কাঠবাদামের বাদামি গুঁড়া নাকি ময়দা- কোনটি স্বাস্থ্যকর?
যাদের গ্লুটেন সহ্য হয় না তাদের জন্য বিকল্প হতে পারে কাঠবাদামের ময়দা।
খাবার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এখন অনেকেই বেশ স্বাস্থ্য সচেতন। যে কারণে রান্নায় নিয়মিত নতুন সব উপকরণ যোগ করেন কেউ কেউ। বিশেষ করে যারা গ্লুটেন-মুক্ত খাদ্যাতালিকা অনুসরণ করেন।
গ্লুটেন হল এক ধরনের প্রোটিন- যা মূলত গম, বার্লি (যব) ও রাই (এক প্রকার সিরিয়াল শস্য)-এ পাওয়া যায়। যাদের গ্লুটেন সহ্য হয় না বা ‘সিলিয়াক’ রোগ রয়েছে, তাদের জন্য এই ডায়েট অত্যন্ত জরুরি।
অনেকে ওজন নিয়ন্ত্রণ, হজম সমস্যা কমানো বা খাদ্যে অ্যালার্জির কারণে গ্লুটেন-বিহীন ডায়েট অনুসরণ করে থাকেন।
আর এই তালিকায় জনপ্রিয় দুটি উপাদান হল আমন্ড বা কাঠবাদামের খোসাসহ বাদামি গুঁড়া ও আমন্ড ফ্লাওয়ার বা কাঠবাদামের ময়দা। দুটি-ই বাদাম থেকে তৈরি হলেও গঠন, রং ও ব্যবহারে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য।
আমন্ড মিল বা কাঠবাদামের খোসাসহ বাদামি গুঁড়া কী?
মার্কিন রন্ধনশিল্পী, রেসিপি নিরীক্ষক ও লেখক ফিবি ফ্রাই এই বিষয়ে রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “কাঠবাদামের গুঁড়া তৈরি হয় সম্পূর্ণ বাদাম (চামড়া সহ) থেকে। বাদামগুলো গুঁড়া করে একটি রুক্ষ ধরনের ময়দা তৈরি করা হয়। এতে বাদামের বাদামি আবরণ থাকায় রং খানিকটা ছোপ ছোপ দেখা যায়। আর গঠন হয় কিছুটা দানাদার।”
সাধারণত যেসব রেসিপিতে সামান্য রুক্ষতা ও প্রাকৃতিক টেক্সচার দরকার, সেসব ক্ষেত্রে ‘আমন্ড মিল’ ভালো ফল দেয়।
আমন্ড ফ্লাওয়ার বা কাঠবাদামের ময়দা কী?
“তৈরি হয় ‘ব্ল্যাঞ্চড’ করা বাদাম থেকে— মানে বাদামের খোসা ফেলে দেওয়া হয় আগে, এরপর মিহি গুঁড়া করা হয়। ফলে এক ধরনের হালকা রংয়ের, মসৃণ এবং একজাতীয় গঠনের ময়দা তৈরি হয়”- ব্যাখ্যা করেন ফিবি।
কেক, বিস্কুট, ম্যাকারুন বা যে কোনো হালকা বেইকড খাবার তৈরিতে এই ময়দা আদর্শ। কারণ এটি স্পঞ্জি (নরম ও ফোলাভাবযুক্ত) ও কোমল গঠন দিতে সহায়তা করে।
পার্থক্য কোথায়?
প্রধান পার্থক্য হল প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াজাতকরণে। ‘আমন্ড মিল’ বানাতে বাদামের খোসা ছাড়ানো হয় না, তাই এটি তুলনামূলক রুক্ষ্ম এবং বেশি আঁশ সমৃদ্ধ।
অন্যদিকে, ‘আমন্ড ফ্লাওয়ার’ বা কাঠবাদামের ময়দায় খোসা থাকে না। ফলে এটি দেখতে পরিষ্কার এবং ব্যবহারেও মসৃণ।
পুষ্টিগুণের দিক থেকে দুটোই প্রায় সমান।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘হাভার্ড টি.এইচ.চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেল্থ’য়ের এর পুষ্টি গবেষক ডা. মেলিসা হিউজ অন্য একটি প্রতিবেদনে বলেন, “বাদামে থাকা স্বাস্থ্যকর মনোআনস্যাচুরেইটেড ফ্যাট, প্রোটিন ও আঁশ— দুই ধরনের পণ্যেই পাওয়া যায়। তবে ‘আমন্ড মিল’-এ আঁশ মাত্রা কিছুটা বেশি থাকে।”
কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হয়
‘আমন্ড মিল’ ব্যবহারের ক্ষেত্র:
শক্ত ধরনের বিস্কুট, এনার্জি বার, ব্রাউনির বেইস
প্যানকেক বা ওয়াফলস-এ দানাদার গঠন আনতে
ক্রাম্বলড টপিং (ওপরের ঝুরঝুরে স্তর) যেমন- আপেল ক্রিস্প (মচমচে আপেল) বা বেরি ক্রিস্প (মচমচে বেরি)।
মাংস, মাছ, টোফু বা সবজি ভাজার সময় ব্রেডক্রাম্বের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
গ্লুটেন-মুক্ত রুটি, টরটিলা (মেক্সিকান পাতলা রুটি) বা ক্র্যাকার (পাতলা, খসখসে, লবণযুক্ত বিস্কুট-জাতীয় খাবার) বানাতে।
কাঠবাদামের ময়দা ব্যবহারের ক্ষেত্র:
কেক, ম্যাকারুন, কুকি ও নরম ধরনের গ্লুটেন-মুক্ত ও মসৃণ বেইকড মিষ্টান্ন বা ডেজার্ট।
টার্ট (মিষ্টি পাই বা মিষ্টি খোলসযুক্ত টার্ট)
ক্রাস্ট বা নিচের বা বাইরের পিঠের শক্ত ময়দার খোলস বানাতে
ডুবো তেলে না ভেজে প্যান ফ্রাই খাবারে হালকা কোটিং দিতে ব্যবহার করা হয়।
একটিকে অন্যটির জায়গায় ব্যবহার করা যাবে?
এভাবেও ব্যবহার করা যাবে তবে সতর্ক থাকতে হবে। ‘আমন্ড মিল’ ব্যবহার করে কাঠবাদামের ময়দার কাজ তখনই করা যাবে যখন ‘টেক্সচারে’ কোনো বাধা নেই।
তবে স্পঞ্জি কেক বা মসৃণ ম্যাকারুন বানাতে চাইলে আমন্ড ময়দাই বেছে নেওয়া উত্তম।
অস্ট্রেলিয়ান বেইকিং একাডেমির নির্বাহী শেফ রেবেকা থমসন বলেন, “কিছু রেসিপিতে একটি আরেকটির বিকল্প হতে পারে, তবে ফলাফলে সামান্য পার্থক্য আসতে পারে। যা স্বাদ নয়, গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।”
বাংলাদেশে গ্লুটেন-মুক্ত খাদ্যাভ্যাস দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। বিভিন্ন সুপারশপে আমদানি করা ময়দা পাওয়া যায়। ডায়াবেটিস বা গ্লুটেনে সমস্যা আছে এমন রোগীদের জন্য বাদাম-ভিত্তিক ময়দা হতে পারে একটি চমৎকার বিকল্প।
স্বাস্থ্য উপকারিতা
আমন্ড ময়দা বা ‘মিল’- দুটোই গ্লুটেন মুক্ত। এতে কার্বোহাইড্রেইট কম, ভিটামিন ই এবং ম্যাগনেসিয়ামের ভালো উৎস। রক্তে চিনি কমাতে ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহায়ক।
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি-এর পুষ্টি বিজ্ঞানী লরা কেনেডি বলেন, “বাদামভিত্তিক ময়দায় থাকা চর্বি এবং আঁশ দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।”
আরও পড়ুন
