Published : 12 May 2026, 01:09 PM
রেড স্কয়ারের কুচকাওয়াজ মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভ্লাদিমির পুতিন যখন বললেন, “আমি মনে করি, বিষয়টি সমাপ্তির পথে”— তখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ হয়তো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে আমার প্রশ্ন— এটি কি সত্যিকারের যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত, নাকি কূটনৈতিক চালের অংশ?
৯ মে রাশিয়ার বিজয় দিবসে এবার মস্কোর রেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ ছিল অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত ও ছোট। ইউক্রেইনের ড্রোন হামলার আশঙ্কায় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কঠোর। বিশাল ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ট্যাংকের বহর ছিল না—তার বদলে ক্রেমলিনের দেয়ালে চলছিল রুশ সামরিক শক্তির ভিডিও প্রদর্শনী। এই পরিবর্তন বলে দেয় পরিস্থিতি কিছুটা জটিল।
‘যুদ্ধ শেষ হতে চলেছে’—কথার কথা নাকি বাস্তবতা? পুতিন কখনো আবেগতাড়িত হয়ে কথা বলেন না। তিনি এমন একজন নেতা যার প্রতিটি বাক্য পরিমিত। তাই তার এই মন্তব্যকে নিছক ‘কথার কথা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। একই সঙ্গে এটিকে যুদ্ধসমাপ্তির নিশ্চিত ঘোষণাও বলা যাবে না। সিএনএন-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুতিনের এই মন্তব্য অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ। তিনি এর আগে কখনো এভাবে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ সমাপ্তির কথা বলেননি। তার যুদ্ধের ছক ও কৌশল পরিকল্পিত, লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি নির্ধারিত। সেই তিনি এবার সেই তথ্য শেয়ার করলেন। তবে আল-জাজিরার বিশেষজ্ঞ এবং চ্যাথাম হাউসের ফেলো কেইর গাইলস সতর্ক করেছেন— গত দেড় বছরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কথা বহুবার এসেছে, কিন্তু বাস্তবে রূপ নেয়নি। তাই আশাবাদী হওয়ার আগে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণটি ভালো করে জানা দরকার।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার জটিলতা
পুতিনের ঘোষণার ঠিক একদিন আগে, ৮ মে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ঘোষণা করলেন— ৯ থেকে ১১ মে তিন দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। সঙ্গে দুই পক্ষের এক হাজার করে মোট দুই হাজার যুদ্ধবন্দির বিনিময়ও হবে। ট্রাম্প বললেন, “এটি একটি দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী ও কঠিন যুদ্ধের সমাপ্তির সূচনা।” কিন্তু বাস্তবতা কত ভিন্ন! এর আগে এপ্রিলে অর্থোডক্স ইস্টার উপলক্ষে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়েছিল। এই তিন দিনের যুদ্ধবিরতিও কতটা টিকবে তা নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও শান্তির মূল বাধাটি এখনো বিদ্যমান। রাশিয়ার দাবি, ডোনেৎস্কসহ পূর্বাঞ্চলের দখলকৃত এলাকা থেকে ইউক্রেইনীয় বাহিনীকে সরে যেতে হবে। ইউক্রেইনের অবস্থান এক ইঞ্চি জমিও না ছাড়া। এই বিপরীতমুখী অবস্থানের সমঝোতা কিভাবে হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
মাঠের বাস্তবতা
ইউক্রেইনের পরিস্থিতি মাঠের বাস্তবতায় রাশিয়ার পক্ষেই ঝুঁকে আছে—এতে সন্দেহ নেই। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেইনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড নিজের দখলে রেখেছে। গেল মার্চে রাশিয়া একটানা চার সপ্তাহে আরও ৪৬ বর্গমাইল দখল করেছে। লুহানস্ক ওব্লাস্ট সম্পূর্ণ রুশ নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে মস্কো দাবি করেছে। ইউক্রেইনের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ। রুশ আক্রমণে ইউক্রেইনের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ২০২২ সালের ৩৩.৭ গিগাওয়াট থেকে নেমে ২০২৬ সালের শুরুতে মাত্র ১৪ গিগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। কিয়েভ শহরে একসময় দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকত না। ৪১ মিলিয়নের দেশটি থেকে এরই মধ্যে ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন মানুষ বিদেশে পালিয়ে গেছে, ৮ মিলিয়ন দেশের মধ্যেই বাস্তুচ্যুত।
ইরান যুদ্ধ ও বিশ্ব বাস্তবতার পরিবর্তন
আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বড় সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত। এই যুদ্ধ ইউক্রেইনের জন্য দ্বিমুখী বিপদ ডেকে এনেছে। প্রথমত, পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ ও সম্পদের একটি বড় অংশ এখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। ইউক্রেইন এখন খবরের শিরোনামে দ্বিতীয় সারিতে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালির সংকট ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ইউরোপ নিজেই এখন আর্থিক সংকটে; ইউক্রেইনের জন্য বাড়তি সহায়তার বোঝা বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়া এই পরিস্থিতি থেকে দুটি সুবিধা পাচ্ছে। একটি হলো পশ্চিমের দৃষ্টি অন্যত্র সরে যাওয়ায় ইউক্রেইনে তাদের অভিযান জোরদার করার সুযোগ। অপরটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কিছুটা শিথিলতার ফলে তেল বিক্রির মুনাফায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারছে।
ট্রাম্প-পুতিন সমীকরণ ও ন্যাটোর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পেয়ে ক্ষুব্ধ। তিনি জার্মানিসহ ইউরোপের আরও যে সব দেশে মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে, সেখান থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। একাধিকবার ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এমনকি এই জোট ভেঙে দেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘন ঘন ফোনালাপ ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। যে ন্যাটো জোটে যোগ দেওয়ার স্বপ্নে ইউক্রেইন এই যুদ্ধে জড়াল, সেই ন্যাটোর অস্তিত্বই আজ প্রশ্নের মুখে।
পুতিন আগেই হুঁশিয়ার করেছেন—কোনো ইউরোপীয় দেশ যদি সরাসরি সেনা পাঠিয়ে ইউক্রেইনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে সেই দেশকে শত্রুপক্ষ গণ্য করা হবে। এই হুমকির মুখে ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে যাওয়ার ঝুঁকি নেবে না, এটাই স্বাভাবিক।
জেলেনস্কির দরকষাকষির শক্তি কমছে
ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির যোগাযোগ দক্ষতা অসামান্য, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাগ্মিতা দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা বদলানো যায় না। লাটভিয়ার সাংবাদিক লিওনিদ রাগোজিন আল-জাজিরায় তার বিশ্লেষণে যা বলেছেন, তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। জেলেনস্কি আন্তর্জাতিক মঞ্চে জনপ্রিয় হলেও সামরিক ক্ষেত্রে তার কোনো অগ্রগতি নেই। ফ্রন্টলাইনে বড় পরিবর্তন আসেনি, বরং রাশিয়া ধীরে হলেও এগিয়ে যাচ্ছে।
ইউক্রেইনে এখন তীব্র সৈন্য সংকট চলছে। নাগরিকদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে রাশিয়া আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সৈন্য সংগ্রহ করতে পারছে। দুর্নীতির প্রশ্নও মাথাচাড়া দিয়েছে; সৈন্যদের জন্য পাঠানো অস্ত্র বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর কাছে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেনাদের জন্য বরাদ্দ খাদ্যে চুরির কারণে অপুষ্টির অভিযোগও উঠেছে। জেলেনস্কির জনপ্রিয়তা তার দেশে ও আন্তর্জাতিক মঞ্চ উভয়ক্ষেত্রেই কমছে। দুর্নীতির তদন্ত ও যুদ্ধের অচলাবস্থা তার দরকষাকষির শক্তি কমিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্কও উষ্ণ নয়।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা হয়তো এটি—ইউক্রেইনের ভূমির নিচে যে বিশাল খনিজ সম্পদ রয়েছে (বিরল মৃত্তিকা ধাতু, লিথিয়াম, কয়লা, টাইটানিয়াম), সেই সম্পদের অংশীদারত্ব ও ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে চুক্তি সই করেছে। অর্থাৎ মাটির নিচের সম্পদ চলে যাবে মার্কিন স্বার্থে, আর মাটির উপরের শহর, অবকাঠামো ও মানুষ যাচ্ছে রুশ আক্রমণের আগুনে। এই সমীকরণে ইউক্রেইনের সাধারণ মানুষের জন্য কোথায় জায়গা?
তাহলে যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ হতে চলেছে?
আমার পর্যবেক্ষণ হলো, যুদ্ধ হয়তো একটি চুক্তির দিকে এগোচ্ছে, কিন্তু সেই চুক্তি ইউক্রেইনের জন্য সম্মানজনক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইউক্রেইনকে হয়তো পূর্বাঞ্চলের ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে। ন্যাটোর সদস্যপদ স্বপ্নই থেকে যাবে, যদিও ন্যাটোর অস্তিত্বই এখন প্রশ্নের মুখে। পশ্চিমা মিত্রদের অনেকেই এই বাস্তবতা মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মস্কোর অভিজাত মহল ও পুতিন এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করতে চান না। রাশিয়ার ভেতরেও যুদ্ধের ব্যাপকতা, মানবিক ক্ষতি ও অর্থনৈতিক বোঝা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। অর্থাৎ পুতিনও চাপে আছেন, যদিও সেই চাপ ইউক্রেইনের চেয়ে অনেক কম।
সামগ্রিক বাস্তবতায় এই যুদ্ধের পরিণতি নির্ধারণ করবে তিনটি বিষয়: (১) ট্রাম্পের আগ্রহ এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার, কিন্তু প্রশ্ন হলো যুদ্ধ বন্ধের যে শর্তগুলো আছে, তিনি তাতে কতটা দৃঢ় থাকবেন? (২) ইউরোপ কি ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে? ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে তারা কি নিজস্ব শক্তিতে ইউক্রেইনের পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হবে? (৩) ইউক্রেইনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। জেলেনস্কির নেতৃত্বে যদি বিভক্তি ও অবিশ্বাস আরও গভীর হয়, তাহলে শান্তি আলোচনায় ইউক্রেইন সমন্বিত দরকষাকষিতে দুর্বল থাকবে।
শেষ কথা
সিএনএন সেই কথাটি বলছে, “সব যুদ্ধ একদিন শেষ হয়।” পুতিনও সেটা জানেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়া আর ন্যায্য শান্তি প্রতিষ্ঠা এক কথা নয়। ইউক্রেইনের মানুষ চার বছর ধরে এক অসম যুদ্ধ করছে। তাদের অবকাঠামো ধ্বংস, জনসংখ্যা কমেছে, অর্থনীতি বিধ্বস্ত। ইতিহাস যদি এই যুদ্ধের বিচার করে, তাহলে প্রশ্নটি থাকবে—যে মানুষগুলো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলো, তারা শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করল?