অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট: মরদেহ টানতে হল ভ্যান-পিকআপে
হাসপাতালে পার্কিংয়ের জায়গার দাবিতে মঙ্গলবার এ ধর্মঘটের ডাক দেয় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নির্দিষ্ট পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের আকস্মিক ধর্মঘটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো রোগী ও তাদের স্বজনরা।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে অ্যাম্বুলেন্স সরিয়ে নেওয়ায় সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে গেলেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স মিলছে না। ফলে মরদেহ বাড়ি নিয়ে যাওয়া কিংবা গুরুতর আহত ও অক্সিজেন-নির্ভর মুমূর্ষু রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে না পেরে স্বজনরা একটা অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে।
বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পুরাতন ভবন, নতুন ভবন ও বহির্বিভাগের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে পারেননি রোগী ও স্বজনরা। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ এ ফোন করেও কোনো সাহায্য মেলেনি বলে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন।
স্বজনদের কান্না আর সীমাহীন আকুতি
এদিন সকাল ৭টায় মারা যান ডেমরা থেকে আসা মো. হৃদয়ের মা।
হৃদয় বলেন, "দুপুর পার হয়ে গেলেও মায়ের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার কোনো গাড়ি পাচ্ছি না।"
একই রকম সংকটের কথা শোনান সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এক তরুণীর ভাই রেজাউল। মাওয়া থেকে ঢাকা আসার পথে ট্রাকের ধাক্কায় তার বোন আহত হন। মঙ্গলবার রাত ১২টায় তাকে ঢামেকে আনা হয়। চিকিৎসকরা তাকে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।
রেজাউল বলেন, “৯৯৯ এ ফোন করে কথা বলেছি এবং সরাসরি চালকদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তারা বলেছে, গাড়ি চলবে না। এখন বাজে দুপুর ২টা। এত চেষ্টা করেও বোনকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার মতো গাড়ি পাচ্ছি না।"
ভোলা থেকে দিনমজুর খালুকে গলার হাড় ভাঙার চিকিৎসা করাতে নিয়ে এসেছেন মো. জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি জানান, রোগীকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে এমআরআই করানো প্রয়োজন।
কিন্তু সকাল ৭টা থেকে দুপুর পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে জাহাঙ্গীর বলেন, "আমার খালু গাছ থেকে পড়ে গিয়েছেন, হাঁটতে-চলতে পারেন না। রোগীকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া দরকার, কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে নিতে পারছি না। আপনারা একটা সমাধান দেন।"
এদিকে চাঁদপুর থেকে আসা আক্তার বলেন, তার বাবা স্ট্রোক করায় এক সপ্তাহ ধরে ঢামেকে ভর্তি। আজ সকালে তাকে চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করতে পারেননি।
মরদেহ বাস বা সিএনজিতে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা
সকাল ১০টায় নোয়াখালীর বাসিন্দা আলমের মামা মারা যান ঢামেক হাসপাতালে।
আলমের দাবি, মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স চালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এর মধ্যে একজন চালক বলেছেন, ‘যেভাবে খুশি সেভাবে নিয়ে যান, আমরা কী করব।’
নিরুপায় হয়ে স্বজনরা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে মরদেহ প্রথমে বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার এবং সেখান থেকে বাসে করে নোয়াখালী পাঠানোর মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
শরীয়তপুরের সাঈদ মৃধা বলেন, তার নানিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রোগী সম্পূর্ণ অক্সিজেন-নির্ভর।
“অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া তাকে শরীয়তপুর নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত খুঁজেও কোনো গাড়ি পাইনি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পার্কিংয়ের দাবিতে মঙ্গলবার থেকে এ ধর্মঘটের ডাক দেয় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা। তাদের ধর্মঘটে বুধবার দ্বিতীয় দিনের মতো ভোগান্তির শিকার হন রোগী ও স্বজনরা।
বাংলাদেশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতবর বলেন, "আমরা চাই না সমস্যা হোক, রোগীরা বিপাকে পড়ুক। এখন সন্ধ্যায় আমাদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিটিং করে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।”
তিনি দাবি করেন, ঢাকা মেডিকেলে তাদের ১২০ থেকে ১৩০টি অ্যাম্বুলেন্স থাকে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো পার্কিংয়ের জায়গা দেওয়া হচ্ছে না।
“রাস্তায় গাড়ি রাখলেই পুলিশ এসে মামলা দেয়, ডাম্পিংয়ে পাঠায়। বর্তমানেও আমাদের একটি গাড়ি শাহবাগ থানায় ডাম্পিংয়ে আছে। আমরা সরকারকে রাজস্ব দিতে রাজি, কিন্তু আমাদের সুনির্দিষ্ট পার্কিং দিতে হবে।"
বাংলাদেশ বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমবায় সমিতির প্রধান উপদেষ্টা গোলাম মোস্তফা ফুয়াদ বলেন, "আমরাও মানুষ, আমরা চাই না সাধারণ রোগীদের কোনো অসুবিধা হোক। তবে আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত আমাদের ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে।"
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো. ফরহাদ হোসেন বিকেল ৪টার দিকে সাংবাদিকদের বলেন, "ঢামেকে রোগী আনা-নেওয়া করার জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রাখার বিধান বা নিয়ম নেই। উপরমহল থেকেও আমাদের এমন কথা বলা হয়েছে। একটু আগে শাহবাগ থানার ওসিসহ সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মিটিং করেছি। ওসি সাহেবকে বলেছি, তিনি বিষয়টি দেখবেন। এর আগে যেমন তারা বিজনেস করত, এখনও করবে, তাদের কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে না। তবে হাসপাতালের মধ্যে তাদের জায়গা দেওয়া হবে না, তারা বাইরে থাকবে।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা ৭ দিন সময় নিয়েছি। শাহবাগ থানার ওসি সাহেবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের পরবর্তী ধাপগুলো তিনি দেখবেন। তবে শেষ কথা হলো, সরকারি কোনো জায়গায় বেসরকারি কোনো অ্যাম্বুলেন্স থাকবে না। আমরা উপরমহলে কথা বলেছি এবং আশা করছি রোগীদের সেবার জন্য আরও বেশ কিছু সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা মেডিকেলে যুক্ত হবে।"
আরও পড়ুন
ঢাকা মেডিকেলে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে মরদেহ নিয়ে স্বজনদের কান্না, সংকটে অন্য রোগীরা
