Published : 27 May 2026, 04:08 PM
ককরোচ জনতা পার্টিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উপস্থিতি আবার আলোচিত হলেও এর সূচনা অনেক আগে, ২০১০ সালের আরব বসন্তের সময়। সেই ঝড়ো সময় রাজনীতির চিরচেনা হিসাব-নিকাশ ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। পরে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল হয়ে এই ডিজিটাল রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভারত এবং পাকিস্তানেও নতুন রূপে দৃশ্যমান হয়েছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত তরুণদের একাংশকে ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করার ক্ষোভ থেকে গত ১৬ মে নেটিজেন অভিজিৎ দীপকে চালু করেন ব্যঙ্গাত্মক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। এটি স্রেফ মিম হিসেবে শুরু হলেও অবিশ্বাস্য গতিতে এর ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা ২০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়, যা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকেও পেছনে ফেলেছে। বেকারত্ব ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণদের এই ডিজিটাল প্রতিবাদের জেরে ভারত সরকার এর এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক করলেও তা দমে যায়নি। বিজেপির পক্ষ থেকে একে পাকিস্তানি ইন্ধন বলা হলেও তা ধোপে টিকেনি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—পুরোনো, পোড়খাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের এই ঐক্যের ভাষা বুঝতে পারছে না কেন?

সম্ভবত এর কারণ, সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা কেবল সরকার পরিবর্তন, নির্বাচন বা ক্ষমতার পালাবদলের সাধারণ সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং গভীর ও কাঠামোগত ‘রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট’ তৈরি করেছে। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি জনগণের আস্থা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই উপলব্ধি শক্তিশালী হচ্ছে যে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের জীবন, সংকট ও আকাঙ্ক্ষাকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না।
এই অবস্থায় পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর সামাজিক সম্মতি উৎপাদনের সক্ষমতা কমে গেছে। অথচ নতুন কোনো বিকল্প শক্তিও এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে রাজনীতিতে এক ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন শূন্যতা তৈরি হয়েছে—যেখানে পুরোনো কাঠামো টিকে থাকলেও তার বৈধতা ক্ষয়িষ্ণু, আর নতুন কাঠামো সম্ভাবনার স্তরে থেকেও বাস্তবে অনুপস্থিত। এই দ্বৈত সংকটই এই অঞ্চলের রাজনীতিকে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই শূন্যতার মধ্যেই রাজনৈতিক ভাষা ও প্রতিবাদের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত দলীয় রাজনীতি, সংগঠিত আন্দোলন এবং মতাদর্শিক কাঠামোর পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মিম সংস্কৃতি নতুন রাজনৈতিক প্রকাশের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাজনীতি এখন আর কেবল সংসদ, দলীয় কার্যালয় বা মাঠের সভায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি দৈনন্দিন ডিজিটাল জীবনের ভেতরে প্রবেশ করে এক ধরনের ‘রিয়েল-টাইম রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ তৈরি করছে।
রাজনীতির এই নতুন বহিঃপ্রকাশ কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তার বড় উদাহরণ পাওয়া গেছে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে। তৎকালীন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তারা তরুণদের ভাষা ও আবেগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর শ্লেষাত্মক ও অপমানজনক বক্তব্যই উল্টো আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ‘তুমি কে, আমি কে—রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানে রাজপথ মুখরিত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে। ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত তরুণদের অভিব্যক্তির সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার একটি স্পষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
তবে তরুণদের ক্ষোভ ও বিক্ষোভ সবসময় সঠিক রাজনৈতিক পরিণতি পায় না, যদি না সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন আসে অথবা সেই পরিবর্তনের ধারায় নতুন রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি সেটাই প্রমাণ করেছে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটলেও পরে তরুণদের বড় অংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা দেখেছে, পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো নতুন ভাষা ও নতুন মুখ নিয়ে আবারও রাজনৈতিক কেন্দ্র দখল করতে শুরু করেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের একটি অংশ নিজেদের প্রতারিত মনে করছে। তাদের ধারণা, রাজপথের ত্যাগ ও আন্দোলনের শক্তি শেষ পর্যন্ত পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তকেই পুনর্গঠন করেছে।
আন্দোলনের সময় যে বিস্তৃত ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা পরে আদর্শিক বিভাজন, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্ব সংকটের কারণে স্থায়ী রাজনৈতিক রূপ পায়নি। বরং আন্দোলনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রগতিশীল ও নারী নেতৃত্বের একটি অংশ কোণঠাসা হয়েছে, আবার কিছু অংশ মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে কৌশলগত আপসে গেছে। এই পরিস্থিতি দেখায়, স্বৈরাচারবিরোধী ঐক্য তৈরি করা সম্ভব হলেও তার ভিত্তিতে নতুন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা বেশ কঠিন।
এই শূন্যতার সুযোগে ডিজিটাল মিম-রাজনীতি ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ নতুন রাজনৈতিক ভাষা হিসেবে উঠে এসেছে। ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি তার বড় উদাহরণ। বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে তরুণরা তেলাপোকাকেই প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত করেছে। এটি ক্ষমতার ভাষাকে উল্টে দিয়ে অপমানকে রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপান্তরের কৌশল। একইভাবে বাংলাদেশেও গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যঙ্গচিত্র, র্যাপ গান, অ্যানিমেশন ও মিম রাজনৈতিক প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল মত প্রকাশের জায়গা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ভাইরাল ক্লিপ, মিম, শর্ট ভিডিও এবং আক্রমণাত্মক বক্তৃতা এখন সরাসরি মাঠের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ধারাবাহিকভাবে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছেন। এসব বক্তব্য দ্রুত ভাইরাল হয়েছে।
এই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ রাজনীতির নতুন রূপ। এখানে তরুণদের একটি অংশ পুরোনো রাজনৈতিক শ্রেণিকে দুর্নীতি, দখলদারিত্ব ও নৈতিক পতনের প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ফলে চাঁদাবাজ, সিন্ডিকেট, দখলদার ইত্যাদি শব্দ রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ভাষাকে আরও দ্রুত ও তীব্রভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আগে মাঠের রাজনীতি অনলাইনে প্রতিফলিত হতো; এখন অনলাইন ন্যারেটিভ অনেক ক্ষেত্রেই মাঠের রাজনীতিকে পরিচালিত করছে।
কিন্তু তরুণদের এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক ভাষা অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বুঝতে পারছে না, কিংবা বুঝতে চাইলেও গ্রহণ করতে পারছে না। এমনকি বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। পুঁজিবাদের সংকট, বৈষম্য ও শোষণের বিশ্লেষণ থাকলেও সমকালীন তরুণদের সাংস্কৃতিক ভাষা ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ধরতে তারা ব্যর্থ। অনেক বাম দল এখনও তাত্ত্বিক বিশুদ্ধতা ও পুরোনো সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ। ফলে গণবিক্ষোভকে দীর্ঘমেয়াদি গণআন্দোলনে রূপ দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
এর অন্যতম কারণ, তাদের রাজনীতি এখনও শিল্পশ্রমিক ও কারখানাকেন্দ্রিক সংগঠনের ধারণায় আবদ্ধ। অথচ বর্তমান প্রজন্মের বড় অংশ হলো ডিজিটাল সাবঅল্টার্ন—অস্থায়ী কর্মজীবী, ডিগ্রিধারী বেকার, ফ্রিল্যান্সার, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক এবং অনিশ্চিত মধ্যবিত্ত। তাদের অভিজ্ঞতা ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নয়। তাদের ঐক্য গড়ে উঠছে ফেসবুক, ইউটিউব, মিম সংস্কৃতি ও অনলাইন আলোচনার মাধ্যমে। ফলে তারা এমন রাজনৈতিক ভাষা চায়, যা তাদের বাস্তব জীবনসংকটকে ধারণ করতে পারে।
তবে এই ধরনের ডিজিটাল প্রতিরোধের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। মিম ও ভাইরাল ক্ষোভ দ্রুত জনমত তৈরি করতে পারলেও তা সবসময় টেকসই রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক শিক্ষা এবং বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। ইতিহাসে ফরাসি বিপ্লব থেকে আরব বসন্ত পর্যন্ত বহু উদাহরণ দেখিয়েছে, শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের শক্তি সহজেই পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে শোষিত হয়ে যায়।
যারা নতুন ধরনের রাজনীতি নির্মাণ করতে চান, তাদের বুঝতে হবে—বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু নতুন বিকল্প এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে জন্ম নেয়নি। এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল ক্ষোভ, মিম-রাজনীতি, ভাইরাল বক্তৃতা এবং আকস্মিক গণবিক্ষোভ আরও বাড়বে। তরুণরা রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—পুরোনো কায়দায় দেশ পরিচালনা আর সম্ভব নয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই ক্ষোভকে কে সংগঠিত রাজনৈতিক কল্পনায় রূপ দিতে পারবে? আমরা কি নতুন ধরনের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ভাষা ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে পারব, নাকি আবারও পুরোনো বন্দোবস্ত নতুন রূপে ফিরে আসবে?