Published : 06 Jun 2026, 05:42 PM
ভার্চুয়াল জগতে পা ফেলার বয়স গুনে গুনে মাত্র তিন সপ্তাহ। এর মধ্যেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আর ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ নেই। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বোস্টনের জীবন ছেড়ে আজ ৬ জুন যখন দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রেখেছেন, তখন তাকে স্বাগত জানাতে নগরের ঐতিহাসিক বিক্ষোভস্থল যন্তরমন্তরে হাজার হাজার তরুণের সমাগম ঘটেছে।
শুরুটা হয়েছিল গত মাসের ১৬ মে, তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক উন্মুক্ত শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশটির যুবসমাজের একটি অংশকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো জীবনযাপন করে। তাদের কোনো কাজ নেই, চাকরি নেই। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা হঠাৎ সাংবাদিক সেজে সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।”
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট করেন, “সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে বেরিয়ে আসে, তখন কী হবে?” সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের সঙ্গে মিল রেখে ১৬ মে তৈরি হয় দলটির ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট।
সরকারি মহলের চাপ, মেটার সহায়তায় অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা এবং পরে তা পুনরুদ্ধার—সব মিলিয়ে এক নাটকীয় পথ পেরিয়ে আজ সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২৩ মিলিয়ন। পার্টির কর্মীরা সামাজিক নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা নিয়ে নিয়মিত ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করছে। সেসব পোস্টে লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ।
এর মধ্যে অবশ্য অনেক কিছুই ঘটে গেছে।
ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং তাদের সমর্থকেরা অভিজিৎ দিপকের এই দ্রুত উত্থানকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তাদের মতে, এটি স্বতঃস্ফূর্ত কোনো আন্দোলন নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। বিজেপি-ঘনিষ্ঠ মহলের অভিযোগ, যুবসমাজের হতাশা ও বেকারত্বকে পুঁজি করে সরকারের বিরুদ্ধে কৃত্রিম অসন্তোষ তৈরি করা হচ্ছে। তারা একে ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’ বা অপপ্রচারের অংশ হিসেবে বর্ণনা করছে। সরকারপন্থি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শত শত প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে যে, অভিজিৎ ও তার অনুসারীরা মূলত ‘ডিপ স্টেট’ এজেন্ট। তরুণদের আবেগকে ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করাই তাদের উদ্দেশ্য। দ্য হিন্দু ও এনডিটিভির মতো মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো অভিজিতের ব্যক্তিগত জীবন, বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পড়াশোনা এবং কীভাবে একটি ইন্টারনেটভিত্তিক আন্দোলন বাস্তব জগতের প্রতিবাদে রূপ নিচ্ছে, তা নিয়ে নানা বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন করেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে বিবিসি, রয়টার্স ও আল জাজিরার মতো প্রতিষ্ঠান এই ঘটনাকে ভারতের জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের এক অভিনব ডিজিটাল প্রতিবাদ মনে করছে। তাদের বিশ্লেষণে, এটি ভারতের দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব, পরীক্ষায় দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার সংকটের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের এক ব্যঙ্গাত্মক বহিঃপ্রকাশ।
বিজেপির আইটি সেল এবং ডানপন্থি বিশ্লেষকদের একটি অংশ দাবি করেছে, সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা রাতারাতি বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বিদেশি শক্তির মদদ রয়েছে। তাদের অভিযোগ—ফিলিস্তিন, আইভরি কোস্ট ও মালয়েশিয়ার মতো দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা বট ব্যবহার করে এই জনপ্রিয়তা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে। তাদের দাবি, সিজেপির অনুসারীদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিক।
শুধুই তাই নয়, সরকার-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্ট ভারতে ব্লক করে দেওয়া হয় এবং তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটও অচল করে দেওয়া হয়। এর জবাবে অভিজিৎ সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী আচরণের অভিযোগ তুলেছিলেন। এদিকে সরকারপন্থি সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের একটি অংশ অভিজিৎকে তীব্রভাবে ট্রোল করা চালু রেখেছে। তাদের প্রশ্ন ছিল, আমেরিকায় বসে থেকে তিনি কেন ভারতের তরুণদের উসকে দিচ্ছেন? এর পেছনে কোনো বিদেশি এজেন্ডা কাজ করছে কি না?
অভিজিৎ দিপকে এবং তার সমর্থকেরা অবশ্য এসব অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে কোনো অজুহাত না দেখিয়ে সরাসরি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন অভিজিৎ। দিন চারেক আগে তিনি ঘোষণা দেন, আন্দোলনটি ভাইরাল হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে বহু নামী প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন। অনেকেই তাকে ভারতে না ফিরে আমেরিকাতেই নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কিন্তু তার মতে, “আমি ভারতের যুবসমাজ এবং এই আন্দোলনকে মাঝপথে ফেলে পালিয়ে যেতে পারি না। আমাকে দেশে ফিরতেই হতো।” দেশে ফিরলে সরকার কিংবা দিল্লি পুলিশ তাকে বিমানবন্দর থেকেই তিহার জেলে পাঠাতে পারে, এমন আশঙ্কা তার পরিবার ও বন্ধুরা প্রকাশ করেছিলেন। তার পরিবারের বাড়ির আশপাশে বিশেষ পুলিশি নজরদারির কথাও খবরে এসেছে। এর জবাবে অভিজিৎ বলেছিলেন, “আমি গ্রেপ্তার হতে ভয় পাই না। আমার দেশের সংবিধানের ওপর পূর্ণ আস্থা আছে। সংবিধান আমাদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার দিয়েছে।”
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ তিনি দেশে ফিরেছেন। তিনি যখন দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, ততক্ষণে আরশোলার জোয়ারে ভেসে গেছে ভারতের সংসদ ভবনের নিকটবর্তী যন্তরমন্তর। অবশ্য অভিজিৎ আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, কোনো ‘তেলাপোকা’র বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বিক্ষোভ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখার জন্য তিনি বারবার অনুরোধ করেছিলেন। কোনো রাজনৈতিক দলের পতাকা না আনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “সবার হাতে একটা বই থাকুক। জাতীয় পতাকা থাকুক। সংবিধান থাকুক।”
অভিজিতের দেশে ফেরার দিনের কর্মসূচি ছিল নিটসহ (NEET) বিভিন্ন সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারির দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি। অবশ্য সমাবেশ ঠেকাতে দিল্লি হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা করা হয়েছিল। মামলাকারীরা চেয়েছিলেন বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, মেট্রোস্টেশন এবং জাতীয় সড়কের প্রবেশপথে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হোক; কিন্তু জরুরি শুনানির আবেদন শুক্রবারই খারিজ হয়ে যায়।
যদিও শুক্রবার রাত থেকেই জাতীয় সড়কগুলোতে অতিরিক্ত নজরদারি শুরু হয়েছিল। সমাবেশ ভণ্ডুল করতে বিজেপি-সমর্থকদের একটি অংশ ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ককরোচ মারার জন্য কেউ কেউ স্প্রে নিয়ে এসেছিল বলেও খবরে জানা যাচ্ছে।
সব বাধা পেরিয়ে শনিবার সকালেই উপচে পড়ে যন্তরমন্তর। নানা বয়সী মানুষ, নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড হাতে সেখানে যোগ দিয়েছেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই প্রথম দেখা যায় অভিজিৎ দিপকেকে। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি সমাবেশস্থলে পৌঁছান তিনি। সাদা টি-শার্টের ওপর কালো জ্যাকেট এবং কালো টুপি পরা অভিজিতের হাতে ছিল ভারতীয় সংবিধানের প্রধান স্থপতি ভীমরাও আম্বেদকরের আত্মজীবনী। সমাবেশের শেষদিকে অভিজিৎ ঘোষণা দেন, তাদের পরবর্তী সমাবেশ হবে দিল্লির রামলীলা ময়দানে, আগামী ২৩ জুন।
শুধু অনলাইন সমর্থকদের ভরসায় অভিজিৎ দিপকে বোস্টনের নিশ্চিত জীবন ছেড়ে ভারতের মতো একটি দেশের অত্যন্ত জটিল রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছেন। ফলে তেলাপোকা পার্টি এখন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ক্ষণস্থায়ী উচ্ছ্বাস নয়; এটি এখন বাস্তব।
সামাজিক নানা অসঙ্গতির জবাবে বিদ্রুপকে রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দেওয়া এই আন্দোলন কি ভারতের রাজনীতিতে নতুন ঝড় তুলবে? এটি কি ক্ষমতাসীনদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠবে? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক ভাইরাল ঘটনার মতো হারিয়ে যাবে? সামনের দিনগুলোতে সেদিকেই নজর রাখাটা খুব একটা মন্দ হবে না।
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: [email protected]