১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ‘বিমানের আওয়াজ শুনলে ভয় লাগে’

ওই ঘটনায় নিহতদের স্মরণে মঙ্গলবার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত শোক ও দোয়া মাহফিলে অংশ নিতে এসে জুনায়েদ যখন কথা বলছিল, তখনও তার দুই হাতে ব্যান্ডেজ দেখা যায়।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ‘বিমানের আওয়াজ শুনলে ভয় লাগে’
বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে এক বন্ধুর ছবি দেখাচ্ছে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ইমাম হোসেন জুনায়েদ।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Jul 2026, 11:31 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:42 PM

ঢাকার উত্তরার দিয়ারবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের আতঙ্ক পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ইমাম হোসেন জুনায়েদের পিছু ছাড়েনি। 

সেদিনের ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া এই শিশু বলছিল, “বিমানের আওয়াজ শুনলে আমার একটু ভয় লাগে বেশি। ভয় লাগে, মনে হয় আবার ক্র্যাশ করবে। এই নিয়ে ভয় হয়, চিন্তা আসে। না পেরে আমি চিৎকার দিই, কান্না করি। 

“কারণ বিমানটা যখন ক্র্যাশ করে আমি আগুনের ভেতরে ছিলাম। এতটা জোরে সাউন্ড ছিল, আমার তখন এত ভয় লাগছিল, আমি আর নিতে পারি নাই। আমার শরীর পুড়ে গেছিল, আমি আগুন গায়ে নিয়েই বের হইছিলাম।”

২০২৫ সালের ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর একটি 'এফ-৭বিজিআই' যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘হায়দার আলী’ ভবনে বিধ্বস্ত হয়। তাতে পাইলটসহ ৩৬ জন নিহত হন। 

নিহতদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক এবং একজন স্কুলকর্মী ছিলেন। আহত হন ১৭২ জন, তাদের মধ্যে জুনায়েদও একজন। 

নিহতদের মধ্যে জুনায়েদের দুই খালাত বোনও রয়েছে। 

নিহতদের মধ্যে জুনায়েদের দুই খালাত বোনও রয়েছে।

ওই ঘটনায় নিহতদের স্মরণে মঙ্গলবার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত শোক ও দোয়া মাহফিলে অংশ নিতে এসে জুনায়েদ যখন কথা বলছিল, তখনও তার দুই হাতে ব্যান্ডেজ দেখা যায়। 

জুনায়েদ বলে, ওই ঘটনায় কাছের বন্ধু মুহিত হাসান আরিয়ানকে হারিয়েছে সে। হারিয়েছে দুই খালাত বোনকেও।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গত এক বছরে দুর্ঘটনার ট্রমা মাইলস্টোন স্কুলের শিশুরা কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। 

পঞ্চম শ্রেণির আরেক ছাত্রী রুবাইদা নূর আলবিরার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় ওই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল সে।  

গত এক বছর কীভাবে কেটেছে জানতে চাইলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে রুবাইদা বলে, “আমার গত এক বছর সবদিক থেকে অনেক ভালো ছিল। মাঝখানে এই যে দুর্ঘটনা হয়ে গেল, তারপরে হাসপাতালে ছিলাম। একটু কষ্ট হয়েছিল, কিন্তু আবার শেষের দিকে এসে সব... বাসায় এলাম, আবার কয়েকদিন স্কুলেও এসেছি। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো হয়ে গেছে।

“আমার আলহামদুলিল্লাহ ট্রমা নাই। আমার এখন ভয় লাগে না। তবে ওই দিনের ঘটনা ভুলতে পারি না।”

তবে দুর্ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি এমন ছিল না জানিয়ে আলবিরা বলে, “হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার পরে একটু ভয় লাগত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই ভয় এখন পুরোপুরি কেটে গেছে।”

লেখাপড়া কেমন চলছে জানতে চাইলে সে বলে, “আমার পড়াশোনা আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো যাচ্ছে। শিক্ষকরা আমাকে অনেক সাহায্য করছে। আমাদের প্রিন্সিপাল ম্যাম অনেক হেল্প করছে।”

দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ভয় ছিল, এখন সেটা কিছুটা কেটেছে। এখন তারা স্বাভাবিকভাবে ক্লাস করছে বলে জানালেন শিক্ষিকা শামীম আরা খন্দোকার। 

তিনি বলেন, “আগে যে আতঙ্ক ছিল, এখন আর নেই। ওরা কাটিয়ে উঠছে। ওরা স্বাভাবিকভাবেই ক্লাস করছে আমাদের সঙ্গে।  আসলে ওদের তো কাউন্সেলিং করা হয়েছে। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ওরা সেরে উঠেছে।”

ইমাম হোসেন জুনায়েদ

ইমাম হোসেন জুনায়েদ

একই কথা বললেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা নুরুন নবী। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার পর প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাউন্সেলিং ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে আহত শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র একজন অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে চলে গেছে। বাকিরা আমাদের তত্ত্বাবধানে এখানেই ক্লাস করছে।”

শিক্ষার্থীদের ট্রমা কাটানোর উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার সাত থেকে দশ দিন পর থেকেই তাদের যে ট্রমা, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। আহত শিক্ষার্থীরা যখন হাসপাতালে ছিল, আমরা সেখানে আমাদের টিম পাঠিয়েছি। একটা টিম সেখানে রেখে তাদের সহযোগিতা করেছি।

“যারা একটু সুস্থ ছিল তাদের আমার ক্লাসে এনে খেলাধুলা, গল্প বলা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ট্রমাটা কাটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। সরকারও আমাদের সহযোগিতা করেছে। ব্র্যাক আমাদের এখানে বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছিল তাদের ট্রমাটা দূর করার জন্য। জাইকাও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সেটা আসলে কাজ করেছে।”