Published : 10 Feb 2026, 01:50 PM
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন। স্বভাবতই প্রতিটি দলের নির্বাচনি ইশতেহারে এই অভ্যুত্থানের কথা থাকবে এটিই স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা বা মুক্তিযুদ্ধের নতুন বয়ান হাজিরের যে রাজনীতি জুলাই অভ্যুত্থানের পরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেই বাস্তবতায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে ১৯৭১ ইস্যুটিকে কীভাবে হাজির করে, তা নিয়ে আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্পূর্ণ তিনটি দল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির ইশতেহার পর্যালোচনার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
বিএনপির ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থান সম্পর্কে খুব বেশি কিছু নেই। যেমন তারা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ, গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণার্থে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের সার্বিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত ও এনসিপি যেভাবে ইশতেহারে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে সাতচল্লিশের দেশ ভাগ এবং মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা বলে উল্লেখ করেছে, বিএনপি সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সযত্নে এড়িয়ে গেছে। সম্ভবত তারা এই বিতর্কে প্রবেশ করতে চায়নি। বরং সরাসরি কিছু কর্মপরিল্পনার কথা ইশতেহারে উল্লেখ করেছে।
১৯৭১ তথা মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি কথা লিখেছে জামায়াতে ইসলামী। তারা ক্ষমতায় গেলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লিখবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে প্রমণিত। তারা যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী ছিল, এ কথা তারা নিজেরাও অস্বীকার করে না। তবে পাকিস্তানকে সহযোগিতার প্রশ্নে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে লিখিত বইপত্র ও গবেষণা প্রবন্ধে জামায়াতের ভূমিকার কথা যেমন লিপিবদ্ধ আছে, তেমনি রাজনৈতিক পরিসরে, বিশেষ করে ভোটের মাঠেও জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো বরাবরই জামায়াতকে ঘায়েল করার জন্য ১৯৭১ ইস্যুকেই সামনে নিয়ে আসে। যেমন এবারের নির্বাচনেও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বিএনপির নির্বাচনি প্রচারে দলের শীর্ষ নেতারা বারবার এটা বলেছেন যে, ‘১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকা কী ছিল, তা আমরা জানি।’ যদিও জামায়াত ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রচলিত আলোচনাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করে এবং সেই জায়গা থেকে তারা মনে করে, মুক্তিযুদ্ধের ‘সঠিক ইতিহাস’ লেখা হয়নি। আর এই ‘আক্ষেপ’ থেকেই জামায়াত এবার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে লিখেছে, ক্ষমতায় গেলে তারা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লিখবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস মানে কি জামায়াত যেভাবে মুক্তিযুদ্ধকে দেখে বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের যে বয়ান, সেটাই প্রতিষ্ঠিত করতে চায়?
প্রসঙ্গত, জুলাই অভ্যুত্থানের পরেই মূলত ১৯৭১ ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানারকম নতুন বয়ান সামনে হাজির করা হচ্ছে। শুধু জামায়াত নয়, বরং জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের মুখ থেকেও এই বয়ান শোনা যায়। যে বয়ানে মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান একজন ফ্যাসিস্ট; যে বয়ানে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ভারতের চর; যে বয়ানে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা দুই তিন হাজারের বেশি নয়; যে বয়ানে মুক্তিযুদ্ধ মূলত দুই পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত ভ্রাতৃপ্রতিম সংঘর্ষ; যে বয়ানে মুক্তিযুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ভারতীয় আধিপত্যবাদ। এই একই বয়ানের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধান ‘মুজিববাদী সংবিধান’ এবং যে সংবিধান ছুড়ে ফেলা বা যে সংবিধানের কবর রচনার ঘোষণা এসেছে তরুণদের একাশের মধ্য থেকেই।
সুতরাং যারা এই ধরনের বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠেছে বা যারা এই ধরনের বয়ানকেই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বলে মনে করে, তারা যখন নির্বাচনি ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লেখার প্রতিশ্রুতি দেয়—তখন জনমনে প্রশ্ন ওঠে, সেই ইতিহাস কি অতীতে লিখিত হাজার হাজার দেশি-বিদেশি বইয়ে প্রকাশিত তথ্য, বিদেশি পত্রপত্রিকার খবর, এমন কি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশিত জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত সংবাদ এবং ঐতিহাসিক ফ্যাক্টকে নাকচ করে দেবে? সেই ইতিহাসে কি নতুন কাউকে জাতির পিতা এবং নতুন কাউকে স্বাধীনতার ঘোষক বানানো হবে? এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বয়ানে আমরা অলি আহমদকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে পেতে চলেছি বলে মনে হচ্ছে। জামায়াতের সঠিক ইতিহাসে কি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গণহত্যাকারীর পরিবর্তে বিদ্রোহ দমনকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে? সেই ইতিহাসে কি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিদ্রোহী এবং ভারতীয় চর হিসেবে চিহ্নিত করা হবে? সেই ইতিহাসে কি মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতাকে আধিপত্যবাদ হিসেবে উল্লেখ করা হবে?
বলা হয়, এ পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রসহ আরও অসংখ্য বইতে মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে যেসব বইপত্র লিখিত হয়েছে, সেগুলো ঠিকমতো প্রচার করাই যথেষ্ট। কিন্তু জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস থেকে সরে যেতে চায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তাদের জন্য অস্বস্তির। তাই এখন তারা তাদের মতো প্রকৃত ইতিহাস লিখতে চায়।
নির্বাচনি ইশতেহারে জামায়াত লিখেছে: ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষ পরপর দুবার স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অসৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অগণতান্ত্রিক নেতৃত্বের কারণে সেই স্বাধীনতা অর্থবহ হয়ে ওঠেনি। দলটি মনে করে, জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত জুলাই বিপ্লব এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। শহীদ আবু সাঈদ থেকে শহীদ শরীফ ওসমান হাদীসহ হাজারো তরুণ জীবন উৎসর্গ করেছে একটি ফ্যাসিবাদবিহীন, স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে তাদের আত্মত্যাগ দেশের গণতন্ত্র, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে এক নতুন সকালের ইঙ্গিত দিয়েছে। অর্থাৎ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান একটি নতুন বাংলাদেশে গঠনের সূচনা করেছে বলে মনে করে জামায়াত।
নির্বাচনি ইতেহারে তারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য (সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার) রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার কথা বলেছে।
তবে জামায়াতের ইশতেহারে স্বভাবতই মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে জুলাই অভ্যুত্থান—যাকে তারা বলছে বিপ্লব। এই বিপ্লবের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরে আধুনিক ও টেকসই ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগ করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে পরিচালনা করা; জুলাই বিপ্লবে শহীদ এবং জুলাই যোদ্ধাদের জন্য প্রতি মাসে অনুদান ও ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করা; জুলাই বিপ্লবে শহীদের পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের জন্য আবাসন নির্মাণ এবং কর্মযোদ্ধা হিসাবে তাদেরকে পুনর্বাসন করা; অভ্যুত্থানে আহত ও পঙ্গু জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার সকল খরচ সরকারি কোষাগার থেকে নির্বাহ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে জামায়াত।
এখানে তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ এবং জুলাই যোদ্ধাদের জন্য প্রতি মাসে অনুদান ও ভাতা প্রদানের কথা বললেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেনি। অর্থাৎ তারা ক্ষমতায় গেলে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বহাল থাকবে নাকি বাতিল করা হবে; ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হবে নাকি কমানো হবে—সে বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছে।
জুলাই বিপ্লবে শহীদের পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের জন্য আবাসন নির্মাণ এবং কর্মযোদ্ধা হিসাবে তাদেরকে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে তাদের অবস্থান কী হবে—সেটি স্পষ্ট করেনি।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকেই চব্বিশের এই অভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সমান ভাবা এমনকি চব্বিশকে একাত্তরের চেয়েও মহান করার একটা চেষ্টা লক্ষ্যণীয়। অনেকে মনে করেন, যারা চব্বিশের অভ্যুত্থানকে একাত্তরের সমান বা একাত্তরের চেয়ে বড় করে দেখতে চায় তারা এর মধ্য দিয়ে মূলত একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি মুছতে চায়। যে কারণে তারা ইতিহাসের বয়ান শুরু করে ১৯৪৭ থেকে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির নির্বাচনি ইশতেহারেও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে তারা শুরু করেছে এভাবে: প্রায় দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক-গণমানুষের ধারাবাহিক প্রতিরোধের পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে রাষ্ট্র পুনর্গঠিত হয়, কিন্তু শোষণ ও বৈষম্যের অবসান ঘটেনি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক দমন এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে আরও দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তার মানে বছরের পর বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে যে বিভ্রান্তি জিইয়ে রাখা হয়েছে, এনসিপির নির্বাচনি ইশতেহারেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট। তারা তিরিশ লাখ শহীদ বলতে নারাজ। বলছে লাখো শহীদ।
৫৫ বছর পরেও কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়নি উল্লেখ করে তারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে দীর্ঘদিনের অপশাসন ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক রায় বলে উল্লেখ করেছে। এনসিপি বলছে, এই গণঅভ্যুত্থান কেবল সরকার পরিবর্তনের দাবি ছিল না, এটি ছিল বারবার স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়া পুরোনো বন্দোবস্তকে ভেঙে ফেলা।
মজার বিষয় হলো, নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি ও জামায়াত জুলাই বিপ্লবে শহীদ এবং জুলাইযোদ্ধাদের জন্য প্রতি মাসে অনুদান ও ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করা; জুলাই বিপ্লবে শহীদের পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের জন্য আবাসন নির্মাণ এবং কর্মযোদ্ধা হিসাবে তাদেরকে পুনর্বাসন করাসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও এই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের দল এনসিপির ইশতেহারে এরকম কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। বস্তুত, জুলাই শহীদ বা জুলাইযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি এনসিপির ইশতেহারে নেই। অথচ এই বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে বেশি থাকলেও সেটি অস্বাভাবিক হতো না। এখানে এনসিপি হয়তো কোনো একটি গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বদলে সর্বজনীন থাকার চেষ্টা করেছে।