২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা কমেছে, ‘বেড়েছে’ তীব্রতা

বাংলাদেশের উপকূলে অতীতে আঘাত হানা বেশ কয়েকটি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের সময়কাল ছিল অক্টোবর-নভেম্বর।

মঈনুল হক চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 28 Oct 2026, 01:23 AM

Updated : 28 Oct 2026, 01:23 AM

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে অক্টোবর মাসে ঝড়ের সংখ্যা বাড়ার সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা যায় না। তবে এ মাসে কোনো লঘুচাপ সৃষ্টি হলে অনুকূল পরিবেশে তা ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলছেন, ১৯০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানে অক্টোবর মাসে বঙ্গোপসাগরে মোট ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সংখ্যা বা প্রবণতা কমলেও, যেগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর অতিপ্রবল বা প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে পরিণত হওয়ার মাত্রা বেড়ে গেছে।

দুদিন আগে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড় অর্ণব ইতোমধ্যে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের রূপ পেয়েছে। ঘণ্টায় দেড়শ কিলোমিটার গতির বাতাসের শক্তি নিয়ে এ ঝড় ধেয়ে যাচ্ছে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে।

বুধবার দুপুরের দিকে অর্ণব উপকূল অতিক্রম করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ। ঝড়টির সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার আশঙ্কা কম থাকলেও এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হতে পারে।

অক্টোবর-নভেম্বরে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়

বাংলাদেশের উপকূলে অতীতে আঘাত হানা বেশ কয়েকটি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের সময়কাল ছিল অক্টোবর-নভেম্বর কিংবা এপ্রিল-মে। এসব দুর্যোগে প্রাণহানির পাশাপাশি বসতবাড়ি, কৃষি, গবাদিপশু ও উপকূলীয় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঝড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বিভিন্ন সূত্রে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি বলা হয়েছে।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারান এক লাখ ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেই ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেবার তিন হাজার ৩৬৩ জনের মৃত্যু হয়। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও সুন্দরবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২০০৮ সালের অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় রেশমি বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানে। পরের বছর ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়। সরকারি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে আইলায় বাংলাদেশে ১৯০ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।

২০১৪ সালের অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় হুদহুদ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হানে। তাতে ভারতের উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

২০১৯ সালের নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ঝড়টির প্রভাবে বাংলাদেশে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়। এর প্রভাব পড়ে সুন্দরবনেও।

প্রস্তুতিতে কমানো সম্ভব ক্ষয়ক্ষতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খান বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কবার্তা, জনসচেতনতা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া এবং গবাদিপশু সরিয়ে নেওয়ার মতো প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, “১৯৭০, ১৯৯১, ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলার, আম্ফানের মত দুর্যোগগুলোর সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে, বিভিন্ন নির্দেশক অনুযায়ী গত ১০ বছরে মানুষের মৃত্যুসংখ্যা, গৃহপালিত পশুপাখি এবং অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ডেফিনেটলি বা নিশ্চিতভাবেই কমেছে।

“ভৌগোলিক অবস্থান বদলানো সম্ভব না হলেও জনগণের কাছে সময়মতো বার্তা পৌঁছানো, সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া এবং পশুপাখি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।”

তবে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন এ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ। তার মতে, উপকূলীয় বাঁধ ও নদীর তীররক্ষা অবকাঠামোর দুর্বলতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের প্রভাব মোকাবেলায় আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষ করে নদী বা উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে প্রতিবছর যে ক্ষতি হয়, তা কমাতে অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সুন্দরবন রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কমাতে সুন্দরবন সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন মনিরুজ্জামান খান। তার মতে, সুন্দরবন উপকূলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। তবে বনটির বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে না পারলে দীর্ঘ মেয়াদে উপকূলীয় জনপদের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, “সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ ও দেয়াল, যা ঘূর্ণিঝড়ের প্রথম আঘাত নিজে সহ্য করে উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষা দেয়। সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনে স্থানীয় অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নৌপথের পরিবহন ব্যবস্থা এবং আশপাশে নানা প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।”

সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ কাটা, বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার, হরিণসহ বন্য প্রাণী হত্যা, গোলপাতা চুরি ও মধু আহরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধে কার্যকর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, শুধু প্রশাসনিক নজরদারি যথেষ্ট নয়। স্থানীয় মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে বন সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

পুরনো খবর

পুরনো খবর:

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানির চিত্র
ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই মিলবে ঘূর্ণিঝড়ের খবর, বলছে গবেষণা
সংখ্যায় কমলেও তীব্রতা বাড়ছে দুর্যোগের, প্রশমনে প্রস্তুতি কতটা?
ঘূর্ণিঝড়: কোন সংকেতে কী বোঝায়
ঝড় প্রস্তুতি: ব্রিটিশ আমলের সংকেত ব্যবস্থা বদলে আগ্রহ নেই
বাংলাদেশে প্রাণঘাতী যত ঘূর্ণিঝড়
মৃত্যু আর ধ্বংস নিয়ে ঘূর্ণিঝড় এসেছে বার বার
প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিল ‘অর্ণব’, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সংকেত