Published : 18 Feb 2026, 05:23 PM
সংযম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের মাসে দীর্ঘক্ষণ উপবাসের পর ইফতারের মুহূর্তে যে আনন্দ ও উৎসাহ জাগে, তা অনেকের জন্যই অতিরিক্ত খাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ফলে রমজান শেষে অনেকেই ওজন বৃদ্ধি, বদহজম, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বা ক্লান্তির অভিযোগ করেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়নের মতে- অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও মিষ্টিযুক্ত খাবার গ্রহণই এসব সমস্যার প্রধান কারণ।
তবে সঠিক খাদ্য নির্বাচন, পরিমিতি ও খাওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করলে রমজানেও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং হজমশক্তি সুস্থ রাখা সম্ভব।
দীর্ঘ উপবাসের পর যে কারণে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে
সারাদিন রোজা রাখার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায় এবং ক্ষুধার হরমোন ‘ঘ্রেলিন’য়ের নিঃসরণ বেড়ে যায়।
শরীর দ্রুত শক্তি ও পুষ্টির সন্ধান করে। এ সময় উচ্চ-চিনি ও উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া দীর্ঘ উপবাসের পর খাবার গ্রহণ করলে পাকস্থলী থেকে মস্তিষ্কে ‘পূর্ণতা’র সংকেত পৌঁছাতে সময় লাগে— প্রায় ২০ মিনিট। ফলে মস্তিষ্ক তৃপ্তির অনুভূতি পাওয়ার আগেই অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ হয়ে যায়।
পারিবারিক আড্ডা, ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে মিলে এ প্রবণতা আরও তীব্র হয়।
ইফতার শুরু করুন ধীরে ও সঠিকভাবে
ইফতারের প্রথম ধাপই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ ভারী খাবার গ্রহণ না করে খেজুর (দুতিনটি) ও পানি দিয়ে শুরু করতে হবে। খেজুর প্রাকৃতিক শর্করা ও পটাসিয়ামের উৎস, যা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত স্থিতিশীল করে।
এরপর ১০ থেকে ১৫ মিনিট বিরতি নিন। তারপর হালকা স্যুপ, সবজির সালাদ বা ফলমূল গ্রহণ করুন।
এ পদ্ধতিতে পাকস্থলী ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়, বদহজমের ঝুঁকি কমে এবং অতিরিক্ত খাওয়া এড়ানো যায়।
প্রধান খাবারের আগে অল্প বিরতি রক্তে শর্করার ওঠানামা কমায়। খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খান—এতে তৃপ্তির অনুভূতি বাড়ে এবং ক্যালরি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
সুষম প্লেট গঠন: ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি
রমজানে খাবারের গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঁশ ও প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি দেয় এবং রক্তে শর্করার স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।
প্লেটের অর্ধেক অংশ শাকসবজি (যেমন- শসা, টমেটো, লেটুস, গাজর), এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন (মাছ, চর্বিহীন মাংস, ডিম, ছোলা, ডাল, দই) এবং বাকি অংশ নিয়ন্ত্রিত গোটা শস্য (বাদামি চাল, ওটস, রুটি) দিয়ে ভর্তি করুন।
এ ধরনের প্লেট অযথা ক্যালরি বাড়ায় না, বরং পুষ্টি সরবরাহ করে। ছোট প্লেট ব্যবহার করুন এবং আগে থেকে অংশ নির্ধারণ করে নিন— এতে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমবে।
মনোযোগী খাওয়া: অতিরিক্ত গ্রহণ রোধের কার্যকর উপায়
অতিরিক্ত খাওয়া শুধু শারীরিক ক্ষুধার ফল নয়, অনেক সময় অভ্যাস, সামাজিক প্রভাব বা মানসিক আরামের কারণে ঘটে।
মনোযোগ সহকারে খাওয়া এ সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।
খাওয়ার সময় টেলিভিশন, মোবাইল বা অন্যান্য স্ক্রিন এড়িয়ে চলতে হবে। প্রতিটি লোকমা ধীরে চিবিয়ে খান এবং পেটের অনুভূতির দিকে খেয়াল রাখুন। পেট অর্ধেক ভরলে থামুন— এতে হজম প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
মিষ্টি ও ভাজা খাবার: ঐতিহ্য বজায় রেখে ভারসাম্য রাখুন
রমজানের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মিষ্টি ও ভাজা খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ইফতার শুরু করুন সুষম খাবার দিয়ে, যাতে অতিরিক্ত ক্ষুধা কমে।
ভাজা পরিবর্তে বেইকড বা গ্রিলড খাবার বিকল্প হিসেবে বেছে নিন।
প্রধান খাবারের পর অল্প পরিমাণ মিষ্টি খান— ভারী সিরাপজাত মিষ্টির বদলে তাজা ফল, দইয়ের সঙ্গে মধু বা ঘরোয়া কম চিনিযুক্ত ডেজার্ট উত্তম। এতে ঐতিহ্য রক্ষা হবে এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি কমবে।
সেহরি বাদ দেবেন না: সারাদিনের শক্তির ভিত্তি
সেহরি বাদ দিলে সারাদিনের ক্ষুধা তীব্র হয় এবং ইফতারে অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। প্রোটিন, আঁশ ও পর্যাপ্ত পানিসমৃদ্ধ সেহরি শক্তি ধরে রাখে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল করে।
ওটস, ডিম, দই, ফল, বাদাম, সবজি ও গোটা শস্য দিয়ে সেহরি তৈরি করুন। রাতের খাবার হালকা রাখুন এবং সেহরির আগে পর্যাপ্ত পানি পান করুন— এতে দিনভর ‘ডিহাইড্রেইশন’ এড়ানো যায়।
সংযমই সুস্থতার চাবিকাঠি
রমজানের টেবিল ভরে ওঠা স্বাভাবিক, কিন্তু প্লেট ভরানোর প্রয়োজন নেই। ধীরে শুরু করা, সুষম খাবার নির্বাচন, মনোযোগী খাওয়া এবং সেহরি গ্রহণের অভ্যাস রমজানকে সুস্থ ও ফিট রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এতে ওজন বৃদ্ধি এড়ানো যায়, বদহজম কমে এবং রোজার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ থাকে।
সচেতনতার সঙ্গে উপভোগ করুন। সংযম আনন্দ হারায় না, বরং তাকে আরও গভীর করে।
আরও পড়ুন
মানসিক অবস্থার কারণে অতিরিক্ত খাওয়া