অর্থাভাবে ধুঁকছে গবেষণাকেন্দ্র, অনিশ্চয়তায় সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরি
“সহযোগিতা তো দূরের কথা একজন সরকারি লোক ফোন করেও জিজ্ঞেস করেনি, কীভাবে এই সেন্টারটি চলছে,” বলেন সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ।
দেশে যেখানে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে সাত হাজার মানুষ সাপের কামড়ে প্রাণ হারায়, সেখানে এ সরীসৃপের বিষের প্রতিষেধক তৈরির একটি উদ্যোগ অর্থের অভাবে ধুঁকছে।
সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরিতে সাড়ে আট বছর আগে দেশের একমাত্র ভেনম রিসার্চ সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে।
গত আড়াই বছর ধরে সেন্টার কোনো সরকারি অর্থ বরাদ্দ পায়নি।
গবেষণাকেন্দ্রের মুখ্য গবেষক ও সমন্বয়কের ব্যক্তি উদ্যোগে এখনো সেন্টারটি চালু রাখা হয়েছে। তবে সেটিও আর বেশিদিন সম্ভব হবে না, বলছেন তারা।
এ অবস্থায় দেশে সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরির উদ্যোগ থেমে যেতে পারে।
ভেনম রিসার্চ সেন্টারটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) এক বছর ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। ডিপিপি অনুমোদন হলে এবং সরকারি বরাদ্দ পেলে গবেষণা কেন্দ্রটি টিকে যেতে পারে।
তা না হলে কেন্দ্রে থাকা ১১ প্রজাতির ৩৭০টি সাপ ও গবেষণার কাজে সংগ্রহ করা ১ হাজার ৭০০ গ্রাম সাপের বিষের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তায় পড়বে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় ও গবেষণা চালিয়ে নিতে অবিলম্বে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ে আহত হয়। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ লাখ মানুষ বিষধর সাপের আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে। প্রতি বছর ৪১ হাজার থেকে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে সাপের দংশনে।
এই বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃত স্থানীয় গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজারের বেশি মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালিত ‘ন্যাশনাল সার্ভে অন অ্যানুয়াল ইনসিডেন্স অ্যান্ড এপিডেমিওলজি অব স্নেকবাইট ইন বাংলাদেশ’ গবেষণা আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
গবেষণাটি বলছে, দেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ সাপের কামড়ে প্রাণ হারায় এবং প্রায় ৮ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সাপের দংশনের শিকার হয়।
সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় বাংলাদেশে মূলত পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম ব্যবহার হয়। এটি তিন ধরনের বিষধর সাপের বিরুদ্ধে কাজ করে। এগুলো হল: গোখরা (দুই প্রজাতি), ক্রেট বা কেউটে (৪/৫ প্রজাতির), রাসেলস ভাইপার।
এর বাইরে অন্যান্য যে বিষধর সবুজ সাপ রয়েছে সেগুলোর এবং বিষাক্ত সামুদ্রিক সাপের অ্যান্টিভেনম দেশে নেই।
এখনো বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম তৈরি হয় না। সরকারের অসংক্রামক ব্যাধি কর্মসূচি ভারত থেকে অ্যান্টিভেনম আমদানি করে। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কিছু সংগ্রহ করে দেয়।
গত বছর সরকারের উদ্যোগে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অ্যান্টিভেনম তৈরির কারখানা করার উদ্যোগের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
অঞ্চল ভেদে সাপের বিষের পার্থক্য থাকায় বাংলাদেশের জন্য অ্যান্টিভেনম তৈরির লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর নির্দেশনা অনুসারে ২০১৮ সালের মার্চে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম ভেনম রিসার্চ সেন্টার।
প্রকল্প শেষ, এখন কী হবে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির একটি প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধীনে গবেষণা কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়।
৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদী প্রকল্পটির শুরুতে সাপ ছিল মাত্র পাঁচটি। পরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নানা প্রজাতির সাপ সংগ্রহের পাশাপাশি গবেষণা কেন্দ্রে প্রজননের মাধ্যমে বাড়তে থাকে সাপের সংখ্যা।
তবে ২০২৪ সালের জুন মাসের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আর কোনো অর্থ বরাদ্দ মেলেনি।
বর্তমানে ভেনম রিসার্চ সেন্টারে রাসেলস ভাইপার, পিট ভাইপার, সবুজ বোড়া, পদ্ম গোখরা, খৈয়া গোখরা, কালকেউটে, শঙ্খিনীসহ ১১ প্রজাতির মোট ৩৭০টি সাপ আছে।
এসব সাপের খাবার হিসেবে গবেষণাকেন্দ্রে ইঁদুর পালন করতে হয়। মাসে প্রায় তিন হাজার ইঁদুর খাবার হিসেবে দেওয়া হয় সাপগুলোকে।
টাকার অভাবে ইঁদুরের খাবার ও লালন-পালন কঠিন হয়ে পড়ায় সাপের খাবারের পরিমাণও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০২৪ সালের জুনে প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পর বরাদ্দ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছি।
“পরে ডিপিপি প্রস্তুত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও জমা দিয়েছি। সেটা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় হয়ে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আছে। এটা একটা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।”
গত আড়াই বছরে সরকারি কোনো পর্যায় থেকে কেউ খোঁজ নেয়নি তুলে ধরে ডা. আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, “এটা খুবই দুঃখের যে, এতদিনে কোনো রকম সাহায্য সহযোগিতা তো দূরের কথা একজন সরকারি লোক ফোন করেও জিজ্ঞেস করেনি, কীভাবে এই সেন্টারটি চলছে।
“অথচ আমরা এই সময়ে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে গিয়েছি। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছেও গিয়েছি। যার কাছেই যাই তারা সবাই আশ্বাস দেন।”
মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই খরচের টাকা যোগাড় করে ভেনম সেন্টার এখনো চালু রাখা হয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “প্রতি মাসে শুধু ইঁদুর প্রয়োজন হয় তিন হাজার। ইঁদুরের খাবার বাবদ খরচ হয় এক লাখ টাকা। এছাড়া কর্মচারীদের বেতনসহ আনুষাঙ্গিক খরচ মিলে মাসে সাড়ে ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা খরচ হয়।
“বরাদ্দ বন্ধের পর থেকে কোটি টাকার ওপর খরচ হয়ে গেছে। সামান্য কিছু অনুদান আর বাকি বেশিরভাগ টাকা আমরা ধার করে সেই খরচ যোগাড় করেছি। এভাবে আর কতদিন সেন্টার টিকিয়ে রাখতে পারব জানি না।”
গবেষণায় অগ্রগতি কতটা?
প্রায় সাড়ে ৮ বছরের গবেষণায় দেশে আলোচিত রাসেলস ভাইপার সাপের অ্যান্টিভেনম তৈরিতে কয়েক ধাপের অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষণাকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তারা জানান, গবেষণা কেন্দ্রে রাসেলস ভাইপার সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষে মুরগি ও ইঁদুরের শরীরে সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এসব ছোট আকারের প্রাণিতে অ্যান্টিবডি তৈরির সাফল্যও এসেছে।
রাসেলস ভাইপারের জন্য মনোভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম (একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির সাপের বিষের প্রতিষেধক) তৈরির জন্য পরবর্তী কয়েক ধাপের কাজ এগিয়ে নিতে এ ট্রায়ালের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
গবেষণা কেন্দ্রের সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, “পরবর্তী ধাপের গবেষণা পরিকল্পনাসহ এই প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের ইন্টিগ্রেটেড হেলথ উইংয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এরপর আর কিছু জানানো হয়নি। তাই পরবর্তী ধাপের কাজ থমকে আছে।
“এরপর অ্যান্টিভেনম তৈরি করাটা হচ্ছে একটা ফার্মাসিউটিক্যাল প্রক্রিয়া। অ্যান্টিবডি যদি কাজ করে, তাহলে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হবে এবং সেটা ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানি তৈরি করবে। সেজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।”
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষকরা দেশি সাপ ও সাপের বিষ নিয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে ১১টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
এসব গবেষণায় বাংলাদেশে সাপের নতুন প্রজাতির উপস্থিতি শনাক্ত করা, বিষধর সাপের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও জিনগত বৈচিত্র্য, কোবরা ও গ্রিন পিট ভাইপারের বিষের গঠন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গোখরার বিষের জিনগত ও প্রোটিনগত পার্থক্য, জলবায়ু পরিবর্তনে সাপের আবাসস্থলের পরিবর্তন, সামুদ্রিক সাপের কামড়, সাপের বিষে আক্রান্ত হওয়ার চিকিৎসা এবং বন্দি সাপের পরজীবী সংক্রমণের মতো বিষয় প্রকাশিত হয়েছে।
সাপ ও বিষের ভাগ্যে কী আছে?
গবেষণায় অগ্রগতি হলেও অর্থাভাবে বর্তমানে ভেনম রিসার্চ সেন্টারের ল্যাবে পরীক্ষা, ডেটা বিশ্লেষণ ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালসহ প্রায় সব কাজই বন্ধ। শুধু ন্যূনতম খাবার দিয়ে সাপ ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইঁদুর বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
সহকারী গবেষক আবদুল আওয়াল বলেন, “সাপগুলোকে আগে প্রতি সপ্তাহে খাবার দেওয়া হতো। এখন দুই বা তিন সপ্তাহে খাবার দেওয়া হয়। খাবার পরিমাণেও কমানো হয়েছে। শুধু যতটুকু না দিলে সাপ বাঁচবে না ততটুকু খাবার দেওয়া হচ্ছে।”
গবেষণা কেন্দ্রের সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, “এতগুলো সাপ তো আর মেরে ফেলা যাবে না। আর বন জঙ্গলেও বিষধর সাপ ছেড়ে দেওয়া সম্ভব না। সাপগুলো এতদিন বন্দি অবস্থায় ছিল, তাই ছেড়ে দিলেও প্রকৃতি থেকে স্বাভাবিকভাবে খাবার সংগ্রহ করতে পারবে না।”
গবেষণার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ থেকে এখন পর্যন্ত এক কেজি ৭০০ গ্রামের মতো বিষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ধাপে ধাপে গবেষণায় ব্যবহারের জন্য বিষ সংগ্রহ করা হয়েছিল। এত পরিমাণে বিষ অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ও দামি।
“এসব বিষের ব্যবস্থাপনা কী হবে আমরা জানি না। এটা তো রাষ্ট্রীয় সম্পদ।”
ভেনম রিসার্চ সেন্টারের মুখ্য গবেষক অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ডিপিপি প্রস্তুত করে জমা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে এখন তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আছে।
“যদি অনুমোদন পায়, তাহলে সরকারি একটা উদ্যোগ হিসেবে ভেনম রিসার্চ সেন্টারটি চলবে। তখন আর অর্থ সংকটের ব্যাপারটা থাকবে না। তবে সেটা দ্রুত হওয়া জরুরি।”
