Published : 03 Apr 2026, 09:39 AM
ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ইরান যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন। এখন পরিস্থিতি এমন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ তার হাতের বাইরে চলে গেছে এবং তিনি সারাবিশ্বে কোণঠাসা। এই অবস্থায় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অপমান এড়াতে তিনি ইরানে স্থল আক্রমণের মতো চরম পদক্ষেপ নিতে পারেন—এমন শঙ্কা ক্রমশ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
নিজের স্বার্থেই ট্রাম্প বাড়াবাড়ির পথে হাঁটছেন। এই আচরণ ট্রাম্প ও আমেরিকা উভয়ের জন্য বিধ্বংসী হবে, তা যতই সীমিত সময় ধরে এবং ছোট পরিসরেই ঘটুক। বিগত দিনের মার্কিন অভিজ্ঞতাই তার সাক্ষ্য।
আসল কথা হলো, ইরান যুদ্ধের জটিল ফাঁদে ট্রাম্প বন্দি হয়ে পড়েছেন। কূটকৌশলের নামে যে জাল তিনি বিছিয়েছিলেন, সেই জালে জড়িয়ে পড়ে এখন নিজেরই দিশেহারা অবস্থা। এই উভয়সংকটে থেকে বের হওয়ার সহজ পথ খোলা নেই তার সামনে। তিনি যে সংকটে ডুবে আছেন, সেটি হলো হরমুজ প্রণালি।
এই একই প্রেসিডেন্ট, যে নিজের এক ভূতুড়ে কাল্পনিক জগৎ তৈরি করেছেন। তিনি সেখানে বারবার দাবি করছেন, যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছেন, ইরান শান্তি চায় এবং আলোচনা ঝড়োগতিতে এগোচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই উল্টো কথা বলে, ইরান সব ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েল এখনও বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ, আর ইয়েমেনি হুতিরা যুদ্ধে যোগ দিয়ে লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ বন্ধের উপক্রম করছে।
প্রকৃত অর্থে সমঝোতার ছিটেফোঁটাও দৃশ্যমান নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কোনো দেশই একচুল ছাড় দিতে রাজি নয়। গত মাসে, নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ট্রাম্প কূটনীতির পথ ছাড়ার আগে ইরানের সঙ্গে যে স্পষ্ট দূরত্ব ছিল, এখন তা আরও গভীর। সামনের দিনগুলোতে ট্রাম্প অবশ্যই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার বিপুল ফারাক টের পাবেন। সেই পরিস্থিতিতে তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ বৃদ্ধি করে স্থল হামলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ঘটনা কীভাবে এত দূর গড়াল, ভাবলেই অবিশ্বাস্য লাগে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যরা মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা সইয়েছে। তবুও একজন প্রেসিডেন্ট আবার মধ্যপ্রাচ্যে সৈন্য পাঠানোর কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন। আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রেসিডেন্ট হলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। যিনি কোনো একদা বিলাসী বৈদেশিক যুদ্ধের তুখোড় সমালোচক ছিলেন। তবে এই সিদ্ধান্ত কোনো দৈব বা আকস্মিক ঘটনা নয়; সুচিন্তিত নীতির প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে স্থল আক্রমণ শুরু করে, তার সম্পূর্ণ দায় বর্তাবে ট্রাম্পের ওপর। তখন তিনি নিশ্চিতভাবেই অন্যদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করবেন, আর সেই নিশানায় থাকবে পেন্টাগনের বাতিকগ্রস্ত ও কমিক বইয়ের যুদ্ধবাজ নেতা পিট হেগসেথ।
বাস্তবে যা ঘটছে, হোয়াইট হাউস তা ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষা করে যাচ্ছে। কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে তারা সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের কাছে ব্যর্থতা আড়ালের প্রধান উপায় সত্যকে অস্বীকার করা। তিনি দাবি করেছেন, ইরানি নেতাদের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ইরানে রেজিম পরিবর্তনের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে। তার এক অদ্ভুত অভ্যাস আছে, প্রথমে তিনি ঘটনা ঘটান, তারপর নিজেকে সেই ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখেন এবং সবশেষে দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। যেন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, উপসাগরীয় মিত্রদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা—এসব কিছুর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ঠিক তেমনি, বিমান হামলার মুখেও ইরানের অনমনীয় প্রতিরোধ এবং তেহরানে প্রত্যাশিত গণঅভ্যুত্থানের অনুপস্থিতির সঙ্গেও যেন তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
তিনি বুঝতেই পারছেন না, ইরান একটি অসম যুদ্ধ লড়ছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বোমাও ইরানের গর্ব, আদর্শ, বিশ্বাস ও ইতিহাসকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারবে না।
বিশ্ব থেকে ট্রাম্প ক্রমশ বিচ্ছিন্ন ও একা হয়ে পড়ছেন। তার ধনী আরব ব্যবসায়ী বন্ধুরাও আর তাকে বিশ্বাস করছে না। উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলো প্রতিরক্ষার বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যাটোর সহায়তা চেয়েছিলেন, ইউরোপের উত্তর ছিল, আমরা আপনাকে জানাব। ইরানের কুর্দিরাও তার মতো মানুষের আশ্বাসে প্রাণ বিসর্জন দিতে রাজি নয়। মার্কিন জনগণ ও মাগা ডানপন্থীদের যুদ্ধসমর্থন আগে থেকেই দুর্বল ছিল; এখন তা মরীচিকার মতো উধাও।
ট্রাম্পকে নেতানিয়াহু ইরান যুদ্ধে উসকে ছিলেন, এখন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কথামতো হামলা বন্ধ করতে রাজি নন। বেচারা ট্রাম্প! ইসরায়েলের তৈরি করা ইরান বিজয়ের গালগল্পতে বিশ্বাস এনেছিলেন; অথচ তা ছিল নিছক গালগল্প।
ফলে ইরানের জীবিত থাকা কট্টরপন্থী নেতারা যুদ্ধ জয়ের গন্ধ পাচ্ছেন এবং তাদের কঠোর অবস্থান দিন দিন আরও কঠোর করছেন।
কল্পনা করুন—পারস্য উপসাগরের বুকজুড়ে এখন হাজার হাজার মার্কিন মেরিন ও প্যারাট্রুপার মোতায়েন, আর সেই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ডনাল্ড ট্রাম্প। তখন আর আলাদা করে শত্রুর প্রয়োজন কোথায়? ইরানের সশস্ত্র বাহিনীতে সক্রিয় সদস্য প্রায় ছয় লাখ দশ হাজার, সঙ্গে আরও তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার রিজার্ভ। হয়তো দেশটি আকাশপথে বা গভীর সমুদ্রে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা অনেকটাই হারিয়েছে, কিন্তু পরিচিত স্থলভূমিতে ইরান এখনও এক দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষ।
ট্রাম্প যদি স্থল অভিযান শুরু করেন, ইরানিরা ইতোমধ্যে জানিয়েছে—তারা মানব ঢাল ব্যবহারের পথেও যেতে পারে, ঠিক যেমনটি দেখা গিয়েছিল ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধে। একই সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরও সতর্ক করেছে, ইরানে স্থল আক্রমণ ঘটলে নিজেদের ভূখণ্ডেই নির্বিচার বোমা বর্ষণের কৌশল গ্রহণ করা হবে।
স্থল অভিযান শুরু হলে হরমুজ প্রণালির উত্তর প্রান্তের উপকূলীয় সামরিক উপস্থিতি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোপন স্পিডবোট ঘাঁটিগুলোই প্রথম লক্ষ্য হবে। এই সম্ভাবনার কথা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়েই প্রকাশ্যে বলেছেন। পারস্য উপসাগরের আরও উত্তরে খার্ক দ্বীপ—সেখানকার তেল রপ্তানি টার্মিনালও হামলার তালিকায় আছে। নিষিদ্ধ খার্ক দ্বীপ দখল তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও দীর্ঘসময় ধরে রাখা কঠিন। এ ধরনের হামলার উদ্দেশ্য হবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে বাধ্য করা, যাতে জ্বালানি সংকট কিছুটা কমে আসে এবং ট্রাম্পের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে।
তবে ট্রাম্পের স্থল অভিযানের অন্তর্নিহিত সামরিক ঝুঁকিগুলো খুবই ভয়াবহ, সেখানে হতাহতের ঘটনা অবশ্যম্ভাবী। স্বল্পমেয়াদে অভিযান সফল হলেও, ইরানের পাল্টা আক্রমণ সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করবে। অভিযান এলাকার সম্প্রসারণ এবং দখলদারিত্বের স্থায়িত্ব নিয়ে তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন উঠবে। অভিযান ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েনের দাবি আরও জোরালো হবে। ইরাক ও আফগানিস্তানের মিশন-ক্রিপের ভয়ঙ্কর স্মৃতি যাদের মনে আছে, তাদের জন্য এই দৃশ্য হবে নিশ্চিতভাবেই আতঙ্কজনক। এর চেয়েও বিপজ্জনক এবং আত্মঘাতী পর্যায়ের বিকল্প হলো মার্কিন ও ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনীকে ইরানের লুকানো ও অস্থিতিশীল ইউরেনিয়ামের মজুদ ছিনিয়ে আনার জন্য পাঠানো।
ট্রাম্প বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তের বদলে শত্রুদের প্রতি তীব্র ক্রোধ এবং সীমাহীন শাস্তির হুমকি ছড়াচ্ছেন। এই পথে তিনি দুঃস্বপ্ন আলিঙ্গন ছাড়া কোনো প্রাপ্তি জুটবে না তার। যেকোনো যুক্তিবাদী মানুষ এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে।
ট্রাম্প মরিয়া হয়ে দাবি করছেন, ইরান গোপনে শান্তি ভিক্ষা করছে। তবে এই চরম বিতর্কিত দাবির ভেতরেই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার ছাপ রয়েছে। তিনি বুঝতে পারছেন, একটি দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী স্থলযুদ্ধ তার প্রেসিডেন্সিকে এই এক আঘাতেই বিধ্বস্ত করে দিতে পারে। কিন্তু সমস্যাটি হলো, ইরানের শাসকগোষ্ঠী তার এই দুর্বলতা খুব ভালোভাবেই জানে। তাই যৌক্তিকভাবেই ইরানিরা ট্রাম্পের পূর্ণ আত্মসমর্পণের শর্তযুক্ত ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করবে। বিপরীতে, পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান তাদের দাবিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরবে। সেই দাবিগুলো সুস্পষ্ট—মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের স্থায়ী অবসান, হরমুজ প্রণালির ওপর অবিসংবাদিত সার্বভৌমত্ব, আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
অবধারিতভাবে, ন্যূনতম দাবি পূরণে ব্যর্থ যে কোনো চুক্তিই ট্রাম্পের পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে। এই ন্যূনতম দাবি হলো—ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির চূড়ান্ত সমাপ্তির সূচনা, আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করা এবং পারস্য উপসাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
ট্রাম্প স্পষ্টতই যুদ্ধের অবসান চান, তবে নিজের শর্তের গণ্ডিতে। লক্ষ্য এমন একটি চুক্তি, যা ২০১৫ সালের বারাক ওবামার চুক্তির চেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ, ক্ষতবিক্ষত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ইরান তা দিতে রাজি হবে না। ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন মাত্র দুটি পথ খোলা— হয় নতি স্বীকার করা, না হলে সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করা।
এই ভয়ঙ্কর সন্ধিক্ষণে জোর দিয়ে বলা যায়—ইরান যুদ্ধ অবৈধ; এ যুদ্ধ শুরু করা উচিত হয়নি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধের অনেক বড় খেলোয়াড়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো আসন্ন হুমকি ছিল না। হোয়াইট হাউসের শাসনকক্ষে বসে ট্রাম্প নির্বোধের মতো সুবিধাবাদী খেলা খেলেছেন।
স্বৈরাচার থেকে ইরানিদের মুক্ত করবে বলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যে প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন তা এখন ধুলোয় মিশে গেছে।
এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হলো বিবদমান পক্ষগুলোর শর্তহীন আলোচনা। ট্রাম্পকে অবশ্যই তার চিরচেনা বড়াইপ্রবণ স্বভাব ছাড়তে হবে, নিজের ভুল স্বীকার করতে হবে এবং বিনয়ের সঙ্গে তা শুধরে নিতে হবে। কিন্তু পুরো বিশ্ব জানে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মূর্খ, হঠকারী ও আত্মমগ্ন নেতা থেকে এমন আত্মসমালোচনা আশা করা হাস্যকর।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় টার্মের পরিণতি যে বিপর্যয়কর হবে, তা আগেভাগেই ধ্রুবতারার মতো স্পষ্ট ছিল। আজ সেই বিপর্যয় নির্মম বাস্তবতা হয়ে আমাদের চোখের সামনে হাজির।
লেখাটি গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত। এর লেখক সাইমন টিসডাল একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক এবং দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক ও প্রধান ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমেন্টেটর। কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি গার্ডিয়ানের ফরেন এডিটর ও ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ইউএস এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মূলত ভূ-রাজনীতি, বিশ্ব নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং মানবাধিকার বিষয়ে তার ধারালো ও আপসহীন কলামের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।