কবরের অপেক্ষায় মুক্তিযোদ্ধার লাশ ও আমাদের লজ্জা
দণ্ডবিধির ২৯৭ ধারায় মৃতদেহের মর্যাদাহানি সুস্পষ্ট অপরাধ হলেও কেন নীরব প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার এই ধারাবাহিক চক্রান্তের স্বরূপ উন্মোচন।
সাতাশি বছরের একজন বৃদ্ধ মারা গেলে তার শেষযাত্রা নিয়ে কোনো সমাজে বিতর্ক হওয়ার কথা নয়। মৃত্যুর সামনে মানুষ সাধারণত নীরব হয়। শত্রুও মাথা নত করে। অথচ গত শনিবার পিরোজপুরে আমরা এক অন্যরকম দৃশ্য দেখলাম। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের বাড়িতে মারা যান গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। পিরোজপুর সদরের শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের মানুষ তিনি। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি ছিলেন বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম সাক্ষী। সেই সাক্ষ্যের মূল্য আজ তার লাশকেই দিতে হলো।
বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ এক সন্তানের লাশ পনেরো ঘণ্টা কবরের অপেক্ষায় পড়ে রইল। কারণ, তার শেষযাত্রায় যারা বাধা হয়ে দাঁড়াল, তারা ওই বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষ্য আজও ক্ষমা করতে পারেনি। এ দেশে আজ এর নাম রাজনীতি। কিন্তু আমি বলি, এটা নির্লজ্জতা।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাতে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ সদর উপজেলা পরিষদে আনা হলে সেখানে জামায়াত নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, লোকটি ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা; গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া যাবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও হবে না। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর পুলিশ লাইনসের ভেতরে গোপনে সম্মান জানানো হলো তাকে। কবর হলো রাত দেড়টায়, পুলিশ পাহারায়। পরে সেই জামায়াতের নেতারাই দাবি করেন, কবর দেওয়ায় তাদের কোনো বাধা ছিল না।
ইসলামে মৃতের দাফন ফরজ। যে ইসলাম মৃত্যুর পরও রাজনৈতিক হিসাব মেটায়, সেটা ঈমানের নয়, ক্ষমতার ইসলাম। জানাজা ও দাফন নিয়ে দখলদাররা কবর আটকে ইসলামকে দলীয় হাতিয়ার বানাল।
জামায়াতে ইসলামী আজ পর্যন্ত একাত্তরের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি। চায়নি, কারণ তারা এখনো মনে করে না যে তারা কোনো অন্যায় করেছিল। সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা কুড়িটি অভিযোগের আটটি প্রমাণিত হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে মামলার রায়ের পর সারা দেশে তাণ্ডবের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবনে নামালেও সাজা বহাল রেখেছিল। এটি আওয়ামী লীগের লেখা ইতিহাস নয়, আদালতের নথি। সেই নথির সাক্ষীকে যারা ‘ভুয়া’ বলেন, তারা আসলে আদালতকেই, ইতিহাসকেই, শহীদের রক্তকেই ‘ভুয়া’ বলতে চান।
মুক্তিযোদ্ধা কে, কে নন, তা ঠিক করার একটি রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া আছে। সেখানে আপত্তি থাকলে আইনের পথ খোলা। লাশের সামনে দাঁড়িয়ে সনদ বাতিলের এখতিয়ার কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নেই। যারা একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতকারী’ বলতেন, তাদের উত্তরসূরিরা পঞ্চান্ন বছর পর আরেকজন মুক্তিযোদ্ধাকে ‘ভুয়া’ বলছেন। ভাষা বদলেছে, মানসিকতা বদলায়নি।
এ প্রসঙ্গে পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর কথাও আসে। আমি বলছি না যে তিনি নিজে বাধা দিয়েছেন। কোনো প্রতিবেদনে তেমন তথ্য দেখিনি। কিন্তু তিনি এই আসনের সব ভোটারের প্রতিনিধি; মানিক পশারীর পরিবারও সেই সীমানার অন্তর্ভুক্ত। নিজের পিতার মামলার সাক্ষীর মৃত্যুর পর ঘটে যাওয়া এই কাণ্ডে একজন জনপ্রতিনিধির প্রকাশ্য অবস্থান কী, তা জানার অধিকার জনগণের আছে। আমার অনুসন্ধানে কোনো নিন্দা বা দুঃখপ্রকাশ চোখে পড়েনি। থাকলে আমি খুশি হব। না থাকলে সেই নীরবতাও একটি বক্তব্য।
সরকারের কথাও বলতে হয়। প্রশাসন শেষ পর্যন্ত গার্ড অব অনার দিয়েছে, পুলিশ পাহারা দিয়েছে—এ কথা সত্য। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাধা তৈরি হওয়ার পর সামাল দেওয়া নয়, বাধা তৈরিই হতে না দেওয়া। শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জামায়াতের লোকজন অবস্থান নিয়েছিল। তাদের হুমকি সবাই জানত। তবু একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাতে হলো পুলিশ লাইনসের দেয়ালের আড়ালে, আর কবর দিতে হলো মধ্যরাতে। যে রাষ্ট্র তার মুক্তিযোদ্ধাকে দিনের আলোয় সম্মান জানাতে পারে না, সে রাষ্ট্রের শাসকেরা কার ভয়ে কাঁপছেন, সে প্রশ্ন উঠবেই।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় প্রচলিত দণ্ডবিধি বা পেনাল কোডের ২৯৭ ধারায় বলা আছে, “কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্যে, বা আঘাত লাগতে পারে জেনেও, কবরস্থানে বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার স্থানে অনধিকার প্রবেশ, মৃতদেহের প্রতি অমর্যাদা কিংবা জানাজায় সমবেত মানুষের বিঘ্ন ঘটানো অপরাধ।” এই অপরাধের শাস্তি এক বছরের জেল ও জরিমানা। পিরোজপুরে মরদেহ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনিশ্চয়তা চলেছে। কবর ভরাট করতে হয়েছে। পরিবার নির্বিঘ্নে দাফন করতে পারেনি। এর চেয়ে স্পষ্ট ‘অমর্যাদা’ ও ‘বিঘ্ন’ আর কী হতে পারে? দলীয় ক্ষোভ আইনের চোখে কোনো অজুহাত নয়। ২৯৭ ধারায় মামলা হওয়া উচিত।
এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ভাবলে ভুল হবে। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর থেকে আমরা দেখছি, একাত্তর ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় আলাপের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক সারিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যে ভাষায় একসময় আমরা একাত্তরের কথা বলতাম, সে ভাষা এখন সংকোচে বলতে হয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ কথাটি কোথাও কোথাও প্রায় গালি হয়ে উঠেছে।
জামায়াতে ইসলামী নতুন বৈধতা পেয়েছে, সংসদে আসন পেয়েছে। আর যারা যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তাদের জীবনের শেষে এসে ‘ভুয়া’ তকমা শুনতে হচ্ছে।
এটি কাকতালীয় নয়। ইতিহাসের স্মৃতি মুছে ফেলার কাজ একদিনে হয় না। এটা করা হয় ধাপে ধাপে। প্রথমে প্রতীক সরে যায়, তারপর ভাষা, তারপর মানুষ। আজ একজন মানিক পশারীকে ‘ভুয়া’ বলা গেছে, কাল আরেকজনকে বলা যাবে, তারপর হয়তো গোটা একাত্তরকেই।
আজ একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার: মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এটি কোনো দলের স্লোগান নয়; এই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন। ফিরিয়ে আনতে হবে সেই বাংলাদেশ, যেখানে মুক্তিযোদ্ধা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন এবং মাথা উঁচু করেই বিদায় নিতে পারেন।
মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের একার নয়। এটি সেই ত্রিশ লাখ শহীদের, ধর্ষণের শিকার দুই লাখ নারীর, এবং মানিক পশারীর মতো সেইসব মানুষের, যারা অস্ত্র হাতে নিয়ে এই মাটির জন্য প্রাণ বাজি রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দেশের জন্মের দলিল। সেই দলিলের একজন জীবিত সাক্ষীর লাশ নিয়ে যদি টানাহেঁচড়া হয়, তাহলে সে অপমান কেবল একটি পরিবারের নয়, সমগ্র জাতির।
মানিক পশারী এখন চিতলিয়ার মাটিতে শুয়ে আছেন। তাকে কবর দিতে পুলিশ পাহারা লেগেছে—এই লজ্জা আমাদের সবার। এই লজ্জাকে যদি আমরা প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞায় রূপ না দিই, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
রাষ্ট্র যদি আজ দৃঢ় না হয়, সমাজ যদি আজ জেগে না ওঠে, তাহলে আগামীতে আরও অনেক মানিক পশারীকে একইভাবে অপমান সহ্য করতে হবে। সেদিন আর লজ্জা পাওয়ার মতো কেউ হয়তো অবশিষ্ট থাকবে না।
ড. মো. আবু নাসের: ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশন বিভাগের চেয়ারপার্সন।
