১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ই-কমার্স: বাজার বাড়ছে, আস্থা কি বাড়ছে?

২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের আকার দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়ানোর পূর্বাভাস রয়েছে। রাজশাহীর আমচাষি থেকে শুরু করে কুমিল্লার নারী উদ্যোক্তা—সবার জন্যই এটি খুলে দিয়েছে নতুন দিগন্ত। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সমান্তরালেই কি বাড়ছে গ্রাহকের আস্থা?

ই-কমার্স: বাজার বাড়ছে, আস্থা কি বাড়ছে?
বাংলাদেশে ই-কমার্স বাজারের পরিধি দ্রুত বড় হলেও গ্রাহকদের আস্থার সংকট এখনও একটি বড় সংকট হয়ে আছে।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

Published : 06 Jun 2026, 09:12 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:21 PM

এই সেদিন, সকালে খবরের কাহজে চোখ বুলাতে গিয়ে দেখলাম, নারায়ণগঞ্জের একজন ব্যবসায়ী গত সপ্তাহে অনলাইনে একটি মোবাইল ফোন কিনেছিলেন। অর্ডার করার ১০ দিন পর পার্সেল হাতে পেলেন। কিন্তু বাক্স খুলে তিনি হতবাক, মোবাইলের বদলে ভেতরে আছে পাথর। এরপর কাস্টমার কেয়ারে বারবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাননি। ওই পেইজে বার্তা পাঠিয়েও পাননি কোনো উত্তর। শেষ পর্যন্ত অভিযোগ করার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে তিনি বুঝতে পারলেন, প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে তার কষ্টার্জিত টাকাটা হারিয়েছেন।

এই একটা ঘটনায় বাংলাদেশের ই-কমার্সের মূল সংকটটা স্পষ্ট হয়। বাজার বড় হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু গ্রাহকের আস্থার জায়গাটা এখনো নড়বড়ে। কিন্তু ছবির অন্য দিকটাও দেখা দরকার। ব্যাংকিং পেশা জড়িত থাকার কারণে নিয়মিত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয় আমার।

২০২৫ সালে রাজশাহীতে একটি ব্যাংকিং কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে বাঘা উপজেলার এক আমচাষির সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি বলছিলেন, আগে মৌসুমে স্থানীয় আড়তদারের মাধ্যমে আম বিক্রি করতেন। এখন ফেইসবুক ও কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে সরাসরি ঢাকার ক্রেতাদের কাছে আম পাঠান। এতে তার আয় বেড়েছে, একই সঙ্গে ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে ভালো আম পাচ্ছেন।

একই বছর কুমিল্লার লাকসামে একটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালায় অংশ নিতে গিয়ে এক নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে পরিচয় হয়। ঘরে তৈরি খাবার বিক্রি করে তিনি ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বর্তমানে অনলাইনে নিয়মিত অর্ডার নিয়ে তিনি শুধু নিজের আয়ের পথই তৈরি করেননি, কয়েকজন নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করেছেন।

প্রবৃদ্ধির কথাটা আগে বলা দরকার, তারপর সমস্যায় আসব। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩১তম বৃহত্তম ই-কমার্স বাজার। ই-ক্যাবের হিসাবে দেশে সক্রিয় উদ্যোগ দুই লাখ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন প্রায় আট লাখ অর্ডার হচ্ছে, দৈনিক লেনদেন একশো কোটি টাকার কাছাকাছি। ২০২১ সালে বাজারের আকার ছিল প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মধ্যে তা দেড় লাখ কোটি ছাড়াবে বলে রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের পূর্বাভাস।

বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল ১৩ কোটি ৮৬ লাখ। ফেইসবুক ব্যবহারকারী প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। আর সাড়ে তিন লাখের বেশি ফেইসবুক পেইজ এখন ব্যবসা চালাচ্ছে। সংখ্যা দেখে বাজারের সম্ভাবনা ভালো মনে হয়। তবে শুধু ব্যবহারকারী বাড়লেই হবে না, ভেতরের সমস্যাগুলোরও সমাধান করতে হবে।

মোট উদ্যোগের অধিকাংশ এখন ফেইসবুকনির্ভর। এদের বড় অংশের নিবন্ধন নেই, জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই, রিটার্ন পলিসি নেই। গ্রাহক প্রতারিত হলে যাবেন কোথায়? বেশিরভাগ সময় কোথাও না। চুপ করে থাকেন। পরেরবার অনলাইনে কিনতে দ্বিধা করেন। এই অবিশ্বাসের কারণেই অনেক মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

ই-ভ্যালির ঘটনা অনেকেই মনে রাখবেন। লোভনীয় ছাড়ের বিজ্ঞাপন দিয়ে কোটি কোটি টাকা নিয়ে পণ্য দেয়নি। সেই ধাক্কায় পুরো খাতের বিশ্বাসযোগ্যতায় চিড় ধরেছিল। ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর সঙ্গে ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ই-অরেঞ্জ নামক আরেকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও গ্রাহক প্রতারণার বড় কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হয়, যা এই খাতের সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। আলেশা মার্ট, কিউকম, ধামাকাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই পথে হেঁটেছে, যাদের সিংহভাগ এখন বন্ধ। ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।

পণ্য না পেয়ে ই-অরেঞ্জের সামনে ভোক্তাদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি

পণ্য না পেয়ে ই-অরেঞ্জের সামনে ভোক্তাদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি

এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে। এই খাতের সংকট কি শুধু আইনের অভাব, নাকি বাস্তবায়নের দুর্বলতা? উত্তর হলো, দুটোই আছে, তবে বাস্তবায়নের ঘাটতিটা বেশি। ডিজিটাল কমার্স পলিসি ২০১৮ সালেই হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালে এসক্রো সার্ভিস চালু করেছে। নির্দেশিকায় পণ্য সরবরাহের সময়সীমাও নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু কে দেখছে? যে অধিদপ্তরের কাজ তদারকি করা, তাদের লোকবল ও প্রযুক্তি দুটোই অপ্রতুল। ফলে নিয়ম কাগজে থাকে, মাঠে দেখা যায় না।

লজিস্টিকস আরেকটা পুরনো প্রসঙ্গ, তবে বাস্তবে এর ক্ষতিটা অনেক বড়। ঢাকায় দ্রুত ডেলিভারি হচ্ছে, পেপারফ্লাই, রেডএক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এসেছে, সেটা ভালো। কিন্তু দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে থাকে। সেখানে সার্ভিস এখনো অনিয়মিত। অথচ দেশে প্রায় ১০ হাজার পোস্ট অফিস আছে, ৪০ হাজার কর্মী আছে। এই নেটওয়ার্ককে ডিজিটালাইজ করে কাজে লাগালে গ্রামীণ ডেলিভারির সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতো। এই সুযোগটা এখনো পুরোপুরি ব্যবহার হয়নি।

বিনিয়োগের পরিস্থিতি নিয়েও একটু বলতে চাই। লাইটক্যাসল পার্টনারসের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলছে, সে বছরের প্রথমার্ধে দেশের ই-কমার্স ও স্টার্টআপ খাতে মাত্র ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিনিয়োগ এসেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৭ শতাংশ কম। পতনের কারণগুলো পরিচিত, কর-সংক্রান্ত জটিলতা, নীতিমালার অনিশ্চয়তা, কাঠামোগত দুর্বলতা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই অনিশ্চয়তায় সরে যাচ্ছেন, এটা উদ্বেগের।

আরেকটা হিসাব দেখা দরকার। বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ ডলারের ফেইসবুক বিজ্ঞাপন খরচ হচ্ছে। গুগল, ফেইসবুক, অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই বাজার থেকে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাজস্ব বোর্ডের আদায় এর ধারেকাছে নেই। এই টাকার একটা অংশও যদি দেশে রাখা যেত, ই-কমার্স অবকাঠামো তৈরিতে কাজে আসত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক বাজার। দেশের অনেক উদ্যোক্তা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন যে ভালো পণ্য ও সেবা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। তবে এই পথকে আরও সহজ করতে হলে পেমেন্ট ব্যবস্থা, পণ্য পাঠানোর প্রক্রিয়া এবং নীতিগত জটিলতা কমাতে হবে। সময়মতো উদ্যোগ নিতে না পারলে এই বাজারের বড় অংশ অন্যদের হাতে চলে যাবে।

আঙ্কটাডের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন বলছে, বৈশ্বিক ই-কমার্স রপ্তানি বাজার পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। জামদানি, নকশিকাঁথা, চামড়াজাত পণ্য, আইটি সার্ভিস, এসবের জায়গা সেখানে আছে। ই-ক্যাবের তথ্যমতে দুই হাজারের বেশি উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে আমাজন, এটসি বা ইবেতে কাজ করছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে নেই, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স জটিল, পণ্য সার্টিফিকেশন কঠিন। ভিয়েতনাম এই পথে এগিয়েছে, রপ্তানি হাব তৈরি করেছে। আমরা এখনো আলোচনার স্তরে।

তবে পুরো চিত্রটা নেতিবাচকও নয়। ই-কমার্সের ব্যবহারকারীর প্রায় ৭৫ শতাংশ ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী, মানে এই বাজারের চালিকাশক্তি তরুণ প্রজন্ম। গ্রামাঞ্চল থেকে কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ বাড়ছে। নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা  বেড়েছে। এই গল্পগুলো সংবাদমাধ্যমে কম আসে, কিন্তু এগুলোই আসলে এই খাতের প্রাণ।

সামনে এগোতে হলে অন্তত পাঁচটা কাজ এখনই দরকার। ইন্টারনেটকে পাবলিক ইউটিলিটি ঘোষণা করা, যেন সংযোগ কখনো বাধাগ্রস্ত না হয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ নিবন্ধন ও জামানতমুক্ত ঋণ। ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যের জন্য আলাদা ফ্যাসিলিটেশন সেল। ডিজিটাল কমার্স আইন সংশোধন করে মাঠে প্রয়োগযোগ্য করা। এবং পোস্ট অফিস নেটওয়ার্ককে ই-কমার্স ডেলিভারির কাজে লাগানো।

এর বাইরেও একটা বিষয় ভাবতে হবে। এআই-চালিত লজিস্টিকস, স্মার্ট ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট আর ভয়েস কমার্স বৈশ্বিক ই-কমার্সে দ্রুত আসছে। বর্তমান সমস্যার পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্যও প্রস্তুতি দরকার।

শেষ পর্যন্ত এটা বিশ্বাসের বাজার। গ্রাহক ভরসা করলে কেনে, না করলে কেনে না। সেই ভরসা তৈরি করতে পারলে ই-কমার্স আগামী এক দশকে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হতে পারে। যখন সাধারণ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটায় ভালো অভিজ্ঞতা পাবে, তখনই বোঝা যাবে খাতটি সত্যিকারের উন্নতি করেছে।

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: shammo4n@gmail.com