ঢাকা মেডিকেলে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে মরদেহ নিয়ে স্বজনদের কান্না, সংকটে অন্য রোগীরা
গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে না পেরে চোখের সামনে ধুঁকতে দেখছেন স্বজনরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের ধর্মঘটে চরম ভোগান্তির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে; শোকাতুর মানুষের কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
একদিকে স্বজন হারানোর শোক; আরেকদিকে মরদেহ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার বাহন না পেয়ে হাসপাতাল ও আশপাশে ছোটাছুটি করেও কোনো বিহিত করতে পারছেন না তারা।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না কোনো অ্যাম্বুলেন্স। নিরুপায় হয়ে অনেককে সিএনজি অটোরিকশা কিংবা পিকআপ ভ্যানে লাশ নিয়ে যেতে দেখা গেছে৷
একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে না পেরে চোখের সামনে ধুঁকতে দেখছেন স্বজনরা।
মঙ্গলবার বিকালের পর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয়।
নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মারা যান নারায়ণগঞ্জের ৭০ বছর বয়সি হালিমা বেগম। মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে তিন ঘণ্টা। কিন্তু মাওয়ায় তার লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সও জোগাড় করতে পারেননি তার নাতি মো. শাহীন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহীন বলেন, "এমন বিপদে পড়ব তা কোনদিনও ভাবিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের কোনো দেখা নেই, বেসরকারিগুলোও বন্ধ।
"এখন লাশের পাশে বসে অপেক্ষা করছি। এই কষ্ট কাকে বোঝাব ভাই বলতে পারেন?"
একই ভবনের মেডিসিন বিভাগে বিকেল ৫টার দিকে মারা যান গুলিবিদ্ধ যাত্রাবাড়ীর ২২ বছরের তরুণ মো. রাসেল। মুগদা হাসপাতাল থেকে গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়েছিল উন্নত চিকিৎসার জন্য। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
ভাগনের অকালমৃত্যুতে স্তব্ধ মামা মো. মনির হোসেন মরদেহের পাশে নিশ্চুপ বসে ছিলেন। তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে তাকে লাশ ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "এত বড় সরকারি হাসপাতালে লাশ নেওয়ার একটা গাড়ি পাব না, এটা কল্পনাও করিনি। আমরা এখন সম্পূর্ণ অসহায়।"
শুধু লাশ নয়, এই ধর্মঘটের শিকার হচ্ছেন অন্য রোগীরাও। খুলনা থেকে গুরুতর আহত শাশুড়িকে নিয়ে এসেছিলেন আব্দুল আহাদ। চিকিৎসকরা তাকে জরুরি ভিত্তিতে কিডনি হাসপাতালে রেফার করলেও দুপুরের পর থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাননি তিনি।
আহাদ বলেন, সময়মতো রোগীকে অন্য হাসপাতালে নিতে না পারলে যেকোনো মুহূর্তে অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে। অথচ কেউ কোনো সমাধান দিতে পারছে না। তার আকুতি, "আমরা কী করবো ভাই এখন, আপনারাই আমাদের একটা ব্যবস্থা করে দেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা আরেক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ১৯ দিন আইসিইউতে থাকার পর তাদের স্বজন মারা যান রাত ১০টার দিকে। ৯৯৯ কল দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। রাত সাড়ে ১১টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সন্ধান পেলেও দাবি করা হয়েছে অনেক টাকা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, সম্প্রতি সব অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতাল চত্বর থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে তাদের দিয়ে জায়গাটি পরিষ্কারও করানো হয় এবং সেখানে সিসি ক্যামেরা ও লাইট স্থাপন করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেখান থেকেও গাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, "রাস্তায় গাড়ি রাখলে পুলিশ মামলা দেয়। আর হাসপাতালের ভেতরেও আমাদের জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। সিসি ক্যামেরা ও গেট স্থাপনে আমাদের কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমরা প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে সরকারকে রাজস্ব দিতেও রাজি আছি। কিন্তু ভাই একটা কথা আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ধর্মঘট চলবে।"
এদিকে হাসপাতালের ভেতর থেকে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে অনেকেই বাইরের অ্যাম্বুলেন্সের খোঁজ করছেন, কিন্তু ধর্মঘটের কারণে সেগুলোও ভেতরে ঢুকতে পারছে না।
