়, যেমন, বিশ বছর পর্যন্তও হতে পারে। এ সময়সীমার মধ্যে দেশ থেকে আসা মেহমান যদি কোনও কারণে কানাডা সরকারের আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা (সোশ্যাল অ্যাসিস্টান্স বা, ওয়েলফেয়ার) গ্রহণ করে থাকেন তা কানাডাকে ফেরত দিতেও স্পন্সরকারি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকেন। একবার ভেবে দেখুন, এটা কোন মাপের গুরুদায়িত্ব! 

আপনি এ ধরনের অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে রাজি হলেই কি যে কাউকে কানাডায় স্পনসর করে কানাডায় নিয়ে আসতে পারেন? না, তা পারেন না। একটা উদাহরণ দেই। আমার এক দুঃসম্পর্কের ভাগ্নে তুখোড় মেধাবী। দেশের এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকারের পরও মামার জোর নেই বলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নেওয়া হয়নি। এখন থেকে প্রায় পনেরো বছর আগের কথা বলছি। একদিন সে আমাকে ইমেইল করলো, 'মামা, আমি কানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে যেতে চাই, সেখানে গিয়ে পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই; আপনি কানাডার সিটিজেন বলে আমাকে কি স্পনসর করে নিয়ে যেতে পারবেন?'

দুঃখভারাক্রান্ত মনে তাকে সেদিন আমার বলতে হয়েছিল, 'না, ভাগ্নে, তুমি কোন সুবিধা পাবে না। কারণ, তোমার সাথে আমার সরাসরি রক্তের সম্পর্ক নেই।'

সে আমাকে আর কিছু বলেনি, কিন্তু, আমারও সত্য বলার বিকল্প ছিল না। সে ছেলেও কিন্তু নাছোড়বান্দা। ওখানেই থেমে থাকেনি সে। কালাম নামের সেই ছেলে বর্তমানে কেবল ব্রিটেনের নাগরিকই নয়, ব্রিটেনের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও। তাকে নিয়ে আমি খুব গর্ব করি। দেখুন, দূরের ভাগ্নে তো পরের কথা, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া কানাডায় আপন ভাগ্নে-ভাগ্নিকেও স্পন্সর করে নিয়ে আসা যায় না। আমেরিকার ইমিগ্রেশনের সাথে কানাডার ইমিগ্রেশনের এ এক বড় পার্থক্য। আমেরিকায় একজন ইমিগ্রেশন পেয়েছেন তো তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরা দলে দলে আমেরিকায় পাড়ি জমাতেই থাকবেন যুগযুগ ধরে।

প্রশ্ন হলো, আর্থিক সক্ষমতা থাকলে একজন কানাডিয়ান পিআর বা সিটিজেন চাইলে সাধারণভাবে কাকে স্পনসর করে আনতে পারবেন? তালিকাটি বেশি দীর্ঘ নয়: স্বামী, স্ত্রী বা কমন ল পার্টনার, নির্ভরশীল পুত্রকন্যা এবং মাতাপিতা। বিশেষ ব্যতিক্রমী কিছু ক্ষেত্র বাদ দিলে কেবল এ সংক্ষিপ্ত তালিকায় বর্ণিতদেরই কানাডায় স্পন্সর করা যায়। এবার বুঝুন, কানাডা প্রবাসী যে ভদ্রলোক বাংলাদেশে বেড়াতে গেছেন তিনি আদৌ ওই মেয়েটিকে স্পন্সর করে কানাডায় নিয়ে আসতে সক্ষম হবেন কিনা। একদমই না। মেয়েটিকে প্রতারিত করতেই তার এ ফন্দি।

একটা ছোট্ট ঘটনা মনে পড়লো। কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোক আমাদের কোম্পানি (এমএলজি ইমিগ্রেশন)- এর সাথে যোগাযোগ করলেন। তিনি পাকিস্তান হতে ইমিগ্রেশন নিয়ে আসা কানাডিয়ান নাগরিক। এক ভদ্রমহিলাকে তিনি বিয়ে করে এনেছেন বছর দেড়েক আগে। ভদ্রমহিলা তার সাথে দুর্ব্যবহার করছেন বলে তিনি আমাকে জানালেন। আমার সাথে মিটিং করে তিনি জানতে চাইছিলেন তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিলেও তাকে ভরণপোষণ দিতে হবে কিনা?

আমার উত্তর শুনে তিনি হতাশ হলেন। বললাম, 'হ্যা জনাব, সে দায়িত্ব আপনাকে বহন করে যেতেই হবে। ডিভোর্সের সাথে এর সম্পর্ক নেই। কারণ, আপনি এ দায়িত্ব পালন করবেন বলে আন্ডারটেকিং দিয়েছেন বলেই কানাডা সরকার তাকে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে।'

ভদ্রলোক তখন জানতে চাইলেন, তার স্ত্রী আলাদা বসবাস করে কানাডার সোশ্যাল অ্যাসিস্টেন্স বা ওয়েলফেয়ার নিলে তা পরিশোধের দায়িত্ব কার? বললাম, 'সে দায়িত্বও আপনার।' 

যাক, এ লেখা আর দীর্ঘায়িত না করি। কানাডায় পড়াশোনা, বা ইমিগ্রেশন বিষয়ে কোনও বিশেষ প্রশ্ন থাকলে আমাকে নিচের ইমেইল ঠিকানায় জানাতে পারেন। পরের কোনও লেখায় আপনার আগ্রহের প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়াস থাকবে।

এছাড়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ নিয়মিত চোখ রাখুন কানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে আমার লেখা পড়তে। আপনাদের সাথে আরো অনেক মূল্যবান তথ্য সহভাগের আগ্রহ নিয়ে আজ এখানেই শেষ করি।

লেখক: কানাডীয় ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট, আরসিআইসি।

ইমেইল: info@mlgimmigration.com / ফেইসবুক: ML Gani

এ সিরিজের বাকি লেখা:

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক