Published : 08 May 2026, 09:13 AM
সরকার এরই মধ্যে এলপিজি, ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল, পেট্রোল, ডিজেল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সড়ক ও নৌপরিবহনে, বেড়েছে ভাড়াও। এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে তারা। বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত সম্মতির পর নড়েচড়ে বসেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পিডিবি। একই সঙ্গে খুচরা পর্যায়েও আনুপাতিক হারে মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল নির্বাহী আদেশে। তখন বিদ্যুতের দাম পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৮ শতাংশ বাড়ে। প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের দাম এখন ৭ টাকা ৪ পয়সা এবং খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে ৮ টাকা ৯৫ পয়সা।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পেছনে চিরাচরিত যুক্তি হচ্ছে উৎপাদন খরচ বেশি, কিন্তু বিক্রয় করতে হয় কমে। সঙ্গে আছে যুদ্ধজনিত প্রাথমিক জ্বালানির বাড়তি দাম। তাই দাম বাড়িয়ে ঘাটতি কিছুটা মোকাবিলা করা। আবার এই ঘাটতি মোকাবিলায় যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, সেই ভর্তুকি কমানোর জন্যই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো। অতীতে যতবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, ততবার এই যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বহুবার বিইআরসির গণশুনানিতে ভোক্তারা প্রশ্ন করেছেন—উৎপাদন ব্যয় বেশি কেন? উৎপাদন ব্যয় বেশি কারণ লুণ্ঠনমূলক উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে আছে দুর্নীতি, লুটপাট, অপচয়, অপ্রয়োজনীয় পরিচালনা ব্যয়; আছে অধিক দামে প্রাথমিক জ্বালানি কেনার বন্দোবস্ত, অধিক দামের জ্বালানি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাধিকার, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান ইত্যাদি বহুবিধ জ্বালানি অবিচার। আছে আইন করে দুর্নীতি করার রাষ্ট্রীয় কাঠামো। এসব লুণ্ঠন ও অনাচার কমানোর ব্যবস্থা কখনো না নিয়ে সবসময় বিদ্যুতের বাড়তি দাম ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অতীতে হয়েছে। এবারও সেই পথেই হাঁটছে নতুন সরকার।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও অবহেলা
বিএনপি সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় আসার আগে জনগণের সামনে যে নির্বাচনি ইশতেহার ও আলাদাভাবে ৩১ দফা দাবিনামা পেশ করে, তাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তাদের কিছু সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল। বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ব্যাপকভাবে দুরাচার-অবিচারের মুখে পড়ে। তখন এই খাতে কাঠামোগত লুণ্ঠন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ফলে জনগণের দৃষ্টি ছিল বিএনপি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে কী ধরনের সুবিচারের অঙ্গীকার করে তার ওপর।
২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি যে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করে সেখানে সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে—“গত দেড় দশকে সীমাহীন দুর্নীতি, অস্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া, ব্যয়বহুল স্বল্পমেয়াদি চুক্তি, আত্মঘাতী ক্যাপাসিটি চার্জ ও অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতার ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ব্যয়বহুল, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ কাঠামোয় পরিণত হয়েছে।”
“ফ্যাসিস্ট সরকারের নজিরবিহীন দুর্নীতির কারণে জাতির ওপর জ্বালানি খাতে বিশাল অঙ্কের দায় এসে পড়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জসহ রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় হ্রাস এবং স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।”
“সর্বনিম্ন ব্যয়ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে সর্বোত্তম জ্বালানি মিশ্রণ নিশ্চিত করা হবে।”
“জ্বালানির দাম সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছ রাখতে ট্যারিফ নির্ধারণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা জোরদার করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীন পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চালু করা হবে।” (বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন)।
বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার ১৭ দফায় বলা হয়েছে—“বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সকল কালাকানুন বাতিল করা হবে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ রোধ করার লক্ষ্যে জনস্বার্থবিরোধী কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনায় চলমান সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। আমদানি নির্ভরতা বাদ দিয়ে নবায়নযোগ্য ও মিশ্র এনার্জি নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং উপেক্ষিত গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আবিষ্কার ও আহরণে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
বলা ভালো, এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রাক্কালে এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটির প্রতিই সুবিচার করা হচ্ছে না।
দায়মুক্তির আইন ও প্রতারণা প্রপঞ্চ
গত আড়াই দশকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত চলেছে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ৫৪ নং আইন)’ নামের ভব্যতাবর্জিত লুণ্ঠনমূলক কালো আইন দিয়ে। এই আইন সুযোগ করে দিয়েছে এই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিজনিত জ্বালানি অপরাধ করার। ২০১০ সালে দুই বছরের জন্য এই আইন প্রণীত হলেও পরে চার দফায় ১৬ বছর এই আইনের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত করা হয়। এই আইনের বিধান অনুসারে প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার বা দরপত্রের বাইরে গিয়ে সীমিতসংখ্যক বা একক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও দরকষাকষির মাধ্যমে মন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে কাজ দেওয়া নিশ্চিত করা হয়। এই আইনের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর অধীনস্থ জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জ্বালানি খাতে একক দুর্বৃত্তায়ন নিশ্চিত করে।
আওয়ামী সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৪ (২০২৪ সালের ১৫ নং অধ্যাদেশ)’ নামের অধ্যাদেশ জারি করে এই কালো আইন রহিত করে। জারিকৃত অধ্যাদেশ বলে দায়মুক্তির আইন বাতিল বলে গণ্য হলেও ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাতিলকৃত অধ্যাদেশে দুটি আপত্তিকর অনুচ্ছেদ যুক্ত করে অতীতের সকল অপকর্মকে বৈধতা দিয়েছে। যেখানে বলা হয়:
(২) উক্ত আইন রহিতকরণ সত্ত্বেও— (ক) উক্তরূপ রহিতকরণের অব্যবহিত পূর্বে উক্ত আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তি বা সম্পাদিত চুক্তির অধীন গৃহীত কোনো ব্যবস্থা বৈধভাবে সম্পাদিত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে; (খ) উক্ত আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তির অধীন চলমান কোনো কার্যক্রম এমনভাবে অব্যাহত থাকিবে অথবা নিষ্পন্ন করিতে হইবে যেন উক্ত আইন রহিত হয় নাই;
সম্প্রতি বিএনপির নতুন সরকার সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই অধ্যাদেশের কোনো রকম সংশোধন ছাড়াই ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ১৮ নং আইন)’ নামে এটিকে অধ্যাদেশ থেকে আইনে পরিণত করে।
এই আইন করার সময় ফ্যাসিবাদী হাসিনা ও মুহাম্মদ ইউনূসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিএনপি সরকার। ফলে নতুন আইনেও জ্বালানি খাতে সংঘটিত সকল অপরাধকে এক ধরনের বৈধতা দেওয়া হয় জনগণকে প্রতারিত করেই। বিএনপি তার ৩১ দফা এবং নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া সকল প্রতিশ্রুতি অগ্রাহ্য করে জ্বালানি খাতের দায়মুক্তির আইনে অপরাধমূলক, আপত্তিকর ও জনস্বার্থবিঘ্নকারী অনুচ্ছেদ যুক্ত করে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
সংঘবদ্ধ দুর্নীতি ও জ্বালানি খাত
মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি খাত সংস্কারে কোনো কমিশন গঠন না করলেও ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’-এর অধীনে আওয়ামী সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি রিভিউ কমিটি গঠন করে। যার নাম ছিল, ‘ন্যাশনাল রিভিউ কমিটি অন পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্টস উইথ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস আন্ডার দ্য কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই (স্পেশাল প্রভিশনস) অ্যাক্ট ২০১০ (সিন্স রিপিলড)’। এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী। সদস্যরা ছিলেন—বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও সহ-প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিইও আলী আশফাক, বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের ইকোনমিক্স অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট শাহদীন মালিক। চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে রিভিউ কমিটি ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ‘বাংলাদেশ’স পাওয়ার জেনারেশন, ট্র্যাপড ইন কস্টলি কন্ট্রাক্টস: গভর্নেন্স ফেইলিওরস অ্যান্ড দ্য মেকানিক্স অব রেন্ট এক্সট্রাকশন’ শিরোনামে তাদের রিপোর্ট জমা দেন।
এই রিপোর্টে কমিটির মূল পর্যবেক্ষণ ছিল:
ক) আওয়ামী সরকারের দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন চারগুণ বেড়েছে, কিন্তু খরচ ১১ গুণ বেড়েছে। এই আইনটিই দুর্নীতির জন্য তৈরি হয়েছে, যেখানে সংঘবদ্ধ দুর্নীতি ঘটেছে। খ) বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো ভাড়া আদায়ের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেরাই জ্বালানি আমদানি করেছে, কিন্তু তাতেও দুর্নীতি হয়েছে। বিদ্যুৎ ক্রয়ের নামে কোম্পানিগুলো সরকার থেকে ভাড়া বাবদ অর্থ নিয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের চেয়ে দুর্নীতিই ছিল মুখ্য। গ) দুর্নীতির কারণে বিদ্যুতের দাম ২৫ শতাংশ বেশি হয়ে গেছে। ভর্তুকি না থাকলে বিদ্যুতের দাম ৪০ শতাংশ বেড়ে যেত। একেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে একেক দাম ধরা হয়েছে। সমঝোতার মাধ্যমে কাউকে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। দরপত্র ছাড়া বিশেষ বিধান আইনে এভাবে চুক্তি করার সুযোগ নিয়েছে গত আওয়ামী লীগ সরকার।
বলা ভালো, ড. ইউনূসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো বটেই, বিএনপি সরকারও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিয়েই তৎকালীন সরকারের কাঠামোগত দুর্নীতির সকল চ্যানেল সচল রেখেছে। ফলে অতীতের মতোই এই সরকারও দুর্নীতির সকল ছিদ্র চালু রেখেই ঘাটতি মোকাবিলার কথা বলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
জ্বালানি খাতের দুর্দশা ও অপশাসন
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যে সংকট চলছে, তাকে ‘আমেরিকার ইরান আগ্রাসনজনিত পরিস্থিতির ফলে উদ্ভূত সংকট’ বা প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের ‘বাজারের সংকট’ হিসেবে উপস্থাপনের একটা চেষ্টা শাসক দলের পক্ষ থেকে আছে। এটা মূল সংকটকে আড়াল করে পুরনো ব্যবস্থা সচল রাখার একটি কূটকৌশল। বাস্তবে এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। এই পরিস্থিতি গত আড়াই দশকের একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার ফল। এখানে নীতি ও আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লুণ্ঠনমূলক অবকাঠামো তৈরি করে লুটপাট ও টাকা পাচারের সুবন্দোবস্ত নিশ্চিত করা হয়েছে। এই কাজে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে থাকা শক্তিমান রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী অভিজাততন্ত্রের সুস্পষ্ট সমঝোতা আছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও সেই কাঠামো অক্ষত রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আইনকে শাসকশ্রেণীর আজ্ঞাবহ করে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সংকট সমাধানের বিশেষ ব্যবস্থা তৈরির মাধ্যমে জনগণকে প্রতারণার বন্দোবস্ত নিশ্চিত করা। কবি, প্রাবন্ধিক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার একে চিহ্নিত করেছেন ‘হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থা’ নামে।
এই দুর্বৃত্তায়িত কাঠামোগত লুণ্ঠন প্রচেষ্টার কোনো জায়গা মেরামত না করে সরকার ভোক্তাকে ভোগান্তির লক্ষ্য করেই এগিয়ে চলেছে। কেননা, বিদ্যুতের দাম বাড়লে সকল ক্ষেত্রে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভোক্তাসকল। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অর্থনীতি তো বটেই, জাতীয় উৎপাদন সক্ষমতাতেও তা প্রভাব ফেলবে।
শুধু তাই নয়, জ্বালানি খাতে সুশাসনের যে প্রত্যাশা ছিল জনমানুষের, সেটাও ভুলুণ্ঠিত হবে দারুণভাবে। বিএনপি তার ৩১ দফা ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ‘হাসিনাবিহীন হাসিনা শাসনের’ ধারা অব্যাহত রেখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কোনো সংস্কার না করে, দুর্নীতির কোনো সুরাহা না করে, কালো আইনের পুরনো ধারা না বদলিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোকেই যে সমাধান হিসেবে সাব্যস্ত করল, সেটা প্রমাণ করে বিএনপি জ্বালানি খাতের অচলায়ন সচল রাখতে চায়। এই বার্তা জনগণের জন্য স্বস্তির তো নয়ই, দুর্ভোগ ও দুঃখেরই বটে।