১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই মিলবে ঘূর্ণিঝড়ের খবর, বলছে গবেষণা

ঘূর্ণিঝড় ব্যাপক মাত্রায় শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগে সেটিকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এসে খাড়া বা উলম্বভাবে এক সারিতে আসতে হয়, যাকে বলে ঘূর্ণিঝড়ের ‘সোজা হয়ে দাঁড়ানো’।

ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আগেই মিলবে ঘূর্ণিঝড়ের খবর, বলছে গবেষণা
সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন ঝড়ের সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি শক্তিশালী ও সুগঠিত ঘূর্ণন বলয় থাকে। ছবি: ম্যাগনিফিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2026, 11:30 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:53 PM

সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় ভয়াবহ রূপ নেওয়ার প্রায় একদিন আগেই এর শক্তিশালী হয়ে ওঠার প্রাথমিক সংকেত পাওয়ার নতুন উপায় বের করেছেন বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞানীদের দাবি, এতে করে ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল ঘূর্ণিঝড়গুলো কীভাবে শক্তি সঞ্চয় করে সে বিষয়ে আগাম তথ্য জানা সম্ভব হবে, যা উপকূলীয় এলাকার মানুষকে দুর্যোগের প্রস্তুতি নিতে বাড়তি সময় দেবে।

বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ প্রতিবেদনে লিখেছে, মার্কিন ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা নোয়া’র ‘হারিকেন হান্টার’ প্লেনের ২৮ বছরের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উপকূল ধেয়ে আসা ঝড় বাতাসে ‘সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে’ কি না তা পর্যবেক্ষণ করে আগাম বার্তা পাওয়া সম্ভব।

গবেষণা বলছে, কোনো ঘূর্ণিঝড় ব্যাপক মাত্রায় শক্তিশালী হয়ে ওঠার আগে সেটিকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এসে খাড়া বা উলম্বভাবে এক সারিতে আসতে হয়। এ পুরো প্রক্রিয়াটিকে সাধারণ ভাষায় বিজ্ঞানীরা বলছেন ঘূর্ণিঝড়ের ‘সোজা হয়ে দাঁড়ানো’।

ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বায়ুমণ্ডলের উঁচুতে বিস্তৃত এক বড় ঘূর্ণায়মান বায়ুপ্রবাহ। আদর্শ পরিস্থিতিতে, বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উচ্চতায় ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন কেন্দ্র ঠিক একটির ওপর আরেকটি অবস্থান করে।

তবে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে প্রচণ্ড বাতাস থাকলে তা সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছের মূল কেন্দ্র থেকে ঝড়ের ওপরের অংশকে অন্যদিকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। ফলে ঝড়টি একপাশে হেলে পড়ে।

বায়ুমণ্ডলের নিম্ন ও মধ্যম স্তরের মধ্যে এ দূরত্বের তৈরি হওয়াকে আবহাওয়াবিদেরা ‘টিল্ট’ বা ঝড়ের হেলে পড়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর অন্যতম কারণ হলো ‘ভার্টিকাল উইন্ড শেয়ার’, অর্থাৎ বিভিন্ন উচ্চতায় বাতাসের গতি বা দিকের আকস্মিক পরিবর্তন।

অত্যধিক হেলে পড়া ঘূর্ণিঝড় সাধারণত শক্তি সঞ্চয় করতে পারে না। তবে ঝড়ের বিভিন্ন স্তর যখন আবার সোজা হয়ে এক সারিতে চলে আসে তখন তা শক্তিশালী হয়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ পায়।

‘ইউনিভার্সিটি অফ মায়ামি’ ও নোয়া’র গবেষকরা এমন চারটি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন, যা ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়কে নিজেকে এভাবে সোজা করে নিতে সাহায্য করে।

গবেষণায় বুঠে এসেছে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন ঝড়ের সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি শক্তিশালী ও সুগঠিত ঘূর্ণন বলয় থাকে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী বাতাসের গতির সঙ্গে মানানসই অবস্থায় থাকে এগুলোর হেলে পড়া অংশটি।

এর বাইরে ঝড়ের তলদেশীয় কেন্দ্রের কাছে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ ও ভারী বৃষ্টিপাত লক্ষ্য করা যায়। ঝড়ের আশপাশের পরিবেশও থাকে বেশ অনুকূল, যার মধ্যে রয়েছে সমুদ্রের উষ্ণ পানি, বাতাসে জলীয় বাষ্প ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যস্তরে তুলনামূলক শান্ত বাতাস।

১৯৯৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ২৮টি হারিকেন মৌসুমে নোয়া’র হারিকেন হান্টার প্লেন থেকে সংগৃহীত ১ হাজার ৫১০টি রেডার বিশ্লেষণ সংবলিত ‘টিসি-রেডার’ ডেটাবেইস পর্যালোচনা করে গবেষকরা এসব ধরন শনাক্ত করেছেন।

যেসব ঝড় শেষ পর্যন্ত সোজা হতে পেরেছিল সেগুলোতে প্রায় একদিন আগেই স্পষ্ট কিছু পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। সেগুলোর তলদেশে তুলনামূলক শক্তিশালী ও সুসংগঠিত প্রবাহের পাশাপাশি কেন্দ্রভাগের কাছে ব্যাপক আকারে শক্তিশালী বজ্রঝড়ের উপস্থিতি ছিল।

এসব বজ্রঝড় কেবল ঝড় সুসংগঠিত হওয়ার লক্ষণই নয়, বরং গবেষকরা বলছেন, এগুলোর ভেতরের শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ হেলে থাকা অংশটিকে টেনে সোজা বা উলম্ব অবস্থায় আনতে সাহায্য করে।

‘দ্রুত শক্তিশালী হওয়া’ বা ‘র‍্যাপিড ইন্টেন্সিকেশন’ পর্যায়ের পূর্বাভাস দিতে এ গবেষণা কার্যকর হতে পারে। কারণ খুব অল্প সময়ে হঠাৎ ঝড় বিধ্বংসী রূপ নিলে উপকূলীয় মানুষদের কাছে সতর্ক হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে না।

‘হারিকেন হান্টার’ প্লেনগুলো এরইমধ্যে নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে গবেষণায় উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের অনেকটাই মেপে দেখেছে, যা আবহাওয়াবিদদের কাছে বাস্তব সময়ের নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে।

পাশাপাশি কম্পিউটারভিত্তিক পূর্বাভাস মডেলগুলোর সক্ষমতা যাচাই ও আধুনিকায়নেও এ তথ্য সাহায্য করবে।

গবেষকদের দাবি, ঝড় শক্তিশালী হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ কেবল একদিন আগে টের পেলেও তা গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল ও মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া বা প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় পাবে।