২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

বিরোধী দলে থাকতেই দাফনে বাধা, ক্ষমতায় গেলে কী করবেন: তাসনিম জারা

“যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃতব্যাক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।”

বিরোধী দলে থাকতেই দাফনে বাধা, ক্ষমতায় গেলে কী করবেন: তাসনিম জারা

বাধার মুখে মানিক পশারীর কবর খোঁড়েন নারী স্বজনেরা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Oct 2026, 10:45 AM

Updated : 26 Oct 2026, 10:52 AM

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর কবর দিতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা।

তিনি সোমবার সকালে ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ। ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন।

“কিন্তু একজন মৃত মানুষের সাথে ও তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে এমন আচরণ করেন। বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?”

তাসনিম জারা লিখেছেন, “আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।”

সাঈদীর মামলার বাদীর দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, “শনিবার সকাল দশটার দিকে ৮৭ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, মারা গেছেন। সারা দিন তাঁর পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাঁকে দাফন করতে দেওয়া হবে না।

“তাঁর জন্য বাড়িতে প্রথমে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল। মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি।’ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খুঁড়তে আর কাউকে পাওয়া যায়নি। যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃতব্যাক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।

“অবশেষে মাঝরাতের পর পুলিশ পাহারায়, মেয়ে আর বোনেদের খোঁড়া সেই কবরে ওনার দাফন হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে ছিলেন না।”

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপি জোট করায় তরুণদের দলটি থেকে পদত্যাগ করেন তখনকার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েন ঢাকা-৯ আসনে।

তিনি লিখেছেন, “মানিক পশারীর ‘দাফন পিরোজপুরে হতে দেয়া হবে না’ এই কথাটা জামায়াতের নেতাকর্মীরা এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাঁদের কাছ থেকে নিতে হবে।

“ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, ‘জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’ এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সাথে সাথেই, বিরোধী দলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন।”

মানিক পশারী গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন বলেছেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাঁকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও করতে দেওয়া হবে না। দাফনের পর সেই একই নেতা বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।

“মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তাঁরা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।”

তাসনিম জারা লিখেছেন, “একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে।”