১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

পদ্মার তীব্র স্রোতে নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া রুটে ফেরি বন্ধ, দুর্ভোগ

এ পথে চলা ফেরি ‘কপোতি’ প্রায় তিন মাস ধরে বিকল, আর কে টাইপ ফেরি ‘ক্যামেলিয়া’ পদ্মার তীব্র স্রোতের কাছে অসহায়।

পাবনা প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 16 Sep 2026, 09:42 AM

Updated : 16 Sep 2026, 09:42 AM

পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে পাবনার নাজিরগঞ্জ ও রাজবাড়ীর ধাওয়াপাড়া নৌরুটে টানা এগারো দিন ধরে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রী এবং পরিবহন চালকেরা।

৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে নৌপথটিতে যানবাহন পারাপার পুরোপুরি বন্ধ আছে বলে জানিয়েছেন বিআইডাব্লিউটিসির নাজিরগঞ্জ-ধাওয়াপাড়া ফেরি সার্ভিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমএন আল শিবলী।

উপায় না পেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ট্রলার ও স্পিডবোটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ফলে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা হতে পারে।

মঙ্গলবার সকালে সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ ফেরিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে অলস বসে আছে ফেরি ‘ক্যামেলিয়া’। অন্যদিকে, কূল ঘেঁষে চলা ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী নিয়ে উত্তাল পদ্মা পার হচ্ছে নদীপাড়ের মানুষ।

স্থানীয়রা জানান, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী জেলার চালকেরা সময় ও খরচ বাঁচাতে এই পথ ব্যবহার করেন। এটি ব্যবহার করলে স্বাভাবিক দূরত্বের চেয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ বেঁচে যায়।

২০২৩ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কাছ থেকে নৌরুটটি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) অধিগ্রহণ করে। এরপর ‘কপোতি’ ও ‘ক্যামেলিয়া’ নামে দুটি ফেরি দিয়ে দিনে চারবার চলাচল (পারাপার) শুরু হয়।

এর মধ্যে কপোতি প্রায় তিন মাস ধরে বিকল, আর ক্যামেলিয়া পদ্মার তীব্র স্রোতের কাছে অসহায়।

নাজিরগঞ্জ ঘাটের টারমিনাল সুপারেন্টেন্ড খাইরুল ইসলাম খোকন বলেন, স্বাভাবিক সময়ে নদী পার হতে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট লাগলেও স্রোতের কারণে সম্প্রতি সময় লাগত আড়াই ঘণ্টার বেশি। পরবর্তীতে ইঞ্জিনের সক্ষমতা কমে আসা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।

বিকল্প পথ হিসেবে পরিবহনগুলোকে লালন শাহ সেতু ঘুরতে হচ্ছে অথবা দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ঘাট পাড়ি দিয়ে আরিচা হয়ে পাবনার কাজিরহাট যেতে হচ্ছে, ফলে বাড়তি সময় ও অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ গুনতে হচ্ছে।

এ নৌপথের যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, সিরাজগঞ্জ-পাবনা-নাটোরসহ উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগের এ সহজ পথটি নিয়ে বছরের পর বছর উদাসীনতা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে এ রুটে মানসম্মত ও শক্তিশালী ফেরি না দেওয়ায় সামান্য দুর্যোগেই পারাপার ব্যাহত হয়।

এ রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী কবীর হোসেন বলেন, “এই নৌপথটি শুরু থেকেই সরকারের অবহেলা দেখছি। অথচ সরকার এই নৌরুটে বিভিন্নভাবে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করছেন, আমাদের কোনো সুযোগ সুবিধা না দিয়েই।”

তিনি বলেন, “সাধারণত নাজিরগঞ্জ ঘাট থেকে ধাওয়াপাড়া ঘাটে একটি মোটরসাইকেল ও দুজন যাত্রীর ভাড়া নেওয়া হয় ২৫০ টাকা। এখন ফেরি বন্ধ থাকায় মোটরসাইকেল নেওয়া যাচ্ছে না।

“ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে গেলেও মাথাপিছু এক থেকে দেড়শ টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে। আবার মোটরসাইকেলের জন্য ১৫০ থেকে ২০০ টাকা অতিরিক্ত লাগবে।”

এদিকে বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক না থাকায় ঘাট এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়েছে।

নাজিরগঞ্জ ঘাটের মায়ের দোয়া হোটেলের মালিক আব্দুল আলীম জানান, “ঘাটটি সচল থাকলে, আমাদের বেচাকেনা ভালো হয়। ঘাট বন্ধ মানে আমাদের সব বন্ধ।”

এসব বিষয় দেখার কেউ নেই বলেও ক্ষোভ করেন তিনি।

টারমিনাল সুপারেন্টেন্ড খাইরুল ইসলাম খোকন বলেন, “নদীর পানি একটু স্বাভাবিক হলেই আমরা ফেরি চালাতে পারবো। তাছাড়া আমাদের স্যারেরা নিয়মিতভাবে এই রুটে ভালো ফেরি দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কমকর্তাদের চাপ দিয়ে আসছেন।”

ঘাট ইনচার্জ এমএন আল শিবলী বলেন, “নদীর তীব্র স্রোতের কারণে বড় ফেরির চাহিদা পাঠানো হলে বিআইডব্লিউটিসি ১৫ থেকে ১৮টি যান বহনে সক্ষম ‘কদম’ নামের একটি ইউটিলিটি ফেরি বরাদ্দ করেছিরল। কিন্তু মেরিন বিভাগের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।“

তিনি বলেন, “কে-টাইপ ‘ক্যামেলিয়া’ ফেরিটি মাত্র ৭-৮টি ট্রাক বহন করতে পারে। স্রোতের মধ্যে ফেরি চালাতে গেলে ইঞ্জিন অতিরিক্ত উত্তপ্ত (ওভারহিট) হয়ে বিকল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

“যাত্রী ও যানবাহনের নিরাপত্তার স্বার্থেই মূলত চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। নদী শান্ত না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক চলাচলে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে”, বলেন তিনি।