Published : 22 Jul 2026, 06:09 PM
নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন বা কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা উচিত এআই চ্যাটবটের এমন পরামর্শ বিশ্বাস করলে বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিই বেশি।
পর্যাপ্ত ডেটার অভাব ও ভুল বিশ্লেষণের কারণে জনপ্রিয় বিভিন্ন চ্যাটবট প্রায়ই ভোটারদের ভুল, অসঙ্গতিপূর্ণ ও পক্ষপাতমূলক রাজনৈতিক পরামর্শ দিচ্ছে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবেষণা বলছে, এসব সিস্টেম প্রায়ই ভুল দলকে সমর্থনের পরামর্শ দিচ্ছে, সঠিক দলের নাম এড়িয়ে যাচ্ছে বা নির্বাচনে অংশই নিচ্ছে না এমন দলকে তালিকায় রাখছে।
এ বছর অনুষ্ঠিত হাঙ্গেরির সংসদ নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে এ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে নাগরিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘লিবার্টিজ’।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান-এর সঙ্গে শেয়ার করা এ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে সাধারণ বিভিন্ন এআই সিস্টেমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এ ফলাফল গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
“এআই চ্যাটবটগুলো ভোটারদের পছন্দকে ভুলভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়েছে ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না এমন দলকেও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।”
একই প্রশ্নের জবাবে চ্যাটবটগুলো থেকে একেকবার একেক ধরনের ‘পুরোপুরি ভিন্ন ও অসঙ্গতিপূর্ণ’ উত্তর মিলেছে।
হাঙ্গেরির এবারের নির্বাচনে পেতের মাগিয়ারের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল ‘তিসা’ জয় পেয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান ও তার দল ‘ফিদেস’-এর টানা ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। তবে নির্বাচন চলাকালীন চ্যাটবটগুলোর তথ্য সরবরাহে চরম পক্ষপাতিত্বের বিষয়টিই গবেষণার অন্যতম দিক হিসেবে সামনে এসেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি’কে যখন একজন তিসা-সমর্থক ভোটারের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পছন্দ ও তথ্যাদি দেওয়া হয়েছিল তখন ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই চ্যাটবটটি জয়ী দল ‘তিসা’কে সুপারিশ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রথাগত নির্বাচনী গাইড বা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণের মতো সাধারণ এআই সিস্টেমগুলো এদের রাজনৈতিক পরামর্শ তৈরির প্রক্রিয়া প্রকাশ করে না।
পাশাপাশি এআইয়ের থেকে বারবার একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায় না এবং নির্বাচনী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এগুলো জনসাধারণের কোনো আইনি তদারকির আওতাতেও পড়ে না।
ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেও এআই চ্যাটবটগুলোর উত্তর এতটাই আত্মবিশ্বাসী ও তথ্যভিত্তিক ধাঁচে উপস্থাপন করা হয় যে, ব্যবহারকারীরা খুব সহজেই তা বিশ্বাস করে বসেন।
হাঙ্গেরির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৯.৮ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন কাজের জন্য এআই ব্যবহার করেন। ফলে দেশটির সাম্প্রতিক নির্বাচনে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি এআই চ্যাটবট ‘চ্যাটজিপিটি’ ও ‘জেমিনাই’-এর নির্বাচনী পরামর্শের নির্ভুলতা পরীক্ষা করে দেখেন গবেষকরা।
পরীক্ষাটি চালাতে হাঙ্গেরির পরিচিত এক নির্বাচনী গাইড অ্যাপ ‘ভক্সমনিটর’-এ উল্লেখিত রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি ও এজেন্ডাকে ভিত্তি হিসেবে নিয়েছেন গবেষকরা।
‘লিবার্টিজ’-এর গবেষকরা দেশটির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিবন্ধিত পাঁচটি রাজনৈতিক দলের আদর্শের সঙ্গে মিলিয়ে পাঁচটি ভিন্ন ‘কাল্পনিক ভোটার প্রোফাইল’ তৈরি করেছেন।
এরপর প্রতিটি ভোটার প্রোফাইল থেকে চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাইতে ১০ বার করে দুই ধরনের সুনির্দিষ্ট অনুরোধ পাঠানো হয়। প্রথমত, এ কাল্পনিক ভোটারের কোন দলকে ভোট দেওয়া উচিত তার প্রত্যক্ষ পরামর্শ চাওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, পাঁচটি রাজনৈতিক দলের নীতি ও মতাদর্শের সঙ্গে এ ভোটারের চিন্তাভাবনার সামঞ্জস্যতার শতকরা হার জানতে চাওয়া হয়।
শতকরা হারের পরীক্ষায় চ্যাটজিপিটি একশটি চেষ্টার মধ্যে কেবল ২ শতাংশ ক্ষেত্রে জয়ী দল ‘তিসা’র নাম সঠিক সামঞ্জস্যতার তালিকায় তুলে আনতে পেরেছে।
এর পরিবর্তে, যে ব্যবহারকারীর মতামত পুরোপুরি তিসা দলের সঙ্গে মিলছিল তাকে বারবার এমন কোনো ছোট দলকে সমর্থনের পরামর্শ দিয়েছে, যাদের সংসদে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৫ শতাংশ ভোট পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না এমন দলগুলোকেও তালিকার শীর্ষে রেখেছে এআই।
ঠিক তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে দেশটির তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল ‘ফিদেস’-এর বেলায়। ফিদেস-সমর্থক কাল্পনিক ভোটার প্রোফাইলের ক্ষেত্রে এসব চ্যাটবট নিখুঁতভাবে সাড়া দিয়েছে।
সরাসরি পরামর্শ চাওয়ার ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটি প্রায় ৫০ শতাংশ বার সুনির্দিষ্টভাবে ‘ফিদেস’কেই একমাত্র পছন্দের দল হিসেবে সুপারিশ করেছে, আর বাকি ক্ষেত্রে দলটিকে মূল পছন্দ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
এআই চ্যাটবটের এমন পক্ষপাতিত্ব নির্বাচনের সার্বিক ফলাফলে কোনো বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি বলে দাবি করেন গবেষকরা। কারণ সব বাধা পেরিয়েই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় লাভ করেছে বিরোধী দল তিসা।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, “তবে, যেসব নির্বাচনে তীব্র হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় বা যেখানে ভোটাররা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে দোলাচলে থাকেন, সেখানে এআই চ্যাটবটের এ ধরনের ভুল ও পক্ষপাতমূলক উত্তর সরাসরি নির্বাচনের ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।”
গবেষণায় উঠে আসা অন্যান্য সমস্যার মধ্যে অন্যতম ছিল তথ্যের অসঙ্গতি। একই কাল্পনিক ভোটার প্রোফাইল থেকে পর পর একাধিকবার প্রশ্ন করার পরও একেকবার একদম বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দলের জন্য সুপারিশ এসেছে।
আরও শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাইয়ের দেওয়া মোট উত্তরের ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই এমন সব রাজনৈতিক দলের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা ২০২৬ সালের এ নির্বাচনে আদৌ কোনো প্রার্থী বা ব্যালটে অংশই নেয়নি।
গবেষকদের নজরে এআইয়ের বিভ্রান্তিকর বিষয়টিও এসেছে। চ্যাটবট দুটি অনুসন্ধানের শুরুতেই বিনম্রভাবে সতর্কবার্তা ঝুলিয়ে বলেছে, তারা ‘কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরামর্শ দিতে পারে না’। তবে এ ভদ্রোচিত ডিসক্লেইমারের পরপরই একাধিক অনুচ্ছেদে জটিল, বিশ্লেষণাত্মক ও প্ররোচনামূলক রাজনৈতিক সুপারিশ উপস্থাপন করতে দেখা যায় এদের।
গবেষকরা বলেছেন, “এসব উত্তর দেখতে যুক্তিযুক্ত, সুনির্দিষ্ট ও তথ্যবহুল মনে হয়েছিল। ফলে মূল অ্যালগরিদমিক পদ্ধতিটি অস্পষ্ট ও ফলাফল অস্থিতিশীল হওয়ার পরও সাধারণ ব্যবহারকারীরা এসব উত্তরকে শতভাগ নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নেওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।”
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথ্যের এ ধরনের গুরুতর ভুলের নেপথ্যে মূল কারণ সম্ভবত এআই মডেলের ট্রেইনিং ডেটার ঘাটতি, কনটেন্ট ফিল্টার ও ভাষা প্রক্রিয়াকরণের সীমাবদ্ধতা।
২০২৪ সালের পর হাঙ্গেরির রাজনীতিতে বিরোধী দল ‘তিসা’র হঠাৎ উত্থান ঘটে। ফলে এআইয়ের পুরানো বা স্থির ‘ট্রেনিং ডেটা’র মানচিত্রে দলটিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হিমশিম খেয়েছে চ্যাটবটগুলো।
এ গবেষণা আন্তর্জাতিক আইন ও নজরদারির ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের আইনি ফাঁক বা নিয়ন্ত্রণহীনতার চিত্রও ফুটিয়ে তুলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত ‘এআই অ্যাক্ট’ অনুসারে সাধারণ এআই মডেল সরবরাহকারীদের জন্য তাদের সিস্টেমের সার্বিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক।
অন্যদিকে ইইউ’র ‘ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট’-এও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এআইয়ের ‘সিস্টেমিক ঝুঁকি’ ঠেকাতেও তাগিদ রয়েছে। তবে আশঙ্কাজনকভাবে নির্বাচনী পরামর্শ দেওয়া এসব এআই চ্যাটবট এ দুই আইনের কোনোটিরই আওতাধীন নয়, বরং এরা আইন দুটির মধ্যবর্তী অধরা ফাঁকফোকরে রয়ে গেছে।
আইনগত সংস্কারের দাবি জানিয়ে ‘লিবার্টিজ’ বলেছে, রাজনৈতিক পরামর্শ দেওয়া এসব এআই সিস্টেমের জন্য অবিলম্বে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত।
একইসঙ্গে স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা, ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারা পর্যন্ত এআই কোম্পানিগুলোর উচিত ভোটারদের এভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরামর্শ দেওয়া থেকে দূরে থাকা।