রঙ পাল্টাচ্ছে অ্যালবিনো সাপের, দেখা মিলছে বিভিন্ন স্থানে
শরীরের রঙ পরিবর্তন হলেও সাপের বিষধর বা বিষহীন হওয়াতে কোনো প্রভাব ফেলে না।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড়ে আট দিনে মিলেছে দুটি অ্যালবিনো জলঢোঁড়া ও একটি পদ্মগোখরা সাপ।
এসব প্রজাতির সাপের শরীরের স্বাভাবিক রঙ পাল্টে হচ্ছে হলদেটে, সাদা বা হালকা গোলাপি। কাছাকাছি সময়ে ভিন্ন রঙের এসব সাপের দেখা মেলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হচ্ছে আলোচনা।
প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণীদের অ্যালবিনো হওয়ার কারণ শরীরে রঞ্জক পদার্থ মেলানিনের ঘাটতি। সাপের বেলাতেও জিনগত এই বিষয়টি স্বাভাবিক। শরীরের রঙে প্রভাব ফেললেও সাপের বিষধর হওয়া বা বিষহীন হওয়াতে কোনো প্রভাব ফেলে না।
তবে অ্যালবিনিজমের কারণে স্বাভাবিক রঙ হারানো সাপগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশে ‘সহজ শিকার’ এ পরিণত হতে পারে, যা অ্যালবিনো সাপের টিকে থাকার জন্য ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষক ও প্রাণী নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যালবিনো সাপ আগেও বাংলাদেশে ছিল। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব সাপ বেশি প্রচার পাচ্ছে। পাশাপাশি প্রাণী রক্ষায় বিভিন্ন সংগঠনের সক্রিয়তা এবং মানুষের সচেতনতার কারণেও অ্যালবিনো সাপ এখন আলোচনায়।
গত ২৭ অক্টোবর পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের হলদিয়াপুকুর এলাকার একটি পুকুরে টেঁটা দিয়ে স্থানীয়রা একটি সাপকে আহত করেন। ইমন নামে এক তরুণ সাপটিকে উদ্ধার করে ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশ (ডব্লিউএসআরটিবিডি) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রাণী উদ্ধারকর্মী মো. সহিদুল ইসলামের কাছে। এরপর থেকে সাপটিকে নিজের কাছে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছেন তিনি।
সহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পঞ্চগড়ে এর আগে কখনো অ্যালবিনো জলঢোঁড়া সাপ উদ্ধার হয়নি। বাংলাদেশে যত অ্যালবিনো সাপ শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে অধিকাংশই জলঢোঁড়া।
“২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আমরাই পাঁচটি অ্যালবিনো পেয়েছি দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এ ছাড়া সম্প্রতি একটি অ্যালবিনো পদ্মগোখরা উদ্ধার হয়েছে। কিছুদিন আগে একটি অ্যালবিনো মেটে সাপও উদ্ধার হয়। আর ফেনীতে উদ্ধার হয়েছে আরেকটি লিউসিস্টিক (সাদা/ফ্যাকাশে) জলঢোঁড়া সাপ।”
পঞ্চগড়ের পর গত ১ নভেম্বর ঢাকার ডেমরা থেকে অ্যালবিনো পদ্মগোখরা সাপ উদ্ধার করে ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিমের সদস্যরা। এরপর ৩ নভেম্বর চট্টগ্রামের কর্নেলহাট এলাকার একটি বসতবাড়ি থেকে আরেকটি অ্যালবিনো জলঢোঁড়া সাপ উদ্ধার করেন তারা।
সংগঠনটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম প্রতিনিধি নাইমুল ইসলাম নিলয় বলেন, “আমাদের উদ্ধারকর্মী মেহেদী হাসান সাপটিকে উদ্ধার করেছেন। চট্টগ্রামে এরকম সাপ আমরা আগে পাইনি। এটাই প্রথম অ্যালবিনো জলঢোঁড়া।
“বর্তমানে সাপটি প্রাথমিক চিকিৎসা, পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের জন্য আমাদের কাছে রাখা আছে। পরে উপযুক্ত সময়ে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হবে।”
শরীরের রঙে ভিন্নতা ঝুঁকির কারণ
অ্যালবিনিজম হল এক ধরনের জিনগত অবস্থা। শরীরে যখন মেলানিনের উৎপাদন কমে যায় বা একেবারেই হয় না তখন প্রাণীর রঙ পরিবর্তন হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ‘সুপার নিউমারারি’ অধ্যাপক মো. ফরিদ আহসান বলেন, “জিনগত এ বিষয়টি মেলানিন সংকটের কারণে হয়ে থাকে। এটা ন্যাচারাল, মানুষেরও হয়ে থাকে। অন্য প্রাণীরও হয়। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।”
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহযোগী গবেষক মিজানুর রহমান বলেন, “অ্যালবিনিজম জেনেটিক। মূলত মেলানিন একেবারে অনুপস্থিত থাকলে তখন সাদা বর্ণের হয়। আর কিছুটা থাকলে লাল, গোলাপি বা হলদেটে সাদা হতে পারে।
“এরকম ভিন্ন রঙের সাপ দেখে ভুল বোঝার কিছু নেই। বিভ্রান্ত হওয়ারও কিছু নেই। এটা স্বাভাবিক জেনেটিক্যাল পরিবর্তন। কোথাও এরকম সাপ দেখা গেলে, মানুষ যেন উত্তেজিত হয়ে বা ভীত হয়ে কিছু না করে।”
পঞ্চগড় ও চট্টগ্রামে উদ্ধার হওয়া জলঢোঁড়া দুটি হলদে ও সাদা ছোপের। চোখের রঙ বাদামি। আর ঢাকায় উদ্ধার হওয়া পদ্মগোখরাটি হালকা গোলাপি রঙের, চোখ লালচে।
তবে এই ভিন্ন রঙের কারণেই ঝুঁকিতে পড়তে পারে অ্যালবিনো সাপ। পঞ্চগড়ে উদ্ধার হওয়ার সাপটিকে টেঁটা দিয়ে আহত করেছিল স্থানীয়রা।
ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিমের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাইমুল ইসলাম নিলয় বলেন, “অ্যালবিনো সাপের শরীরে অস্বাভাবিক রঙ প্রাকৃতিক পরিবেশে ছদ্মবেশ ধারণের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই অন্য শিকারি প্রাণীদের কাছে এসব সাপ সহজে চিহ্নিত হয়ে যেতে পারে। সে কারণে তাদের ঝুঁকি বেশি।”
‘অ্যালবিনো সাপ আগেও ছিল’
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্রজাতির অ্যালবিনো সাপের দেখা মিললেও একে ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভেনম রিসার্চ সেন্টারের সহযোগী গবেষক মিজানুর রহমান বলেন, “এমন না যে আগে প্রকৃতিতে অ্যালবিনো সাপ ছিল না। আগেও ছিল। তবে এখন কোথাও ব্যতিক্রমী এসব সাপ ধরা পড়লে ফেইসবুকের মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারা দেশে সেই তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যাপক প্রচার হচ্ছে।
“তাই মনে হচ্ছে অনেক অ্যালবিনো সাপ উদ্ধার হচ্ছে। প্রকৃতিতে এটি একটি স্বাভাবিক জেনেটিক ঘটনা।”
অ্যালবিনো হলেও সাপের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্যে কোনো পরিবর্তন হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, “যে সাপ বিষধর, সেটি অ্যালবিনো হলেও বিষধরই থাকে। আর যেটা নির্বিষ সেটা তেমনই থাকে। অ্যালবিনিজমের কারণে এর কোনো পরিবর্তন হয় না।”
তাই ভিন্ন রঙের সাপ দেখলেই তা ধরতে উৎসাহী না হতে আহ্বান জানান তিনি।
গবেষক মিজানুর বলেন, “প্রজাতিতে পরিবর্তন আসতে হলে বেশ কয়েকটি জিনে পরিবর্তন আসতে হবে এবং সেই পরিবর্তন ৫০ বছর থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হবে। অ্যালবিনিজমের কারণে তাই প্রজাতির কোনো পরিবর্তনের আশঙ্কা নেই।”
