Published : 10 Sep 2025, 04:31 PM
ছোটবেলা থেকে অনেকেই হয়ত শুনেছেন- কখনও রাগ করে ঘুমাতে যেতে হয় না। মনে করা হয়, রাতে অমীমাংসিত ঝগড়া থেকে দূরত্ব বাড়ে, সম্পর্ক নষ্ট হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দুইজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, সবসময় এ ধারণা কার্যকর নয়। বরং কিছু ক্ষেত্রে রাগ নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া সম্পর্কের জন্য ইতিবাচকও হতে পারে।
ড. সামান্থা রডম্যান হুইটেন সিএনএন ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, "অনেক দম্পতি মনে করেন, রাতের ঝগড়া না মিটিয়ে ঘুমানো মানেই সম্পর্ক ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। এর পেছনে রয়েছে শৈশবের অভিজ্ঞতা কিংবা পরিবারে নিরবচ্ছিন্ন কলহ দেখার প্রভাব।"
অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক সিটির ডা. সাবরিনা রোমানফ বলেছেন, “রাতে ঘুমানোর আগে সমস্যা মিটিয়ে ফেলার সামাজিক প্রথা আসলে সম্পর্ক রক্ষার বার্তা বহন করে। তবে এর কঠোরতা কখনও কখনও সম্পর্কের ক্ষতিও করতে পারে।”
যে কারণে রাতে সমাধান খোঁজা বিপরীত ফল দেয়
রাত জেগে ঝগড়া মেটানোর চেষ্টা করলে প্রায়ই ফল উল্টো হয়। ঘুমের অভাব মানুষকে আবেগপ্রবণ, উত্তেজিত ও অসংলগ্ন করে তোলে।
ডা. রোমানফ বলেন, “যখন ক্লান্ত থাকেন, তখন সমস্যা সমাধান, মনোযোগ ও যুক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে এমন কিছু বলে ফেলতে পারেন, যা পরে অনুশোচনা তৈরি করবে।”
অন্যদিকে পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্ককে নতুনভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। ঘুম আবেগ প্রক্রিয়াকরণে সহায়তা করে এবং নেতিবাচক উদ্দীপনার প্রতি প্রতিক্রিয়াশীলতা কমায়।
অর্থাৎ, সকালে ঘুম থেকে উঠে একই সমস্যাকে অনেক বেশি ঠাণ্ডা মাথায় সমাধান করা সম্ভব হয়।
কখন বিরতি নেওয়া জরুরি
ডা. হুইটেন মনে করেন, "অনেক সময় দম্পতিরা ভাবেন, যদি রাতেই সমস্যা মেটানো না হয়, তবে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। তবে বাস্তবে এটি সবসময় সত্য নয়। "
বরং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাত গভীর হলে বা ক্লান্ত থাকলে আলোচনা থামিয়ে ঘুমাতে যাওয়াই উত্তম।
ডা. রোমানফের মতে, “অত্যন্ত জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া প্রায় সব ধরনের ঝগড়াই পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে।”
অনেক সময় সকালে উঠে দেখবেন, আগের রাতের তর্ক ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর যদি থেকেও যায়, তখন তা নিয়ে আলোচনার মানসিকতা হবে অনেক বেশি শান্ত, যা সম্পর্কের জন্য ভালো।
রাগ নিয়ে ঘুমাতে গেলে করণীয়
ধরুন আপনি ঘুমাতে চাইছেন কিন্তু মাথার মধ্যে বারবার সেই ঝগড়ার কথা ঘুরছে। একে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘অ্যাটাচমেন্ট প্যানিক’।
যেখানে মানুষ মনে করে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটি হয়ত আর তাকে ভালোবাসছে না বা পাশে নেই।
ডা. হুইটেন বলছেন, "এই অনুভূতি খুব স্বাভাবিক। তবে এ ধরনের আতঙ্ক নিয়ে কথা বলতে গেলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।"
তাহলে সমাধান কী?
সঙ্গীর সঙ্গে ঠিক করে রাখুন, সকালে বা পরের দিন শান্ত অবস্থায় বিষয়টি আলোচনা করবেন। এতে অস্থিরতা অনেকটাই কমে যাবে।
শোয়ার আগে অভ্যাসগত কিছু ভালোবাসার আচরণ বজায় রাখতে হবে। যেমন- 'আমি তোমাকে ভালোবাসি' বলা, শুভরাত্রি আলিঙ্গন ইত্যাদি।
ডা. রোমানফের মতে, “এসব ছোট্ট ইঙ্গিত সম্পর্কের ভিত্তিকে মনে করিয়ে দেয় এবং ঝগড়ার পরও নিরাপত্তা জোগায়।”
রাগ দমন করতে নিজের যত্ন নিতে হবে। ধ্যান, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, ডায়েরি লেখা, ঠাণ্ডা পানিতে হাত ডুবিয়ে রাখা কিংবা একটি দ্রুত গোসলও কাজ করতে পারে।
সম্পর্ক রক্ষায় আত্মনিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব
ডা. হুইটেন পরামর্শ দেন, নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, “আমার ভবিষ্যৎ আমি কীভাবে চাইব আজকের পরিস্থিতি সামলাতে? - এই প্রশ্ন আপনাকে আত্মনিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। বিশেষ করে যাদের ‘অ্যাংশাস অ্যাটাচমেন্ট’ আছে, তাদের জন্য থেরাপির মাধ্যমে এ দক্ষতা শেখা জরুরি।”
অন্যদিকে ডা. রোমানফ বলেন, “ঝগড়া হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেটি কীভাবে সামলাচ্ছেন, সেটাই সম্পর্কের মান নির্ধারণ করে।”
তিনি মনে করিয়ে দেন— সম্পর্কে কখনই স্থির থেকে যাওয়া নয়, বরং নতুন দক্ষতা শেখা, মানিয়ে নেওয়া ও একসঙ্গে বেড়ে ওঠা জরুরি।
এমনকি রাগের মধ্যেও ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলার মানসিকতা সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে।
আরও পড়ুন