Published : 13 Mar 2026, 08:22 AM
যুদ্ধবাজ নিওকন বা নিওকনজারভেটিভ অর্থাৎ নয়ারক্ষণশীলরা তাদের বৈশ্বিক আধিপত্যের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে ইরানকে ধ্বংসের এক দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্নপূরণের মাধ্যমে। “এই যুদ্ধ বিশ্বধনীদের মাঝে নয়ারক্ষণশীল মিত্রগোষ্ঠীর মন মতো বিশ্ব গঠনের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার প্রকাশ। এই গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত আছে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং ইসরায়েলি সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছাড়াও পেট্রোডলার-নির্ভর উপসাগরীয় আরব রাজ্যসমূহ এবং আটলান্টিসিস্ট ইউরোপিয়ান চক্র। পররাজ্যে হস্তক্ষেপে উন্মুখ এই মতাদর্শ সমগ্র পশ্চিমা পুঁজিবাদী শ্রেণির ইচ্ছেকে প্রতিনিধিত্ব করে না, কিন্তু এরা একটা গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী যারা মূলত এনার্জি ও যুদ্ধাস্ত্রের মুনাফা দ্বারা পরিচালিত।” উদ্ধৃত কথাগুলো বলেছেন ইসরায়েলের হাদাশ পার্টির (ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট ফর পিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটি) সাবেক সংসদীয় উপদেষ্টা নিমরড ফ্ল্যাশেনবার্গ ৬ মার্চ জ্যাকোবিনে প্রকাশিত তার ‘Netanyahu’s Iran War Is Also the War of Global Neocon Elites’ শীর্ষক প্রবন্ধে।
স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরান আক্রমণের ঘটনা ট্রাম্পের নিছক পাগলামি নয়, বরং যুদ্ধবাজ পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফল, যার নেতৃত্বে রয়েছে আমেরিকা ও ইসরায়েল এবং এর ব্যাপ্তি বৈশ্বিক। এই পরিকল্পনার বীজ রোপিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। এর চারা গজায় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার পর। পূর্ণ রূপ লাভ করে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও পরে ইরাক আক্রমণের মধ্য দিয়ে। তখন ইরাকের তেলসম্পদ দখল ছিল মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমানে এই রাজনৈতিক মতাদর্শ যুক্তরাষ্ট্রে আরও শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এর লক্ষ্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দেশে দেশে ক্ষমতাসীন সরকার উল্টে দিয়ে বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্য নিশ্চিত করা।
এই নয়ারক্ষণশীল বৈশ্বিক গোষ্ঠীর কাছে ইরানের তেলসম্পদ দখলের চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশ্ন এড়াতেই ইরান আক্রমণকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন এবং তাতে সফলও হয়েছেন। কূপমণ্ডূক মানসিকতার মোল্লাতন্ত্রের নিপীড়ন থেকে ইরানি জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ট্রাম্প তার সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য পূরণে ব্যবহার করছেন। মুসলিম সমাজে শিয়া-সুন্নি বিরোধও ইরানের প্রতি সমর্থন বা বিরোধিতার ক্ষেত্রে কাজ করছে। সর্বশেষ, শাহের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আক্রমণে নতুন করে ক্ষমতা লাভের আশায় উল্লসিত। আবার প্রবাসী ইরানিরাও মোল্লাতন্ত্রের সমাপ্তির সম্ভাবনায় খুশি। সৌদি যুবরাজও ট্রাম্পকে এই হামলা শুরু করতে প্ররোচিত করেছেন।
এসব বিভ্রান্তিমূলক কারণ ছাড়াও ইরান আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে প্রথমেই চোখে পড়ে সেখানকার তেলের প্রতি ট্রাম্পের লোভ। বিশেষ করে ইরাক আক্রমণের ক্ষেত্রে তেলসম্পদই প্রধান লক্ষ্য ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের নানা বক্তব্যে স্বীকৃত হয়েছে। ভেনিজুয়েলায় মধ্যরাতে মাদুরোকে অপহরণের চেষ্টাতেও তেলের লোভ প্রধান। তবে সম্প্রতি ফ্ল্যাশেনবার্গসহ বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা রাজনৈতিক বিশ্লেষকের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই ইরান আক্রমণের লক্ষ্য দূরবর্তী, নয়ারক্ষণশীল সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠা। বিভিন্ন প্রকাশ্য-গোপন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশেও আমরা এর আঁচ অনেকাংশে বুঝতে পেরেছি।
ইরানের তেলসম্পদ লুণ্ঠন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অনেক লক্ষ্যের মধ্যে একটি। যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি, ইরান পুনর্নির্মাণের ভবিষ্যৎ ঠিকাদারি, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার অন্যতম সমর্থক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখা, নেতানিয়াহুর হুকুম তামিল করা; এসবই এই আক্রমণের কারণ হিসেবে বিদ্যমান। এমনকি এপস্টেইন ফাইলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশিত হওয়া থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যও এই আক্রমণকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে; এমনটি মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক ভোটার। তবুও যুদ্ধবাজ নয়ারক্ষণশীলদের বৃহত্তর বৈশ্বিক রাজনৈতিক কৌশল সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাকসসহ অনেকে অভিযোগ করছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজটি নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে দিয়ে করাচ্ছেন। ফ্ল্যাশেনবার্গ তার প্রবন্ধে আরও লিখেছেন, “এমন কথা প্রচারিত হচ্ছে যে, লেজরূপী ইসরায়েল কুকুররূপী যুক্তরাষ্ট্রকে নাড়াচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের কোনো লাভ না থাকলেও। এটা নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের দৃঢ় বন্ধনকে যথার্থভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হলেও... মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্ক বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। এই যুদ্ধকে দেখতে হবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে মার্কিন, ইসরায়েলি, ইউরোপীয় ও আরব শাসকদের একাংশের যৌথ উদ্যোগ হিসেবে। এই যুদ্ধবাজ মৈত্রীর কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা; যা এত বড় যে ছোট লেজের পক্ষে তা নাড়ানো সম্ভব নয়।”
৮ মার্চ জ্যাকোবিনে প্রকাশিত আরেকটি লেখায় (The Iraq War Was Not About Oil) নিউ ইয়র্কের সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল শিক্ষক ম্যাট হুবারও একই বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তার মতে এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতাকে মধ্যপ্রাচ্য ও সমগ্র পৃথিবীতে বিস্তারের বৃহত্তর নিওকন পরিকল্পনার অংশ। তিনি লিখেছেন, “১৯৭৯-এ ইরানি বিপ্লব ও ১৯৯১-এ সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত আক্রমণের ফলে স্পষ্ট হয় যে, অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাদ্দামকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ রক্ষার জন্য ইসরায়েল ও সৌদি আরবের পাশাপাশি এ অঞ্চলে আরেকটি মিত্রশক্তি বসাতে পারল।”
হুবার আরও লিখেছেন, “কিন্তু প্রমাণ রয়েছে যে, নিওকন ও তাদের ‘নয়া আমেরিকান শতক প্রকল্প’ (Project for a New American Century) এভাবেই ইরাক যুদ্ধ চেয়েছিল। ১৯৯৭ সালে তাদের কুখ্যাত বিবৃতিতে তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, বিশ্বপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কঠোরভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা রোধ করতে হবে। তারা বলেছিল, ‘ভবিষ্যতের সামরিক শক্তিকে আধুনিকায়ন করতে ও আজকের বৈশ্বিক দায়িত্ব পালন করতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে’ এবং ‘অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে এগিয়ে নিতে হবে।’ ... আগের মতোই লক্ষ্য হচ্ছে নিঃশর্ত ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। সঙ্গে কিছু তেল পাওয়া বাড়তি লাভ বৈকি।”
ইরান আক্রমণে জনসমর্থন জোগাড় করতে ইরানি জনগণকে মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের আহ্বান জানানো হচ্ছে। আবার যুদ্ধরত মার্কিন সৈন্যদের ধর্মোন্মাদনায় ডুবিয়ে প্রাণদানে উদ্বুদ্ধ করতে ট্রাম্পকে ঈশ্বর-নির্ধারিত ত্রাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অথচ এই ‘এপিক ফিউরি’ বা মহাকাব্যিক ক্রোধ নামের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ আক্রমণে না আছে কোনো মহাকাব্য, না ইরানি জনগণের মুক্তি, না ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি পূরণ; যা আছে তা এক মহাষড়যন্ত্র, যুদ্ধবাজ নয়ারক্ষণশীলদের বৈশ্বিক ক্ষমতা দখলের নীলনকশা। কিন্তু এই দখলদারিমূলক নীলনকশার ভালোমানুষি চেহারার ফাঁদেও পা দিচ্ছেন অনেকে!