Published : 09 Jul 2026, 04:23 PM
অনেকেরই এমন হয়- ছুটির দিনে বাড়িতে দিব্যি সুস্থ-সবল আছেন, তবে অফিসে পা রাখার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় অবিরাম হাঁচি, ত্বকে চুলকানি, তীব্র মাথাব্যথা কিংবা ক্লান্তিবোধ।
সহকর্মীরা হয়তো রসিকতা করে বলেন, ‘আপনার তো অফিসের প্রতিই অ্যালার্জি!’
তবে মজার ছলে উড়িয়ে দেওয়া বিষয়টি আসলে একটি স্বীকৃত মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক সমস্যা, যার নাম ‘সিক বিল্ডিং সিন্ড্রোম’
সিক বিল্ডিং সিন্ড্রোমের লক্ষণ
আমেরিকান পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ‘এনভাইরনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ)-র তথ্যানুসারে, সেল্ফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, কোনো একটি নির্দিষ্ট ভবনে দীর্ঘ সময় কাটানোর ফলে শরীরে যে তীব্র স্বাস্থ্যগত অস্বস্তি তৈরি হয়, তাকেই ‘সিক বিল্ডিং সিন্ড্রোম’ বলে।
এর লক্ষণগুলো হল:
বিষয় হল, আক্রান্ত ব্যক্তি ওই নির্দিষ্ট ভবন বা অফিস থেকে বের হয়ে খোলা বাতাসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই লক্ষণগুলো একদম মিলিয়ে যায়।
এই সমস্যা হওয়ার কারণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮০-র দশকেই প্রথম এই সমস্যার কথা উল্লেখ করে জানায়, ঘরের ভেতর বাতাসের মান, আলো, অতিরিক্ত আওয়াজ এবং রাসায়নিকের উপস্থিতি মানুষকে অসুস্থ করে তোলে।
আমেরিকার হ্যাকেনস্যাক মেরিডিয়ান স্কুল অব মেডিসিনের ‘অ্যালার্জি ও ইমিউনোলজি’ বিষয়ের অধ্যাপক ডা. লিওনার্ড বিলোরি সেল্ফ ডটকমের প্রতিবেদনে বলেন, “আসলে মানুষটি অসুস্থ নয়, অসুস্থ হল ওই নির্দিষ্ট বিল্ডিংটি।”
তার মতে, এর পেছনে কয়েকটি অদৃশ্য কারণ কাজ করতে পারে।
বাতাসে ভাসমান জীবাণু: ‘সেন্ট্রাল এসি’ বা কার্পেটে জমে থাকা মোল্ড বা ছত্রাক, ধুলোবালি এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া।
রাসায়নিকের প্রভাব: নতুন কার্পেট, আঠা, দেয়ালের রং বা প্লাইউডের আসবাবপত্র থেকে নির্গত হওয়া ‘ফর্মালডিহাইড’ বা উদ্বায়ী জৈব যৌগ।
পরিবেশ: অফিসের তীব্র ফ্লুরোসেন্ট বা স্ট্রিপ লাইটিং যা চোখে চাপ ফেলে, জানালাবিহীন বদ্ধ ঘর এবং ত্রুটিপূর্ণ ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা না থাকা।
পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশি ঝুঁকিতে
গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা এই সমস্যায় পুরুষদের চেয়ে বেশি আক্রান্ত হন।
২০২৫ সালে ‘বিল্ডিংস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত চীনের হ্যাংজু সিটি ইউনিভার্সিটি’র করা গবেষণা-সহ, বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই সমস্যার কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ উঠে এসেছে।
উচ্চ সংবেদনশীলতা: লন্ডনের নারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ক্যাথরিন ব্যাসফোর্ড জানান, নারীদের অ্যালার্জেন, ঘরের তাপমাত্রা এবং আলোর তীব্রতার প্রতি সংবেদনশীলতা পুরুষদের চেয়ে বেশি থাকে।
শারীরিক কারণ: নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ‘অটোইমিউন’ অবস্থার ভিন্নতার কারণে তারা বাতাসে থাকা রাসায়নিক ও ধুলোবালির প্রতি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়।
তাপমাত্রার পার্থক্য: পুরুষদের শরীর স্বাভাবিকভাবেই বেশি তাপ নির্গত করে। ফলে কেন্দ্রিয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের অতিরিক্ত ঠান্ডা পরিবেশ, নারীদের জন্য অস্বস্তিকর ও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

অফিসে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার ৫ উপায়
যদি মনে হয় অফিসের পরিবেশই অসুস্থ করছে, তবে বিশেষজ্ঞরা দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়ার পরামর্শ দেন।
বাতাস চলাচল উন্নত করা: ডা. ব্যাসফোর্ড এবং ডা. বিলোরির মতে, ভেন্টিলেইশন বা বাতাস চলাচল ঠিক করা জরুরি। সম্ভব হলে অফিসের জানালা বা দরজার কাছাকাছি বসার ব্যবস্থা করতে হবে বা ডেস্কে একটি ছোট এয়ার পিউরিফায়ার রাখা যেতে পারে।
হালকা আলোর আবেদন লাইটিংয়ের আবেদন: মনিটরের আলো এবং মাথার ওপরের তীব্র ফ্লুরোসেন্ট লাইট পরিবর্তনের জন্য অফিস ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অনুরোধ করার পরামর্শ দেন, ডা. ব্যাসফোর্ড। এটি চোখ ও মাথার ওপর চাপ কমাবে।
ডেস্ক নিয়মিত পরিষ্কার রাখা: নিজের ডেস্কে যেন ধুলা না জমে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মাঝেমধ্যেই অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ওয়াইপস দিয়ে ডেস্কটি মোছা উপকারী হবে।
কাজের মাঝে ছোট বিরতি: একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে প্রতি এক-দেড় ঘণ্টা পর পর একটু ডেস্ক থেকে উঠে হেঁটে আসতে হবে। খোলা বাতাস থেকে ৫ মিনিট শ্বাস নিলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো কাজ করে।
লক্ষণগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখা: যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অবস্থিত ‘কর্নেল ইউনিভার্সিটির হিউম্যান সেন্টার্ড ডিজাইন’ বিভাগের অধ্যাপক ইমেরিটাস অ্যালান হেজ পরমর্শ দেন যে, “কখন, বিল্ডিংয়ের কোন জায়গায় গেলে শরীর বেশি খারাপ লাগছে— সেটার একটি ডায়েরি বা রেকর্ড রাখা যেতে পারে। এটি সমস্যার মূল কারণ (যেমন: পেছনের কার্পেট বা এসি ভেন্ট) খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।
অফিস যদি কর্মক্ষমতা বাড়ানোর বদলে প্রতিদিন শরীর খারাপের কারণ হয়, তবে বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা মানব সম্পদ বিভাগের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত।
প্রয়োজনে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা অন্য কোনো জায়গায় বসার অনুমতি নেওয়া, নিজের শরীর ও পেশার জন্য কল্যাণকর হবে।
আরও পড়ুন
বৃষ্টিতে ভিজে ফেরা: ঝটপট ৫ কাজ না করলে ধরতে পারে সর্দি-জ্বরে!