কানাডা অভিবাসনের টুকিটাকি- ০৬: আপনার কানাডিয়ান জব অফার ঠিক আছে তো?

শুরুতেই বলে রাখি, কানাডায় জব অফার পাবার ব্যাপারে প্রফেশনাল সার্ভিস দিয়ে থাকেন রিক্রুইটিং এজেন্ট বা রিক্রুইটাররা, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট নয়। এসব রিক্রুইটিং এজেন্টকে অনেকে ‘হেড হান্টার’ও বলে থাকেন।

এম এল গনি, কানাডা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Sept 2020, 09:05 PM
Updated : 21 Sept 2020, 09:05 PM

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে আপনি নিজেও চাইলে পৃথিবীর যেকোনও প্রান্ত হতে কানাডায় জব সার্চ বা চাকরি খুঁজতে পারেন। ওয়ার্ক পারমিট পেতে বা, কানাডা অভিবাসনের সুবিধার্থে অনেকেই নিয়মিতভাবে কানাডায় জব সার্চ করে থাকেন।

তবে রিক্রুটমেট এজেন্সির সহায়তা নিলে কাজটা অনেক ক্ষেত্রে ত্বরান্বিত হয়। এর প্রধান কারণ দুটি:

এক. তাদের কানাডিয়ান জব মার্কেট ও জব সার্চের ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকে।

দুই. তারা কানাডিয়ান এমপ্লয়ার বা চাকরিতে নিয়োগদাতাদের বিশাল নেটওয়ার্ক ও তথ্যভাণ্ডারের সাথে সংযুক্ত থাকে।

একজন রিক্রুইটারের সাথে সংযুক্ত হয়ে আপনি তাদের অভিজ্ঞতা ও টুলস জব সার্চে বিনা খরচে কাজে লাগাতে পারেন।

বিনামূল্যে আপনার জব সার্চের উদ্দেশ্যে রিক্রুইটার কিভাবে নিয়োগ দেওয়া যায়- পাঠকের মাথায় এ প্রশ্ন জাগছে নিশ্চয়ই! এতটুকু ভুল বলিনি কিন্তু; এ শতভাগ সত্য। আপনাকে জব অফার সংগ্রহ দিলে তাদের লাভ ঠিকই আছে। কারণ, তাদের পারিশ্রমিক দেন নিয়োগকর্তা বা এমপ্লয়াররা। কানাডার আইনানুযায়ী কোনও ‘হেড হান্টার’ চাকরি প্রার্থীদের থেকে কোনওপ্রকার ফি বা অর্থ নিতে পারেন না; করলে তা আইনের ব্যত্যয়, এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ আমাদের বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেকদেশেই কানাডার জব অফার বা অফার লেটার চড়া মূল্যে বিক্রি হচ্ছে দেদারসে, তাই না? শুনুন এমন একটি সত্য ঘটনা।

সিংগাপুর থেকে দেবেশ নামের এক বাংলাদেশি আমাকে ইমেইল করলেন। কে যেন তাকে পরামর্শ দিয়েছেন সিংগাপুরে কাজে ইস্তফা দিয়ে কানাডামুখী উড়োজাহাজে উড্ডয়নের আগে আমার সাথে একটু কথা বলে নিতে। আমাকে ইমেইল করে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলেন দেবেশ। কথা বলার জন্য তিরিশ মিনিট সময় বুক করে পরদিন আমাকে ফোন দিলেন।

জানা গেল, তিনি কানাডার জব অফার, ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা, সবই পেয়েছেন; এখন শুধু প্লেনের টিকেট করার অপেক্ষা। তার আগে আমাকে দিয়ে একটু নিশ্চিত হতে চাইছেন সব ঠিকঠাক আছে কিনা। এ নিয়ে আমার ফি দিতেও তার আপত্তি ছিল না। তাকে আমি আমার কেবল এক ঘণ্টা সময়ের জন্য চার্জ করেছি- দেড়শ ডলার।

আমার পরামর্শ মতো জব অফার, ওয়ার্ক পারমিট, কানাডার ভিসা, ইত্যাদি কাগজপত্র তিনি আমাকে দ্রুতই ইমেইল করে পাঠালেন। সাধারণত একটু ভালোভাবে দেখেই আমরা বলতে পারি এসব ডকুমেন্ট সঠিক না জাল। কিন্তু, এক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। বোঝার উপায় নেই ভেজাল কি খাঁটি।

অবশেষে বাধ্য হয়ে কানাডার সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোর সাথে যোগাযোগ করলাম সত্যাসত্য যাচাই করতে। তিন/চার দিন পর সংশ্লিষ্ট অফিস জানালো, এসব কাগজের কোনওটিই কানাডার ইমিগ্রেশন বা অন্য কোনও দপ্তর থেকে ইস্যু করা হয়নি; মানে, শতভাগ ভেজাল। বিষয়টা দেবেশকে জানাতেই তার মাথায় বাজ পড়লো। বারবার জানতে চাইছিলেন আমি সত্যি বলছি কিনা, আমি পুরোপুরি নিশ্চিত কিনা। দেবেশ নাকি এই ডকুমেন্টগুলো হাতে পেতে ধাপে ধাপে দেশি টাকায় প্রায় বারো লাখ টাকা খরচ করে ফেলেছেন!

দেখুন এবার অবস্থা! উল্লেখ্য, ভুয়া জব অফার লেটার ইমিগ্রেশন আবেদনের সাথে জমা দিলে প্রতারণার দায়ে আপনার কানাডায় প্রবেশে সাময়িক বা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে। সেক্ষেত্রে কার কাছ হতে কিভাবে ওই জব অফার পেয়েছেন বা কিনেছেন তার বর্ণনা দিয়ে, বা অন্যকে এর জন্য দায়ী করে কোনও সুফল পাওয়া যায় না। ভুলটি এতটাই মারাত্মক। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাল জব অফার বা অফার লেটার চিনতে পারা কষ্টের না হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে এ কাজটি কঠিন হয়ে পড়ে। কেননা, তথ্য প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক প্রিন্টার ব্যবহার করে প্রতারকরা কোন একটি জেনুইন জব অফারকে এডিট করে তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে ভুয়া জব অফার তৈরি করতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির হাজারো সুফলের মধ্যে এমন কিছু অসুবিধাও বিভিন্নক্ষেত্রে মানুষকে ভোগায়। তাই, জব অফার হাতে পেলেই তাতে শতভাগ আস্থা রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ না দেওয়াই ভালো। তার আগে কোনও একজন প্রফেশনালকে দিয়ে কাগজগুলো যাচাই বাছাই করিয়ে নেওয়া উচিত। তাতে সামান্য খরচ হলেও কাজটি করা ভালো।

নিচের কয়েকটা বিষয় বিবেচনায় রাখলে আপনি নিজেই আঁচ করতে পারবেন আপনার হাতে ‘জব অফার’ নামে যে ডকুমেন্টটা এসেছে তা আসলে কতখানি আসল। আমি বলবো নিচের পয়েন্টগুলো হলো ওয়ার্নিং সাইন।

- জব অফারে যে কোম্পানি জবটি অফার করেছে তার বিস্তারিত তথ্য আছে কিনা দেখুন। থাকলেও সে সব আসলে বাস্তব কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। যেমন, অফার লেটারে ইমেইল ঠিকানা থাকলে তাতে আপনি একটা টেস্ট ইমেইল ছেড়ে দেখতে পারেন কেমন উত্তর আসে দেখতে। ফোন নম্বর থাকলে একটা ফোন দিয়ে দেখতে পারেন ওটা আসলে কাজ করে কিনা, বা করলেও তা ওই কোম্পানির কিনা, ইত্যাদি। ইন্টারনেটে ব্রাউজ করে কোম্পানির ওয়েবসাইটও দেখুন। ওয়েবসাইটের কয়েকটি ট্যাবও ক্লিক করে দেখুন। কারণ, অনেক সময় অন্য কোম্পানির ওয়েবসাইটের প্রিন্টস্ক্রিন যোগ করে দিয়েও প্রতারণা করা হয়। প্রিন্টস্ক্রিনের কোনও ট্যাবে ক্লিক করলে নতুন উইন্ডো খোলে না।

এছাড়া আপনার হাতে থাকে জব অফারে নিচের তথ্যাদি থাকলে তাও সন্দেহের চোখে দেখা জরুরি।

- ওয়ার্ক ফ্রম হোম, বা বাড়িতে বসেই কাজ করতে পারবেন।

- জবের আবেদনপত্র বা ট্রেইনিং মেটেরিয়াল কেনার জন্য টাকা দিতে বলেছে।

- আপনার পড়াশোনা বা বর্তমান কাজের অভিজ্ঞতার সাথে জব অফারের কাজের তেমন কোন সম্পর্ক নেই।

- যিনি আপনাকে জব অফার পাঠিয়েছেন তার ইমেইল অ্যাড্রেস জেনেরিক ধাঁচের; মানে, @জিমেইল ডট কম, @ইয়াহু ডট কম, ইত্যাদি ধরনের ইমেইল হতে এসেছে; কোনও বিশেষ কোম্পানি, যেমন @এমএলজিইমিগ্রেশন ডট কম, @সিআইবিসি ডট কম, ইত্যাদি, হতে নয়।

- জব অফার অতি দুর্বল ইংরেজিতে লেখা, বা বানান, গ্রামার জাতীয় ভুলে ভরা কিনা। প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির হিউম্যান রিসোর্সেস বিভাগ ইংরেজি বা ভাষা ঠিক আছে কিনা তা ভালোভাবে পরীক্ষা করেই সচরাচর জব অফার দিয়ে থাকে।

- আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ক্রেডিট কার্ড নম্বর, আইডেন্টিফিকেশন ডকুমেন্টের ফটোকপি, সোশ্যাল ইন্স্যুরেন্স নম্বর, জন্মতারিখ, ইত্যাদি দিতে বললে অনেকটা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিতে পারেন তা ভুয়া। কারণ, কোনও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি জব অফারে কখনোই এসব তথ্য জানতে চায় না। তারা বরং চাকরিতে যোগ দেওয়ার দিন ওসব ডকুমেন্টের মূল বা কপি আপনাকে সাথে নিয়ে আসতে বলতে পারে।

নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, একটি সত্যিকারের ‘জব অফারে’ কোন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকা জরুরি। তা নিয়েই বলছি এখন।

চাকরির শর্তাবলী; পদের নাম ও দায়িত্বাবলীর বিবরণ; বেতন ও ডিডাকশন; (প্রযোজ্যক্ষেত্রে) লেবার মার্কেট ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বা এলএমআইএ নম্বর; এমপ্লয়মেন্ট নম্বর; ইত্যাদি। প্রসঙ্গত, কানাডার উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হতে এলএমআইএ নামের ডকুমেন্টটির জন্য আবেদন দাখিল ও তা সংগ্রহের দায়িত্ব কিন্তু আপনার নয়, এ দায়িত্ব পুরোপুরি আপনার চাকরিদাতার। এ নিয়ে আপনার কাছে কেউ অর্থ চাইলে কোনভাবেই সে চক্রে পা দেবেন না। এলএমআইএ, কানাডার জব অফার বা অফার লেটার, ইত্যাদি বিক্রয়যোগ্য নয়।

অনেক সময় কানাডা ইমিগ্রেশনের আবেদনের জন্যও ‘জব অফার’ পাওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। সেসবক্ষেত্রে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে  কোন ধরনের ইমিগ্রেশন প্রোগ্রামের আওতায় আপনি আবেদন করছেন এবং সেখানে ঠিক কী ধরনের জব অফারের কথা বলা হয়েছে? বিষয়টি খোলাসা করার জন্য একটা উদাহরণ দেই।

ধরুন, আপনি এক্সপ্রেস এন্ট্রির কোন প্রোগ্রামের আওতায় ইমিগ্রেশনের আবেদন করবেন। এই বিশেষ প্রোগ্রামের জন্য আপনাকে যে জব অফার পেতে হবে তার শর্ত নিম্নরূপ: চাকরিটি কমপক্ষে এক বছরের জন্য পূর্ণকালীন ও নন সিজনাল, এবং ন্যাশনাল অকুপেশন ক্লাসিফিকেশনের (এনওসি) তালিকার স্কিল টাইপ জিরো, বা স্কিল লেবেল ‘এ’ বা, ‘বি’ এর আওতাধীন হতে হবে। কানাডার ইমিগ্রেশনের জন্য ষাটেরও অধিক বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম আছে। আপনার পাওয়া জব অফার আপনার কাঙ্ক্ষিত প্রোগ্রামের সাথে মিলে না গেলে সে অফার জেনুইন হলেও কিন্তু কোন লাভ নেই।

প্রসঙ্গত বলা ভালো, অনেকে ওয়ার্ক পারমিটের সাথে জব অফারকে গুলিয়ে ফেলেন। অতীতে আমাদের কোম্পানি এমএলজি কানাডা ইমিগ্রেশন- এর কাছে কেউ কেউ ওয়ার্ক পারমিটের কপি ইমেইল করে জানতে চেয়েছেন তার জব অফারটি জেনুইন কিনা পরখ করে জানাতে। সে অভিজ্ঞতা থেকেই কথাটা বললাম। মনে রাখুন, একটি ওয়ার্ক পারমিট, তা যদি ওপেন ওয়ার্ক পারমিটও হয়ে থাকে, তা কিন্তু জব অফার নয়। জব অফার আলাদা ডকুমেন্ট। ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন দাখিল করতে অন্যান্য ডকুমেন্টের সাথে লাগে একটি ভ্যালিড জব অফার। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কানাডায় বিভিন্ন অনিয়মের কারণে কিছু কোম্পানি জব অফার ইস্যু করার যোগ্যতা হারিয়েছে। এদের তালিকা ইন্টারনেটে সার্চ দিলে পাওয়া যায়। সেসব কোম্পানির জব অফার জেনুইন হলেও কাজ নেই।

যাক, এ লেখা আর দীর্ঘ না করি। কানাডায় পড়াশোনা, বা ইমিগ্রেশন বিষয়ে কোনও বিশেষ প্রশ্ন থাকলে আমাকে নিচের ইমেইল ঠিকানায় জানাতে পারেন। পরের কোনও লেখায় আপনার আগ্রহের প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়াস থাকবে। এছাড়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ নিয়মিত চোখ রাখুন কানাডা ইমিগ্রেশন নিয়ে আমার লেখা পড়তে। আপনাদের সাথে আরো অনেক মূল্যবান তথ্য সহভাগের আগ্রহ নিয়ে আজ এখানেই শেষ করি।

লেখক: কানাডীয় ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট, আরসিআইসি।

ইমেইল: info@mlgimmigration.com

এ সিরিজের বাকি লেখার লিংক:

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক