Published : 18 Sep 2026, 10:11 AM
উত্তাল পদ্মায় ফেরির ইঞ্জিন বিকল হয়ে মাঝনদীতে নিয়ন্ত্রণ হারানো কিংবা স্রোতের টানে ভেসে যাওয়ার ঘটনা যাত্রীদের মনে তৈরি করছে চরম আতঙ্ক।
৭ সেপ্টেম্বর রো-রো ফেরি ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান’ কয়েক কিলোমিটার ভেসে যাওয়ার ঘটনার পর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও শত শত যানবাহন পারাপার হওয়া এই নৌপথে ফেরিতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কীভাবে নিরাপদে বের হতে হবে, কোথায় লাইফ জ্যাকেট পাওয়া যাবে বা পানিতে পড়ে গেলে কী করতে হবে-এসব বিষয়ে যাত্রীরা জানেন না।
ফলে যান্ত্রিক ত্রুটির পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতিও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি।
মাঝ পদ্মায় ফেরি দুর্ঘটনায় পড়লে যাত্রীদের উদ্ধারে প্রস্তুতি থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনা ঘটলে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, ডুবুরি, স্পিডবোট ও উদ্ধারকারী নৌযান নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে তাদের।
তবে যাত্রীদের অভিযোগ, মাঝনদীতে ফেরি দুর্ঘটনার শিকার হলে সে সময় কী করণীয়, সে বিষয়ে তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার ও যাত্রীদের ক্ষোভ
মাগুরা থেকে আসা যাত্রী গফুর মোল্লা বলেন, “মাঝনদীতে ফেরি দুর্ঘটনার কবলে পড়লে কী করব, সে বিষয়ে কেউ কিছু বলে না। কোথায় লাইফ জ্যাকেট পাব, কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, ফেরি থেকে পানিতে পড়ে গেলে কীভাবে দ্রুত নিরাপদে পৌঁছাব-সেসবও জানি না।”
আক্ষেপের স্বরে তিনি বলেন, “এখন বিপদে পড়লে সবার যা হবে, আমারও তাই হবে।”
গত ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে পাটুরিয়া ঘাট থেকে রো-রো ফেরি ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান’ দৌলতদিয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। মাঝনদীতে পৌঁছালে তীব্র স্রোতের মধ্যে ফেরিটির ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। এতে ফেরিটি আর সামনে এগোতে পারেনি।
এক পর্যায়ে স্রোতের টানে ফেরিটি ভেসে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে চলে যায়। এতে ফেরিতে থাকা যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।
পরে প্রায় চার ঘণ্টা পর ফেরিটিকে উদ্ধার করে পাটুরিয়া ঘাটে ফিরিয়ে আনা হয়।
শফিকুল ইসলাম নামের আরেক যাত্রী বলেন, “মাঝ পদ্মায় বা পাড়ের অদূরে ফেরির ইঞ্জিন প্রায়ই বিকল হচ্ছে। তিন-চার ঘণ্টা পর ফেরিগুলো পাড়ে ভিড়ছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে।
“এ পরিস্থিতিতে আমরা যাত্রীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে থাকি। কখন কী হয়, সেটা তো বলা যায় না। কারণ এই নৌরুট মোটেও নিরাপদ না। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
শফিকুল বলেন, “ফেরিতে ওঠার সময় বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মাঝনদীতে ফেরি দুর্ঘটনার কবলে পড়লে কী করতে হবে, সেটা কেউ বলে না। এসব বিষয়ে যাত্রীদের ফেরিতে ওঠার আগেই জানানো উচিত।”
দুর্ঘটনায় উদ্ধার প্রস্তুতির কথা বলছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো
রো-রো ফেরি খান জাহান আলীর মাস্টার মো. নাসির উদ্দিন বলেন, “ছোটখাটো যান্ত্রিক ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। গত ৭ সেপ্টেম্বর ফেরি হামিদুর রহমানের হাইড্রোলিক পাইপ ফেটে যায়। ফলে ফেরিটি পাড়ে ভিড়তে পারেনি।”
তখন স্রোতের টানে কয়েক কিলোমিটার ভেসে যায় ফেরিটি। পরে অন্য একটি জাহাজের সহায়তায় সেটিকে পাড়ে নিয়ে আসা হয়।
এসব যান্ত্রিক ত্রুটি তো বলে-কয়ে আসে না। তাই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি পরীক্ষা যথাযথভাবে না হলে ঝুঁকি থেকেই যায়।”
রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, ফেরি বা ফেরিঘাট এলাকায় কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথমে গোয়ালন্দ ফায়ার স্টেশনের দল সেখানে গিয়ে উদ্ধার অভিযান চালায়। পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরি দল ঘাটে থাকায় তারাও তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারে নেমে পড়েন।
তিনি বলেন, “ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল আরিচা ঘাটে রয়েছে। তারাও স্পিডবোটে দ্রুত ঘটনাস্থলে যেতে পারবে। সেখানে ছয়জন এবং ফরিদপুরে তিনজন ডুবুরি রয়েছেন। এছাড়া প্রয়োজন হলে ঢাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি আনা হবে। ফেরি বা ঘাট এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে যত ডুবুরি প্রয়োজন, সেই সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।”
বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট শাখার এজিএম মো. সালাহউদ্দিন বলেন, “আমাদের প্রতিটি ফেরির ফিটনেস ও সার্ভে সনদ রয়েছে। এই নৌরুটে প্রতিটি ফেরি সনদধারী নাবিকরা পরিচালনা করেন।”
তিনি আরও বলেন, “ফেরি বা ফেরিঘাটে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে একাধিক সংস্থা সমন্বিতভাবে উদ্ধার অভিযান চালায়। ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, ডুবুরি এবং উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ও বিভিন্ন নৌযান প্রস্তুত রয়েছে।”