Published : 09 Jun 2026, 06:42 PM
ফেইসবুকে কোনো পণ্যের পোস্ট দেখে আকৃষ্ট হলেন। পণ্যের মান, আকার সবকিছু পছন্দ হল। তারপর কমেন্ট বক্সে লিখলেন, ‘দাম কত?’। উত্তর এল: ‘প্লিজ ইনবক্স’।
অনলাইনে যারা কেনাকাটা করেন, তাদের কাছে এই অভিজ্ঞতা খুবই পরিচিত। অনেক নামকরা প্রতিষ্ঠানও দাম জানতে ইনবক্সে যেতে বলেন।
কেন প্রকাশ্যে দাম বলা হয় না? এই প্রশ্ন অনেকের মনে ঘুরপাক খায়।
‘সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম’ এবং আন্তর্জাতিক ই-কমার্স বিশেষজ্ঞদের গবেষণা অনুযায়ী- ফেইসবুক পেইজে দাম না লিখে, ইনবক্সে ডাকার প্রক্রিয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট ‘মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত বিপণন কৌশল’ বা ‘সেলস ট্যাক্টিক’ হিসেবে দেখা হয়।
ফেইসবুক অ্যালগরিদমকে প্রভাবিত করা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হুটসুইট’-এর অ্যালগরিদম বিশ্লেষণ-ভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ফেইসবুকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বা অ্যালগরিদম কোনো পোস্টের ‘র্যাংকিং’ বা ‘রিচ’ নির্ধারণ করে মূলত 'মিথস্ক্রিয়া' বা এনগেজমেন্টের ওপর ভিত্তি করে।
কৌশল: পোস্টে দাম না থাকলে আগ্রহী ক্রেতারা বাধ্য হয়ে কমেন্টে ‘দাম কত?’ লিখে প্রশ্ন করেন। প্রতিটি কমেন্ট এবং তার জবাবে বিক্রেতার দেওয়া ‘প্লিজ চেক ইনবক্স’ বার্তাটি ফেইসবুকের কাছে একটি শক্তিশালী সিগনা বা সংকেত পাঠায়।
ফলে ফেইসবুকের অ্যালগরিদম মনে করে, পোস্টটি খুব জনপ্রিয় এবং এটি আরও হাজার হাজার নতুন মানুষের ওয়ালে বা নিউজ ফিডে পৌঁছে দেয়।
সরাসরি দাম লেখা থাকলে ক্রেতারা কেবল দেখে চলে যেতেন, কোনো ‘কমেন্ট’ আসত না এবং পোস্টের ‘রিচ’ কমে যেত।
মনস্তাত্ত্বিক বিনিয়োগ এবং সরাসরি সম্পর্ক
আন্তর্জাতিক বিপণন ম্যাগাজিন ‘থিংক মার্কেটি’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইনবক্সে ডেকে নেওয়ার পদ্ধতিটি আসলে বাস্তব জীবনের দোকানের মতো পরিবেশ তৈরি করার একটি চেষ্টা।
কৌশল: যখন একজন ক্রেতা কষ্ট করে ইনবক্সে মেসেজ পাঠান, তখন পণ্যের প্রতি তার এক ধরনের ‘মানসিক বিনিয়োগ’ তৈরি হয়।
ডিজিটাল বিপণন সংস্থা ‘কোড-নাইনটিফাইভ’-এর ব্লগ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইনবক্সের ওপারে থাকা একজন চ্যাট অপারেটর বা বিক্রেতা তখন ক্রেতার সঙ্গে ‘ওয়ান-টু-ওয়ান’ সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন।
সেখানে পণ্যের ভালো দিকগুলো বিশদভাবে বুঝিয়ে বলা, অফার দেওয়া বা আলাদা সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ক্রেতাকে পণ্যটি কিনতে প্ররোচিত করা অনেক সহজ হয়।
প্রতিযোগীদের থেকে মূল্য গোপন রাখা
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপণন সংস্থা ‘ম্যাশআপ মার্কেটিং’-এর ওয়েসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একটি কেইস স্টাডি’র আলোকে জানানো হয়, ছোট এবং মাঝারি ই-কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের নজরদারি একটি বড় উদ্বেগের কারণ।
কৌশল: ফেইসবুক বা ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ্যে পণ্যের দাম দেওয়া থাকলে, সমগোত্রীয় অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী পেইজগুলো সহজেই সেই দাম দেখে ফেলে। তখন তারা ক্রেতা ভাগিয়ে নেওয়ার জন্য ইচ্ছা করে, নিজেদের পেইজে একই পণ্যের দাম একটু কমিয়ে দিতে পারে। যাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভাষায় ‘প্রাইস আন্ডারকাটিং’ বলা হয়।
ইনবক্সে দাম জানানোর ফলে, প্রতিযোগীদের কাছে নিজেদের মূল্যটা গোপন রাখা সম্ভব হয়।
বিপরীত প্রভাব
যদিও বিক্রেতারা এটিকে একটি দারুণ কৌশল মনে করেন। তবে গবেষণায় এর সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং ক্ষতিকর চিত্র উঠে এসেছে।
কম্বোডিয়ার ‘ক্যামএড বিজনেস স্কুল’-এর গবেষক ভেউং চান্দারা, তার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও গবেষণা ‘ইনবক্স ফর প্রাইস – অ্যান এক্সপেরিমেন্ট’-এ দুটি সম্পূর্ণ একই রকম ফেইসবুক বিজ্ঞাপনের ওপর দীর্ঘ মেয়াদে নজর রাখেন।
একটি গ্রুপে দাম পরিষ্কারভাবে লেখা ছিল, যাকে বলে ‘ট্রান্সপারেন্ট প্রাইসিং’; এবং অন্য গ্রুপটিতে দাম জানতে ইনবক্সে আসতে বলা হয়েছিল, যাকে বলে ‘ইনবক্স প্রাইসিং’।
গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল ছিল চমকপ্রদ।
বেশি বিক্রি: ‘ইনবক্স প্রাইসিং’-এর চাইতে যেসব বিজ্ঞাপনে দাম পরিষ্কারভাবে তাদের পেইজে উল্লেখ ছিল, সেগুলোর চাহিদা ‘ব্যাপকভাবে’ বেশি ছিল।
সম্পদের অপচয়: ইনবক্সে ক্রেতাকে সামলানোর জন্য বিক্রেতাদের অতিরিক্ত সময়, শ্রম এবং জনবল অপচয় করতে হয়েছিল, যা ব্যবসার পরিচালন খরচ বাড়িয়ে দেয়।
আস্থার সংকট: পেশাদার নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম ‘লিংকডইন’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক ক্রেতারা অত্যন্ত ব্যস্ত এবং অলস। ইনবক্সে দাম লুকানোর এই প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ‘অস্বচ্ছ এবং অপেশাদার’ মনে করেন।
ফলে পেইজের ওপর থেকে ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদী আস্থা নষ্ট হয়।
ক্রেতারা যা করতে পারেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রেতা হিসেবে তাড়াহুড়ো না করে বুদ্ধি খাটানো উচিত।
দাম জানার জন্য সরাসরি কমেন্ট করা: ‘হুটসুইট’-এর বিশ্লেষকদের মতে, ‘পেইজে দাম না থাকলে ক্রেতাদের প্রথম কাজ হল কমেন্ট বক্সে সরাসরি ‘দাম কত?’ লিখে প্রশ্ন করা।
এভাবে কমেন্ট করলে বিক্রেতা বাধ্য হন, উত্তর দিতে। অনেক সময় বিক্রেতা ইনবক্সে দাম জানালেও, অন্য কোনো সচেতন ক্রেতা হয়ত, সেই কমেন্টের নিচে এসে আসল দামটি ফাঁস করে দিতে পারেন। এতে নিজের সময় বাঁচে।
দাম তুলনা না করে হুট করে কেনা যাবে না: যুক্তরাজ্যের ভোক্তা অধিকার সংস্থা ‘হুইচ’ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা সব সময় পণ্যের দাম তুলনা করার পরামর্শ দেন।
যে পেইজ দাম লুকিয়ে রাখছে, তারা আপনার কাছ থেকে বেশি দাম নেওয়ার সুযোগ খুঁজতে পারে। তাই ইনবক্সে দাম জানার পর, সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠানো যাবে না।
ওই একই পণ্য অন্য কোনো পেইজ বা ই-কমার্স ওয়েবসাইটে কত দামে বিক্রি হচ্ছে, সেটা গুগলে খুঁজে মিলিয়ে নেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
ইনবক্সে দরকষাকষি করা: ক্যামএড বিজনেস স্কুল-এর গবেষক ভেউং চান্দারা, তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ইনবক্সে দাম লুকানোর একটি কারণ হল- ক্রেতা ভেদে আলাদা দাম নির্ধারণ করা।
যেহেতু বিক্রেতার সঙ্গে ক্রেতার ‘ওয়ান-টু-ওয়ান’ বা সরাসরি কথা হচ্ছে, তাই এটি দরকষাকষির একটি ভালো সুযোগ।
অন্য পেইজের কম দামের উদাহরণ দিয়ে ইনবক্সে ছাড় বা ফ্রি ডেলিভারির দাবি করা যেতে পারে।
স্বচ্ছতা না থাকলে এড়িয়ে চলা: ব্যবসা-বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস এবং ‘হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ’-এর বিভিন্ন ভোক্তা আচরণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আধুনিক যুগে যে ব্যবসায়, পণ্যের দাম নিয়ে লুকোচুরি করে, তাদের সততা ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকে।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দাম লুকিয়ে রাখা এক ধরনের ‘অস্বচ্ছ ব্যবসা’। যদি ইনবক্সে দাম জানার পর, বিক্রেতা জোর খাটায়, কিংবা দাম বলতে গড়িমসি করে অন্যান্য কথা বলে মন ভোলানোর চেষ্টা করে, তবে সেই পেইজ থেকে পণ্য না কেনাই শ্রেয়।
কারণ, যারা দাম নিয়ে লুকোচুরি করে, পণ্য নষ্ট হলে তারা ‘রিটার্ন’ বা ‘রিফান্ড’ দিতেও ঝামেলা করতে পারে।
রিভিউ এবং রেটিং পরখ করা: আন্তর্জাতিক ই-কমার্স পরামর্শক সংস্থাগুলোর মতে, কোনো পেইজের ইনবক্সে ঢোকার আগে অবশ্যই ওই পেইজের ‘রিভিউ অপশন’ বা ‘কমেন্ট সেকশন’ ভালো করে পড়ে নেওয়া উচিত।
অন্য ক্রেতারা পণ্য ঠিকঠাক পেয়েছে কি-না এবং তাদের কাছ থেকে কত দাম নেওয়া হয়েছে, সেসব বিষয়ে ধারণা কমেন্ট থেকেই পাওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন
ফোন কিনতে গিয়ে ‘ওয়াটারপ্রুফ’ নাকি ‘ওয়াটার রেজিস্ট্যান্ট’?