Published : 19 Feb 2026, 11:52 AM
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপির বিপুল জয় শুধু একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, বৈধতার পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন পর্বের সূচনা। দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় ফেরা যেকোনো দলের জন্যই এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক আবহে প্রত্যাবর্তন (institutional re-entry)—যেখানে দলকে রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন, রাজনৈতিক সমাজ ও নাগরিক সমাজ—সব ক্ষেত্রেই নতুন করে অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়। এই অবস্থান নির্ধারণের প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে বিএনপির সরকার কতটা স্থিতিশীল, কতটা দীর্ঘস্থায়ী এবং কতটা কার্যকর হবে।
ক্ষমতায় ফেরা মানেই রাজনৈতিক লড়াই শেষ নয়; বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরও কঠিন বাস্তবতা। একদিকে জনগণের প্রত্যাশা এখন আকাশছোঁয়া, অপরদিকে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর চেষ্টা নতুন কৌশলে নিজেদের পুনর্গঠনের। এই দুই চাপের মাঝেই বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে তাদের সক্ষমতা, দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক পরিপক্কতা। নির্বাচনে জয় সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে—সেটাই নির্ধারণ করবে দলটির ভবিষ্যৎ।
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম পরীক্ষা: বৈধতা, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও কূটনীতি
রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায়, ক্ষমতায় আসার পর যেকোনো দলকে তিন ধরনের বৈধতা অর্জন করতে হয়—নির্বাচনি বৈধতা, কার্যকরী বৈধতা এবং নৈতিক বৈধতা। বিএনপি প্রথমটি অর্জন করলেও বাকি দুই বৈধতা এখনো নির্মাণাধীন। কার্যকরী বৈধতার প্রথম শর্ত হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত ও নির্বাচন–পূর্ব উত্তেজনার পর দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এখন সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ। জনগণ নিরাপত্তা চায়, ব্যবসায়ীরা স্থিতিশীল পরিবেশ চায়, আন্তর্জাতিক মহল চায় স্থিতিশীলতা। এই তিন স্তরে আস্থা তৈরি না হলে রাজনৈতিক বৈধতা দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে নতুন সরকারের সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠিত হবে—তা আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
অর্থনীতি বিএনপির জন্য আরও জটিল এক কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট অধোগতি দেখা গিয়েছে। ওই সময়ে বেকারত্ব ‘অভূতপূর্ব’ মাত্রায় পৌঁছে; কারখানা বন্ধ, রপ্তানি স্থবিরতা ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে ব্যাপক চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটে। শ্রমবাজারে দ্রুত সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়—যা দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পশ্চাদপদতার ইঙ্গিত দেয়। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতেও; ফলে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৩.৬৯ শতাংশে, যা কোভিড–পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার—এসবই দ্রুত সিদ্ধান্ত, কঠোর সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি রাখে। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন সাধারণত তিন স্তরে ঘটে—স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা, মধ্যমেয়াদি সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তর। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই তিন স্তরই একই সঙ্গে চাপ সৃষ্টি করছে। জনগণ দ্রুত ফল চায়, কিন্তু অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করতে সময় লাগে। এই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান—যেকোনো নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।
কূটনীতির ক্ষেত্রেও বিএনপিকে একটি জটিল ভারসাম্যের পথে হাঁটতে হবে। বাংলাদেশের ভূ–রাজনৈতিক অবস্থান এমন যে এখানে কোনো একক শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বা দূরত্ব উভয়ই ঝুঁকিপূর্ণ। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর স্বার্থ ও প্রত্যাশা ভিন্ন। বিএনপিকে তাই এমন এক কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে যা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, কূটনৈতিক ভুলের রাজনৈতিক মূল্য সবসময়ই বেশি।
নতুন ভোট–সমীকরণ: ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ভোট এবং ডিজিটাল নজরদারি
বিএনপির এবারের জয়ে ভোট–সমীকরণে একটি নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। আহমদীয়া, শিয়া ও বাহাই সম্প্রদায়কে সংখ্যালঘুর কাতারে যুক্ত করলে দেখা যায়, ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু ভোটার প্রায় ১২ শতাংশ—যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ অতীতে আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকলেও—এবার প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি বিএনপিকে ভোট দিয়েছে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ থেকে এরকম অনুমান করা যায়। এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ নিরাপত্তার প্রত্যাশা। সংখ্যালঘুরা মনে করেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—যেটা অতীতে কোনো সরকার সেভাবে করতে পারেনি। পাশাপাশি তারা বিশ্বাস করেছেন, বিএনপি রাষ্ট্র ও সমাজে তাদের নাগরিক অধিকার খর্ব করবে না। এই আস্থা যেমন সুযোগ, তেমনি দায়িত্বও; কারণ নিরাপত্তা ব্যর্থ হলে এই আস্থা দ্রুত ক্ষয়ে যাবে।
নারী ভোটের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে। জামায়াত নেতাদের বক্তব্য, নারীর ভূমিকা নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জামায়াত সমর্থকদের সামাজিক মাধ্যমে নারীদের নিয়ে নানা নেতিবাচক মন্তব্য—নারীদের একটি বড় অংশের মাঝে জামায়াত সম্পর্কে গভীর অনাস্থা তৈরি করে। নারীরা মনে করেছেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে তাদের কাজের পরিধি সংকুচিত হবে, চলাচলের স্বাধীনতা কমবে এবং গত ৫৪ বছরে অর্জিত সামাজিক স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। ফলে নারী সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে এই প্রত্যাশা থেকে যে বিএনপি অন্তত নারীর অর্জিত স্বাধীনতা খর্ব করবে না। এই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা রাজনৈতিক বৈধতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
এবার বিএনপিকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে যা ২০০১-২০০৬ শাসনামলে ছিল না—সার্বক্ষণিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নজরদারি। আওয়ামী লীগ ছিল প্রথম সরকার যাকে এই নজরদারির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে; এবার বিএনপিকেও একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই ভাইরাল হবে, প্রতিটি ভুল দ্রুত রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হবে এবং প্রতিটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। এই পরিবেশে রাজনৈতিক যোগাযোগ, স্বচ্ছতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া—সবই সরকারের স্থায়িত্বের জন্য অপরিহার্য।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা: পরাজিত শক্তির পুনর্গঠন ও জামায়াতের সম্ভাব্য ভূমিকা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, পরাজিত দলগুলো কখনোই নিষ্ক্রিয় থাকে না। তারা আবার নতুনভাবে সংঘটিত হয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়। এ চাপ সৃষ্টি অনেক সময় ভিন্ন নামে, ভিন্ন ব্যানারে কিংবা নাগরিক সমাজ-নির্ভর প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘটে। এই নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত দুর্নীতিবিরোধী, সংস্কারমুখী, তরুণবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর ভাষা ব্যবহার করে—যার দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। এসব কার্যক্রম ক্ষমতাসীন দলের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে একটি বিকল্প কল্পনা তৈরি করে। ফলে বিএনপির বর্তমান শাসনামলে এ ধরনের বিষয় দাঁড়ালে তা সরাসরি বিএনপির hegemonic stability—অর্থাৎ রাজনৈতিক আধিপত্যের স্থায়িত্বকে চাপের মধ্যে ফেলবে।
দল হিসেবে জামায়াতের সম্ভাব্য ভূমিকা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতের সংগঠন, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং গ্রাম-মফস্বলে গভীর উপস্থিতি বিএনপির ওপর নানাবিধ চাপ তৈরি করবার সক্ষমতা রাখে। তারা নীতিগত ছাড়, প্রশাসনিক সুবিধা দাবি করতে পারে বা এনসিপি এবং অন্যান্য ইসলামবাদী দলের সঙ্গে মিলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জোর দাবি সংসদে এবং সংসদের বাইরে তুলতে পারে।
পাশাপাশি জামায়াতের সমর্থকরা সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয়; তারা তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে এমন ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে পারে যে বিএনপি ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষায় প্রতিশ্রুত নয়—যা বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। এই ধরনের ন্যারেটিভ শহর ও গ্রাম—উভয় পরিসরের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম, কারণ এটি ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—এই চারটি সমাজতাত্ত্বিক মাত্রাকে সরাসরি স্পর্শ করে। ফলে ন্যারেটিভটি শুধু মতামত গঠনে নয়, বরং স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, ভোট-আচরণ এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াতেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে । এর ফলে সরকারের স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন রূপ নিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বিএনপির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
সুযোগ, ঝুঁকি ও ভবিষ্যতের পথ
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের সব সরকারের জন্যই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার ক্ষেত্র—আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে অতীতের সব সরকারই এ পরীক্ষায় অকৃতকার্য। এই সরকারের জন্যও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের সামনে রয়েছে একদিকে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসন-অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে তাদের নিজেদের ২০০১-২০০৬ আমলের বাস্তবতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের প্রায় ৫৪ বছরের শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিক ব্যর্থতার ইতিহাস। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি যদি দুর্নীতি দমনে কার্যকর ও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারে, তবে সেটি বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে ইতিহাসে মূল্যায়িত হবে।
বিএনপির সামনে এখন যে চ্যালেঞ্জগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো কেবল প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক নয়; এগুলো মূলত বৈধতা, প্রতিযোগিতা, রাষ্ট্রক্ষমতা এবং জনগণের প্রত্যাশার কাঠামোর মধ্যে অবস্থিত। নির্বাচনে জয় তাদের হাতে সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে—সেটাই নির্ধারণ করবে দলটির ভবিষ্যৎ। যদি বিএনপি আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল করতে পারে, অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে নিতে পারে, কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে এবং সংখ্যালঘু ও নারী ভোটারদের আস্থা রক্ষা করতে পারে, তবে তারা শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়—একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারবে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে—ক্ষমতা বদলাবে, কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না।