Published : 01 Sep 2022, 05:41 PM
অন্ত্র অর্থাৎ নাড়িভুঁড়ি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মধ্যে অন্যতম। কারণ, মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় ক্ষমতা থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সবই প্রভাবিত হয় অন্ত্রের অবস্থা থেকে।
শক্তিশালী এই অঙ্গ আবার প্রচণ্ড সংবেদনশীল। অগনিত ছত্রাক, ব্যাক্টেরিয়া, মাইক্রোবস নিয়ে অন্ত্রের ‘মাইক্রোবায়োম’ তৈরি হয় যা হজমক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। আর সেই ভারসাম্যই হল সংবেদনশীল যা সামান্য বিশৃঙ্খলাতেই বিভিন্ন সমস্যা ডেকে আনতে পারে।
যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন’য়ের ‘গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি’ বিভাগের ‘ক্লিনিকাল অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর’ ডা. ক্রিস দামান বলেন, “অন্ত্রের ‘মাইক্রোবায়োম’ হল ‘ডিপ্লোম্যাট’, শিক্ষক আর শ্রমিক এই সবগুলোর সমষ্টি।
‘ইটদিস নটদ্যাট ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি ব্যাখ্যা করেন, “ডিপ্লোম্যাট’য়ের কাজ হল শরীরের প্রবেশ করা ‘প্যাথোজেন’গুলোকে শায়েস্তা করা যাতে আমাদের শরীর অসুস্থ না হয়। শিক্ষকদের কাজ হল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যাতে কোনো ‘অটোইমিউন ডিজিজ’ দেখা না দেয় বা ‘অ্যালার্জি’র মাত্রা যেন লাগাম ছাড়া হতে না পারে। আর শ্রমিকদের কাজ হল অন্ত্র পর্যন্ত চলে আসা হজম না হওয়া খাবার যেমন- ভোজ্য আঁশকে ভেঙে বি ভিটামিন্স, অ্যামিনো অ্যাসিড ইত্যাদিকে পরিণত করা।”
অন্ত্র ভালো রাখার পদ্ধতি
ডা. দামান বলেন, “দৈনন্দিন জীবনযাত্রার চার ‘এম’ আর চার ‘এফ’ এই পদ্ধতি হল সুস্থ অন্ত্রের মুলমন্ত্র। এই চার ‘এম’ হলো ‘মলিকিউলস’ (খাবার বনাম অখাদ্য), ‘মুভমেন্ট’ (শরীরচর্চা বনাম আলসেমি), ‘মাইন্ড’ (ঘুম বনাম অনিদ্রা) আর ‘মাইক্রোবস’ (প্রাকৃতিক মাইক্রোবায়োম বনাম প্যাথোজেন)।”
এই সবগুলোর পর্যায়ে ভারসাম্য রাখতে হবে সুস্থ অন্ত্র ও তাতে স্বাস্থ্যকর ‘মাইক্রোবায়োম’ বজায় রাখতে।
অন্ত্রে স্বাস্থ্যকর ‘মাইক্রোবায়োম’ গড়ে তোলার জন্য আপনার দরকার চার ‘এফ’ হল- ‘ফাইবার’, ‘ফেনোলস’, ‘ফারমেন্টস’ ও ‘ফ্যাট’।
‘ফাইবার’ বা ভোজ্য আঁশ পাওয়া যাবে পরিপূর্ণ শষ্যজাতীয় খাবার, সীম, বাদাম, ফল ও সবজি থেকে।
‘ফেনলস’ হল ‘ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস’ যা বিভিন্ন রঙিন ফল ও সবজি থেকে মেলে। তাই এই উপাদান পাওয়া জন্য বিভিন্ন রংয়ের ফল ও সবজি খেতে হবে।
‘ফারমেন্টস’ মিলবে গাঁজানো পদ্ধতিতে তৈরি করা খাবার থেকে যেমন- টকদই। ‘ফ্যাট’ হল স্বাস্থ্যকর চর্বি যেমন- ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস। যা বাদাম, বীজ, অ্যাভোকাডো ইত্যাদিতে মেলে।
অন্ত্র ভালো নেই তা বোঝার উপায়
মানসিক অবস্থার ওপর অস্বাস্থ্যকর অন্ত্রের প্রভাব: ডা. দামান বলেন, “অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় থাকলে অন্ত্রের আবরণ, মস্তিষ্ক আর রক্তের মধ্যকার আবরণে ছেদ তৈরি করে। ফলে শরীর ও স্নায়ু দুটোই প্রদাহের শিকার হয়। স্নায়ুর প্রদাহ মানসিক অস্বস্তি তৈরি করবে, ঘুম হবে না, দিনভর থাকবে ক্লান্তি।”
অন্ত্র আর মস্তিষ্ক সংযুক্ত হয় ‘ভেগাস নার্ভ’য়ের মাধ্যমে। মস্তিষ্কের চাইতেও অন্ত্রে স্নায়ু বেশি। যে কারণে একে ‘দ্য সেকেন্ড ব্রেইন’ও বলা হয়। তাই অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়।
মল কেমন?: ডা. দামান বলেন, “অন্ত্রের অবস্থা বোঝার সবচাইতে কার্যকর উপায় হল মল পরীক্ষা। মল প্রচণ্ড শুষ্ক হওয়ায় বের হতে না চাওয়া যেমন বিপদের তেমনি পাতলা হওয়াও বিপজ্জনক।”
খাদ্যাভ্যাসে ভিন্নতা থাকলে অন্ত্রের ‘মাইক্রোবায়োম’ ভালো থাকবে এবং এই সমস্যাগুলো দেখা দেবে না।
তবে মানুষভেদে আদর্শ খাদ্যাভ্যাসও ভিন্ন। তাই সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের জন্য আদর্শ ভিন্নতাপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস তৈরি করতে হবে।
খাবার ইচ্ছা: ডা. দামান বলেন, “অন্ত্রের ‘মাইক্রোবায়োম’য়ের কাছে মানুষ অনেকটাই পুতুল। আমাদের ক্ষুধা, কোনো বিশেষ খাবার খাওয়া ইচ্ছা বা ‘ক্রেইভিং’ সবকিছুর পেছনে কলকাঠি নাড়ে অন্ত্র। ভোজ্য আঁশ আর ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ ক্ষুধা ও ‘ক্রেইভিং’ নিয়ন্ত্রণে বিশেষভাবে কার্যকর।
ত্বকে র্যাশ ও অ্যালার্জি: অন্ত্র রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আবার ত্বক ও অন্ত্রের মধ্যকার বিভাজন বজায় রাখার কাজটাও করে অন্ত্রের ‘মাইক্রোবায়োম’ থেকে তৈরি হওয়া ‘মলিকিউল’।
শিশুকালে যাদের অন্ত্রে এই ‘মলিকিউল’ বেশি থাকে তাদের হাঁপানি, অ্যালার্জি হয় কম। অ্যালার্জি, ত্বকে র্যাশ ওঠা থেকে সুরক্ষা দেয় ওই মলিকিউলগুলো।
মন খারাপ: ডা. দামান বলেন, “অন্ত্র আসলেই মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক। অন্ত্র আর মস্তিষ্কের মধ্যকার যোগাযোগ আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে অনেকাংশে। অন্ত্র ভালো তো মন ভালো। খাদ্যাভ্যাসে ভোজ্য আঁশ আর ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ সুষম পরিমাণে থাকলে অন্ত্র ও মন মানসিকতা দুটোই ভালো থাকবে।”