Published : 06 Jun 2026, 04:34 PM
শুরুটা আর্যদের আগমন থেকেই হয়েছে। এরপর ১২০৩ সালে মুসলিম শাসকদের বঙ্গ বিজয়, ১৭৫৭ সালে ইংরেজদের রাজনৈতিক জয় এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম–ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে বাঙালিকে সাংস্কৃতিক শোধনবাদীদের মুখোমুখি হয়েছে। আর্যরা ‘রক্ত পরিশোধনের’ চেষ্টা করেছে। একইভাবে, ১২০৩ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পর মুসলিম শাসকরা ‘সংস্কৃতি শোধন’ করার চেষ্টা চালিয়েছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি তো বটেই, আরেক দফা ‘রক্ত পরিশোধনের’ চেষ্টা চালিয়েছে। ১৯৭১ সালে প্রথমবারের বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক বিজয়ীদের পরাজয় ঘটে। কিন্তু ২০২৪ সালে আপামর মানুষের গণ-অভ্যুত্থানকে কুক্ষিগত করে নেয় শোধনবাদীরা। সম্প্রতি ধর্মভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র শাসনের দাবি তুলে এই শোধনবাদীরা আরেক দফা সাংস্কৃতিক সংশোধনের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। এই প্রচেষ্টার নতুন হাতিয়ার বাঙালিকে ‘বাংলাদেশি’ করে গড়ে তোলা।
সামাজিকভাবে এই গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক শোধনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও সেটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে খুব কমই। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে এই শোধনবাদীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হয়। সেটি প্রথম আঁচ করা যায় সারা দেশে ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুরের ঘটনার মাধ্যমে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের একটি সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ‘৫ থেকে ১৪ অগাস্টের মধ্যে ৫৯টি জেলায় ১ হাজার ৪৯৪টি ভাস্কর্য, […] রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলা’ হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে অবস্থিত ভাস্কর শামীম সিকদারের ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য, ঢাকার শিশু একাডেমির সামনে ‘দুরন্ত’ ভাস্কর্য এবং দিনাজপুরের তেভাগা চত্বরে তির-ধনুক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাঁওতাল বিদ্রোহের স্মারক সিধু-কানুর ভাঙা ভাস্কর্য। দৈনিক প্রথম আলোর ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সংবাদে উল্লেখ করা হয়, এর মধ্যে ‘ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্তত ২০টি’ ভাস্কর্য-ম্যুরাল রয়েছে, যা এক বছরেও সংস্কার করা হয়নি। অর্থাৎ, প্রায় দুই বছর আগে শুরু হওয়া এই শোধন প্রক্রিয়া এখনও কার্যকর রয়েছে। এছাড়াও, এবছর প্রকাশিত ‘সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’–এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯৭টি মাজার হামলার শিকার হয়েছে। অর্থাৎ, বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে এমন স্থাপনা, ভাস্কর্য, নিদর্শন ও মূল্যবোধ প্রতিনিয়ত আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে অসংঘটিত মনে হলেও অনুমান করা যায়, প্রতিনিয়ত এই আঘাত অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ঢুকে পড়ছে। তাই স্বভাবতই একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে— বাংলাদেশে ‘কালচারাল পিউরিফিকেশনিজম’ বা ‘সাংস্কৃতিক শোধনবাদ’ আবার ফিরে আসছে কিনা।
অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ বেতার কর্তৃক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ উপস্থাপকদের জন্য জারি করা বিতর্কিত ‘ড্রেস কোড’ সংক্রান্ত নির্দেশনার পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। তাহলো, এই সাংস্কৃতিক শোধনবাদ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ঢুকে পড়ছে কিনা? সংবাদমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, এবছরের গত ৪ মে বাংলাদেশ বেতারের একজন পরিচালক কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। সেই নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানটি নারী ও পুরুষ সংবাদ উপস্থাপকদের জন্য পৃথক পোশাকবিধি নির্ধারণ করে দেয়। সেখানে নারী সংবাদ উপস্থাপকদের শাড়ি অথবা ওড়নাসহ সালোয়ার-কামিজ পরতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বড় আকারের টিপ ব্যবহার করা এবং এক পাশে ওড়না পরাকে নিষিদ্ধ করা হয়। শুধু তাই নয়, এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বেতারের বার্তা বিভাগের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্তকে ‘শালীনতা’র দোহাই দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া আরেকটি নির্দেশনায় একই ধরনের উদ্দেশ্য পরিলক্ষিত হয়। ২০২৫ সালের ২১ শে জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের জারিকৃত একটি আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের নারী কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ‘শর্ট স্লিভ ও লেংথের ড্রেস’ বা ছোট হাতা ও ছোট দৈর্ঘ্যের পোশাক ও লেগিংস পরার বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সেখানেও সেই অস্পষ্ট ‘শালীনতা’র অজুহাত দেওয়া হয়। সমালোচনার মুখে দুটি নির্দেশনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলবৎ হয়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সমালোচনার মুখে উভয় কর্তৃপক্ষ তাদের নির্দেশনা প্রত্যাহার করে নেয়। এই প্রত্যাহারের আদেশ দুটি দিক উন্মোচন করে। এক. এটি সমাজের চলতি মূল্যবোধ-বিরুদ্ধ একটি পদক্ষেপ। অর্থাৎ, সমাজ যে সামাজিক মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত, এই ধরনের নির্দেশনা হলো সেই স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক ধারার বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক স্বৈরাচার’। তাই বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সেটির প্রবল প্রতিবাদ করে। দুই. এই ধরনের নির্দেশনা সাংস্কৃতিক সংশোধনের একটি ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। একই সঙ্গে এটিও প্রতীয়মান হয় যে, এই ‘সাংস্কৃতিক স্বৈরাচার’ ধীরে ধীরে সমাজ কাঠামো থেকে রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।
তবুও, এই পর্যায়ে এটি স্পষ্ট যে এই প্রক্রিয়া সমাজের বিরাজমান বাঙালি মূল্যবোধ-বিরুদ্ধ। ফলে, এই নির্দেশনা জারির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবার তা জনগণের মধ্যে গভীর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে এবং উপরোক্ত প্রশ্নসহ আরও একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—সেটি হলো ব্যক্তিস্বাধীনতা। এটি সত্য যে, একটি প্রতিষ্ঠানে লিখিত বা অলিখিত পোশাকের এক ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে; কিন্তু সেটি যদি হয় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক শোধনের দোষে দুষ্ট, তাহলে সেই কার্যক্রম এক ধরনের সাংস্কৃতিক শোধনবাদের আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসে। এবারও ঠিক তাই হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে উদারনৈতিক রাজনীতির এক ধরনের নৈতিক পরাজয় হয়। সেই শূন্যস্থানে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করে সাংস্কৃতিক শোধনবাদীরা। পুরাতন ‘বাংলাদেশি’ বনাম ‘বাঙালি’ জাতিগত বিতর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়াশীলরা নারীদের পোশাক নিয়ে হেনস্তার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বিগত সরকারের সময় এই ধরনের ঘটনা ঘটলেও ২০২৪ সালের পর সেটি বহুগুণ বেড়ে যায়। এমনকি নারীর পোশাক বিতর্ক শারীরিক লাঞ্ছনা পর্যন্ত গড়িয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখা হয়— গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ওড়না পরা’ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীর এক ছাত্রীকে হেনস্তা করা, এবছর রাজধানীতে ওড়না নিয়ে এক নারী সাংবাদিককে হেনস্তা করা। এছাড়াও একইভাবে দেখা যায়, রাজধানীর বছিলা এলাকায় পোশাক নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদ করায় এক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এখন প্রায়শই ঘটছে এমন ঘটনা। এই ঘটনাগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো সাংস্কৃতিক শোধন, যার ভদ্রনাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশি সংস্কৃতি’, যার পেছনে রাখা হয়েছে ইসলামি মূল্যবোধের দোহাই। কারণ, যখনই এই ধরনের শোধনবাদী ঘটনা ঘটে বা বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তখনই যুক্তি হিসেবে ‘আমাদের সংস্কৃতি’ বলে সেটিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়; আর বাঙালি সংস্কৃতিকে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে নাকচ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, জাতিগত উদারতাবাদী বাঙালি সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে রক্ষণশীল ‘বাংলাদেশি সংস্কৃতি’। অথচ জাতিগতভাবে বিবেচনা করলে ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র সঙ্গে ‘বাংলাদেশি সংস্কৃতি’র আপাত কোনো পার্থক্য নেই। কারণ ‘বাঙালি‘ আমাদের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ‘বাংলাদেশি’ হলো আমাদের রাজনৈতিক পরিচয়; আর মুসলমানিত্ব বা হিন্দুত্ব আমাদের ‘ধর্মীয় পরিচয়’। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙালি হিসেবে আমাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন ভিন্ন হলেও আমাদের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ছিল একটিই— তাহলো আমরা বাঙালি। এর বাইরে অন্তত ৫০টির মতো আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীও রয়েছে এই দেশে।
সমাজবিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন যে, সংস্কৃতির সংজ্ঞায়ন করা পৃথিবীর অন্যতম একটি কঠিন কাজ। সংস্কৃতির অন্যতম আদি ও অর্থপূর্ণ সংজ্ঞা প্রদান করেন ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলর। ১৮৭১ সালে তিনি সংস্কৃতিকে একটি জটিল সত্তা হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ সংস্কৃতিতে গতিময়তা থাকে। ‘জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নৈতিকতা, আইন, প্রথা এবং সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ কর্তৃক অর্জিত অন্য যেকোনো সামর্থ্য ও অভ্যাস’কে তিনি সংস্কৃতির প্রধান উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন। আধুনিকতম সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করা হয় আরেকজন ব্রিটিশ ভাষাবিজ্ঞানী হেলেন স্পেন্সার-ওটির দেওয়া সংজ্ঞাকে। তিনি মনে করেন, সংস্কৃতি হলো একগুচ্ছ অস্পষ্ট অনুমান ও মূল্যবোধের সমষ্টি; সমাজের সদস্যদের জীবনের প্রতি ‘দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস, নীতি, কার্যপ্রণালি এবং আচরণগত রীতিনীতি’। এই দুই সময়ের দেওয়া সংজ্ঞার আলোকে দেখলে আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বাঙালিয়ানায় গ্রথিত। ভাষাবিজ্ঞানী হেলেন স্পেন্সার-ওটি একথা স্বীকার করেছেন যে, সমাজের একটি দলের মাধ্যমে অন্য দলের এই উপাদানগুলো প্রভাবিত হওয়ার প্রক্রিয়াও সংস্কৃতির অংশ। এছাড়াও বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ‘কল্পিত সম্প্রদায়' (ইমাজিনড কম্যুনিটি) বা হোমি কে. ভাবার ‘সাংস্কৃতিক মিশ্রণ’ (কালচারাল হাইব্রিডিটি)-এর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সংস্কৃতিতে সংযোজন ও বিয়োজন স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এই সংযোজন ও বিয়োজন যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়, তখন সেটি সাংস্কৃতিক শোধনবাদের দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্ত না হয়ে যদি চাপিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তখন তা আর সংস্কৃতি থাকে না। খুব সংক্ষেপে বললে, নতুন এই সাংস্কৃতিক উপাদান চাপিয়ে দেওয়ার কৌশলকে ‘কালচারাল পিউরিফিকেশন’ বা ‘সাংস্কৃতিক শোধনবাদ’ বলা হয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ১৪৩২ সনের পহেলা বৈশাখকে উল্লেখ করা যেতে পারে। ওই বছর দেখা যায় যে, তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পহেলা বৈশাখকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র পরিবর্তে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে পালন করার নির্দেশ দেয়। ‘মঙ্গল’ শব্দকে বিশেষ সাংস্কৃতিক ‘দোষে দুষ্ট’ বলে সেটিকে ‘আনন্দ’ শব্দ দিয়ে ‘শোধন’ করা হয়। অজুহাত হিসেবে বলা হয়, নাম নিয়ে সমাজের বিভাজন দূর করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অথচ এর পেছনে মূল কারণ হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় বিশ্বাস—সহজ ভাষায় বললে ‘বাঙালি গন্ধ’, যা জাতিগত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ভিত্তি। যদিও এই নাম পরিবর্তন নতুন নয়। ১৯৮৯ সালে চারুকলার প্রথম শোভাযাত্রা হয় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে। পরে নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শোভাযাত্রার নতুন নামকরণ করা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। এই প্রেক্ষাপট এখানে আলোচ্য বিষয় নয়, কারণ সেটি ছিল মূলত রাজনৈতিক ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন’। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনে যেটি করা হয়, সেটি ছিল মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে। ২০২৬ সালে এসে আরেক দফা নাম পরিবর্তন করা হয়; নতুন নাম দেওয়া হয় ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এই পরিবর্তনও সেই একই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। বৈশাখী শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন হয়েছে এবং হয়তো ভবিষ্যতে আবারও হবে। কিন্তু কেন পরিবর্তন করা হচ্ছে, সেটিই ধর্তব্যের বিষয়। সাংস্কৃতিক শোধনবাদের আয়নায় সেই পরিবর্তনের রূপ কেমন, সেটিই মূল আলোচ্য বিষয়।
সর্বোপরি, উপরোক্ত উদাহরণ থেকে বলা যায়, ‘বাংলাদেশি সংস্কৃতি’ নামে ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ প্রতিস্থাপনের যে প্রক্রিয়া, সেটি সাংস্কৃতিক সংশোধনবাদের বৈশিষ্ট্য বহন করে। অর্থাৎ, এটি অনুমান করা অত্যুক্তি হবে না যে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ স্পষ্টত সাংস্কৃতিক সংশোধনবাদের যুগে প্রবেশ করেছে।
এম. টি. ইসলাম জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ই-মেইল: [email protected]