Published : 29 Apr 2026, 04:42 PM
রাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরনো ধারণা পাওয়া যায় এরিস্টটলের ‘পলিটিকা’ নামের অসাধারণ এক বইয়ের মাধ্যমে, যা পরবর্তীকালে ‘পলিটিক্স’ নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই বইয়ের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল রাজনৈতিক দর্শন। তখনকার স্বাধীন ‘নগর রাষ্ট্র’ যেমন; এথেন্স বা স্পার্টাকে তিনি ‘পোলেস’ নামে অভিহিত করেন। সেই পোলেস বা নগর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন কী হওয়া উচিত, সেটির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এরিস্টটলের ‘পলিটিকা’য়। এই নগর রাষ্ট্রের সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ও গুণগত পার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রের মূল ধারণা এই নগর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন থেকেই উদ্ভূত।
এরিস্টটলের মতে, রাষ্ট্র এমন একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা যার মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের জন্য ‘সর্বোচ্চ ভালো’ কিছু অর্জন করা। রাষ্ট্রের আদিমতম এই সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, একটি ভূখণ্ডে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো ওই ভূখণ্ডের মানুষের জন্য ‘সর্বোচ্চ ভালো’ কিছু অর্জন করা; অন্যথায় সেটি পোলেস বা ‘রাষ্ট্র’ নয়।
আবার আধুনিককালের রাষ্ট্র দর্শনের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হলো ‘সামাজিক চুক্তি’। এই সামাজিক চুক্তির প্রধান সমর্থক ছিলেন থমাস হবস, জন লক ও জাঁ জ্যাক রুশো। এই চিন্তাবিদগণ মনে করেন, মানুষ একটি সর্বজনীন কর্তৃত্বের অধীনে বসবাসের জন্য রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। কারণ হিসেবে থমাস হবস মনে করেন, মানুষ ‘ভয় ও নিরাপত্তা’র তাড়না থেকে রাষ্ট্রের মতো একটি সর্বজনীন কর্তৃত্বের অধীনে বসবাস করতে চায়। আবার জন লক মনে করেন, মানুষ নিজেদের ‘অধিকার রক্ষা’র জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। রুশো মনে করেন, মানুষ আইন তৈরিতে সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের ‘সামষ্টিক ইচ্ছা’ বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে।
এই তিন তাত্ত্বিকের যুক্তিতে মানুষের রাষ্ট্র গঠনের কারণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও তাদের মূল আলোচ্য বিষয় হলো মানুষ রাষ্ট্র তৈরি করে নিজেদের কল্যাণের জন্য। অর্থাৎ মানুষ নিজেদের ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ‘নির্ভয়-নিরাপদ ব্যবস্থা, অধিকার সুরক্ষা বা সামষ্টিকভাবে হিতকর একটি ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। একইভাবে সামাজিক চুক্তিতে বলা হয়, এই রাষ্ট্রকাঠামো যখন কল্যাণের বিপরীতে একটি নিপীড়নমূলক যন্ত্রে পরিণত হয়, মানুষ তখন নতুন রাষ্ট্র তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হয়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে আমরা একই সমীকরণ দেখতে পাই। পাকিস্তান নামক একটি নিপীড়নমূলক ‘পোলেস’-এর অপশাসন ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে পূর্ব বাংলার মানুষ একটি নতুন ‘পোলেস’ বা রাষ্ট্র গঠনের লড়াইয়ে নেমেছিল। সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, বাংলার মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা ছিল মূলত একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ধর্ম, জাতীয় স্বার্থ বা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শোষিত হওয়া এক জনপদ নিজেদের ও উত্তরসূরিদের জন্য একটি বঞ্চনামুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদরদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অগণিত প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত ওই স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ’। প্রত্যাশা ছিল, এই রাষ্ট্রের রাজনীতি বা ‘পলিটিকা’ হবে জনমুখী। কিন্তু ওই আশা দ্রুতই নিরাশায় পরিণত হয়।
নবাবী, ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের মতোই সাধারণ মানুষ রাজনীতি ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেনি। উল্টো তারা বারবার ব্যবহৃত হয়েছে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে; কখনো ক্ষমতারোহণের মাধ্যম, কখনো বা উন্নয়নের অজুহাত হিসেবে। ফলে সাধারণ মানুষ রয়ে গেছে উন্নয়ন-কাঠামোর বাইরে, আর ওই কাঠামো জীবনদায়ী না হয়ে ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে হন্তারক। যে রাষ্ট্রের হওয়ার কথা ছিল কল্যাণমূলক, তা আজ হয়ে উঠেছে নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের যন্ত্র। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশের মতো দুর্বল গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতাহীন সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রকাঠামো আজ মানুষের জন্য একেকটি মরণফাঁদ বিছিয়ে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের কাঠামোগত হত্যার ব্যাপ্তি বেড়েছে মাত্র। ফলে প্রতিনিয়ত কাঠামোগত হত্যার নানান বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে কাঠামোগত হত্যা তাই এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সড়ক ও পরিবহন, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালেই এই মরণফাঁদগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দশকের পর দশক ধরে আমরা দেখছি মানুষ সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়কে নিহত হয়েছেন ৩১,৫৭৮ জন। রাষ্ট্রের কাঠামোগত অবহেলা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিই প্রতি বছর এই লাশের মিছিল দীর্ঘ করছে।
পরিবেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রান্তিক মানুষ আজ চরম বিপন্ন। ভবদহের জলাবদ্ধতা তার জ্বলন্ত উদাহরণ; যেখানে রাষ্ট্রের অবহেলা বছরের পর বছর মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি ও দুর্বল স্বাস্থ্যবিধির কারণে দেশে প্রতি বছর ২ লাখ ৭২ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। এই পবিবেশ বিপর্যয় দেশের ২০১৯ সালের জিডিপির ১৭.৬ শতাংশ খরচের সমপরিমাণ ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো বায়ুদূষণ, যা ৫৫ শতাংশ অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী। এছাড়া নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া মানুষের আহাজারি তো আছেই। এই প্রতিরোধযোগ্য বিপর্যয়গুলো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উদাসীনতায় আজ আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে কাঠামোগত হত্যার সবচেয়ে ভয়াল ফাঁদ হলো জনস্বাস্থ্য খাত। সরকারের চরম উদাসীনতা ও অবহেলা কীভাবে নিমিষেই মানুষের জীবন বিপন্ন করে চলেছে তা আমরা প্রতি বছর দেখছি। ডেঙ্গুর মতো নিরোধযোগ্য রোগে প্রতি বছর শত শত মানুষের মৃত্যু রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতার প্রমাণ। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল দেখিয়েছেন যে, ২০২৩ সালে ৩ লাখ ২১ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং প্রাণ হারান ১,৭০৫ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও ২০২৫ সালে সরকারের উদাসীনতায় তা আবারও বেড়ে ১ লাখ ছাড়ায় এবং মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১২ জনে।
রাষ্ট্রের এই কাঠামোগত হত্যার নতুন আয়োজন হামে শিশু মৃত্যু। চলতি মাসের সংবাদপত্রের পাতা খুললেই দেখা যায়, প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো মায়ের কোল খালি হচ্ছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে কোনো না কোনো শিশু এই পৃথিবীর কূট রাজনৈতিক ছল তো দূরের কথা অ-আ-ক-খ বোঝার আগেই কাঠামোগত হত্যার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। অথচ এই নতুন প্রাণগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া ছিল রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
সরকারি হিসেবেই এ পর্যন্ত হাম ও এর লক্ষণ নিয়ে প্রায় ২৫০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের এই চরম অবহেলায় হাসপাতালের বাতাস আজ ভারী হয়ে উঠছে স্বজনদের কান্নায়। যে রোগটি প্রায় নিরাময়যোগ্য, ওই রোগে এত শিশুর প্রাণ যাওয়া কি কেবলই মৃত্যু, নাকি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড? সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই হত্যার জন্য কাউকে অভিযুক্ত করার সুযোগ থাকে না। কাঠামোগত কারণে যখন কেউ মারা যায়, তখন দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতার কোনো জায়গা থাকে না।
দেশি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ বলছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা ক্রয়ে ‘অবহেলা’ ও ‘উদাসীনতা’ এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে হামপ্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ ১৬ বছরে সেই টিকার পরিমাণ বেড়ে হয় ১১৮ শতাংশ। এই সময়ের মধ্যে দেশব্যাপী দ্বিতীয় ডোজ চালুর পর ২০২৪ সালে ওই টিকা নেওয়া শিশুর পরিমাণ বেড়ে হয় ১২১ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে সরকারের চরম উদাসীনতায় সারাদেশে হামের টিকার পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে আসে। এর পেছনের কারণ ছিল এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি। এই ঘাটতির কারণেই বর্তমানের এই মহামারী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর বরাবরের মতোই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছি লাশের সংখ্যা গণনায়। মৃত্যু যখন কেবল পরিসংখ্যানে পরিণত হয়, তখন আমাদের সংবেদনশীলতাও ভোঁতা হয়ে যায়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে গর্ব করার সুযোগ খুব একটা ছিল না, তবে টিকা কর্মসূচিতে আমাদের সাফল্য ছিল বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কিন্তু ওই অর্জিত সাফল্যও এখন হুমকির মুখে। অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছর পার হতে না হতেই কাঠামোগত হত্যার এই বীভৎস রূপ ফুটে উঠেছে। হাসপাতালের মুমূর্ষু শিশুদের ঢলই প্রমাণ করে যে, টিকা ক্রয়ে উদাসীনতা কত বড় বিপদ ডেকে এনেছে। এমনকি কিটের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত করাও সম্ভব হচ্ছে না। একজন মা জানতেই পারছেন না ঠিক কী কারণে তার সন্তানটি মারা গেল।
একটি রাষ্ট্র যখন কাঠামোগত হত্যার ফাঁদে পরিণত হয়, তখন ওই রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো সেটি হন্তারক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেন সেটিই প্রতীয়মান হয়েছে। এই রাষ্ট্রকাঠামোর পরতে পরতে যেন কাঠামোগত গণহত্যার ফাঁদ। যখন জনগণ আক্রান্ত হয়, ঠিক তখনই আমরা তা জানতে পারি। কিন্তু কাঠামোগত হত্যার সবচেয়ে ‘দারুণ ব্যাপার’ হলো সেটির জন্য কাউকে দায়ী করার সুযোগ থাকে না। হামের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট যে, এই হঠাৎ হামের উপদ্রবের মূল কারণ হলো ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারের অবহেলা। কিন্তু দেখুন, এই সন্তানহারা বাবা-মায়ের বিচার চাওয়ার কোনো জায়গা নেই, সুযোগও নেই। তাই এই কাঠামোগত হত্যা প্রতিরোধে রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। এই কাঠামোতে এমন বিধিমালা সংযোজন প্রয়োজন যা কাঠামোগত হত্যা হলে দায়ীকে বিচারের আওতায় আনতে পারবে। তাহলেই বর্তমানের কাঠামোগত হত্যার জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ও সম্ভাব্য আরও অনেক কাঠামোগত হত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
ভবদহে জল-নিপীড়ন: এই 'পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনে'র দায় কার?
সড়ক দুর্ঘটনা ও ডেঙ্গু উপদ্রব– কাঠামোগত এই সব গণহত্যার শেষ কোথায়