Published : 11 Jun 2026, 12:34 AM
প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি, পাসপোর্ট জটিলতা, দালালচক্র, ভিসা প্রতারণা, দূতাবাসে সেবা সংকট, লাশ দেশে আনা, পুনর্বাসন ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি প্রশ্নে জাতীয় সংসদে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে।
এ সময় প্রবাসীদের সমস্যা সরেজমিনে দেখতে সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তার এই প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে পারে বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ অনুযায়ী প্রবাসী কর্মীদের নিয়ে সাধারণ আলোচনার প্রস্তাব তোলেন শফিকুর রহমান।
স্পিকার আলোচনার জন্য দেড় ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করেন।
সে আলোচনায় অংশ নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, “যেসব দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের সমস্যা বেশি, সেখানে এই টাস্কফোর্স গিয়ে প্রবাসী কর্মী ও দূতাবাস কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনতে পারে। আমরা যদি একটা ‘টোটাল প্যাকেজের’ দিকে যাই, আমি রেমিটেন্স বাড়ার উদ্দেশ্যে বলছি না; মানবতাকে সম্মান করার উদ্দেশ্যে বলছি।
“প্রবাসীদের আমরা টাকার মেশিন হিসেবে না দেখি। আমরা যেন আমাদের প্রাণ হিসেবে, কলিজা হিসেবে দেখি।”
‘শ্রমিক রপ্তানি’ ও ‘মানুষ রপ্তানি’ ধরনের পরিভাষা নিয়েও আপত্তি তোলেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “পণ্য রপ্তানি হয়, মানুষ রপ্তানি না হোক। এটাকে একটা সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যাই।”
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও পেশাজীবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “তারা টাকা চান না; তারা সম্মান ও কাজ করার পরিবেশ চান। ফাইন্যান্সিয়াল রেমিটেন্স তো অবশ্যই লাগবে। কিন্তু তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ইন্টেলেকচুয়াল রেমিটেন্স।”
প্রবাসীদের ই-পাসপোর্ট করতে গিয়ে এমআরপি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য মিল না থাকার কারণে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন দাবি করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, “নামের বানান, বয়সের সামান্য অমিল বা তথ্যগত ত্রুটির কারণে অনেকের ই-পাসপোর্ট হচ্ছে না। এতে বহু প্রবাসী বিদেশে অবৈধ হয়ে পড়ছেন বা পড়ার ঝুঁকিতে আছেন। এই সংখ্যা শত নয়, হাজার হাজার।”
বিদেশ থেকেই এনআইডি ও পাসপোর্টের তথ্যগত জটিলতা সহজে নিরসনের ব্যবস্থা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
প্রবাসে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ দ্রুত দেশে আনার দাবিও তোলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির।
একই বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসুদ বলেন, প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও তারা পদে পদে হয়রানির শিকার হন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিমানবন্দরে প্রবাসীদের লাগেজ কেটে মালামাল চুরি, ভিসা প্রতারণা, টিকিট জালিয়াতি, রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণা ও দূতাবাসে সেবা না পাওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি ও বিদেশে ভুয়া কোম্পানির নামে শ্রমিক পাঠানোর অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসবের সঙ্গে দূতাবাস, মন্ত্রণালয় ও বিদেশি সিন্ডিকেটের যোগসাজশ থাকে।
আহত হয়ে দেশে ফেরা প্রবাসী এবং প্রবাসে মারা যাওয়া কর্মীদের পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য কর্মপরিকল্পনা তৈরির দাবি তোলেন তিনি।
নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য বরকতউল্লাহ বুলু হজের সময় সৌদি আরবে বাংলাদেশি কর্মীদের দুরবস্থার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “হারাম শরিফ ও মিনায় অনেক বাংলাদেশি অত্যন্ত কম মজুরিতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। বাংলাদেশিরা ৪০০ রিয়াল বেতন পায়। পাকিস্তানি, নেপালি, ভারতীয়রা পায় দুই-তিন হাজার রিয়াল।”
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললে যেন আগের মতো সিন্ডিকেট তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেন তিনি।
দূতাবাসে পাসপোর্ট নবায়নে ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগার অভিযোগ তোলার পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর দাবিও জানান বুলু।
কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, প্রবাসী শ্রমবাজারের সমস্যা নতুন নয়; এর পেছনে দীর্ঘদিনের আদম ব্যবসায়ী ‘সিন্ডিকেট’ কাজ করছে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলেও মানব পাচার, দালালচক্র ও ভিসা প্রতারণা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ইউরোপগামী অনিরাপদ রুটে অনেক বাংলাদেশির মৃত্যু হলেও মানব পাচারকারীদের বিচার হয় না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
“মানব পাচারের যে হত্যা হয়, তাদের বিচারও দ্রুত করতে হবে।”
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকেই কম মজুরি, অস্বাস্থ্যকর আবাসন ও পাসপোর্ট জটিলতায় ভুগছেন।
তিনি বলেন, পাসপোর্ট নবায়নে সাত-আট মাস লেগে যায়। এতে অনেকের ভিসা শেষ হয়ে তারা বিদেশে অবৈধ হয়ে পড়েন।
প্রতিটি মিশনে প্রবাসী শ্রমিকদের আইনি সহায়তার জন্য আইনজীবী প্যানেল রাখার প্রস্তাব দেন তিনি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, প্রবাসীদের শুধু ‘রেমিটেন্স যোদ্ধা’ হিসেবে নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের বড় অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। এ সময় তিনি রেমিটেন্স আসার তথ্যও তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কার্ডে ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ে যুক্ত থাকবে। প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাতে পারবেন এবং দেশে থাকা পরিবারের সদস্য নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সেই টাকা ব্যবহার করতে পারবেন।
প্রবাসীদের আবাসন সুবিধা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘প্রবাসী সিটি’ গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। প্রথমে পূর্বাচলে, পরে জেলা পর্যায়ে এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
গুলশানে ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের জায়গায় প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নুরুল হক নুর বিভিন্ন সময় প্রবাসী কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের কয়েক ক্ষেত্রে সহায়তার হিসাবও তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৩ হাজার রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স আছে; যাচাই-বাছাই করলে ৪০০ থেকে ৫০০টির বেশি টিকবে না বলে তার ধারণা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, প্রবাসীদের সমস্যা জাতীয় সমস্যা, এটি সরকার ও বিরোধী দল মিলে সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসন, বিশেষ করে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনা রোধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো মাইগ্রেশন উইং খোলা হয়েছে। অভিবাসন-সংক্রান্ত সমস্যা, বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশিদের ফেরত আনা, বিদেশে আটক নাগরিকদের সহায়তা এবং শ্রমবাজার-সংক্রান্ত কূটনৈতিক তৎপরতা সমন্বয়ে কাজ করবে তারা।
এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম।
এরপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নিরাপদ, আধুনিক ও সহজলভ্য পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বিশ্বের ৭৩টি বাংলাদেশ মিশনের মধ্যে ৭১টিতে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম চালু রয়েছে।
গত ছয় মাসে বিদেশি মিশনগুলো থেকে ইস্যু করা পাসপোর্টের প্রায় ৮৬ শতাংশ ই-পাসপোর্ট এবং ১৪ শতাংশ এমআরপি পাসপোর্ট ছিল।
তিনি বলেন, বিদেশে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশিরা এনআইডির পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করেও পাসপোর্টের আবেদন করতে পারবেন। তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হলে জন্মনিবন্ধন সংশোধনের মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন, বিদেশি মিশনগুলোতে পাসপোর্ট সেবা পেতে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা আছে।
‘মাল্টিপল অ্যাকটিভ বায়োমেট্রিক’, তথ্যের অমিল, হারানো পাসপোর্ট, পূর্ববর্তী পাসপোর্ট যাচাই বা বিশেষ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তিতে দেরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক সময় প্রয়োজনীয় নথি যথাসময়ে আপলোড না করা, সমস্যার প্রকৃতি না বোঝা বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ায় প্রবাসীদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাসপোর্ট সেবায় ভোগান্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
টাস্কফোর্স হতে পারে
প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে পারে।
তিনি বলেন, শ্রমবাজারের সমস্যা, রিক্রুটিং এজেন্সি, পাসপোর্ট, বিমানবন্দর, দূতাবাস সেবা—এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও আলোচনা হতে পারে।
প্রবাসীদের বিমানবন্দরসহ সব জায়গায় যথাযথ সম্মান দিতে স্বরাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ, পররাষ্ট্র ও বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় মিলে একটি ওয়ার্কিং কমিটি করতে পারে বলেও মত দেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা। এর আগে শ্রমবাজার নিয়ে দুই মন্ত্রী ও উপদেষ্টাকে মালয়েশিয়া পাঠানোর বিষয়টি তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগের সরকারের সময়ে অনেক ক্ষেত্রে মানব পাচার, অর্থ পাচার ও শ্রমিক প্রতারণা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ১০০ জনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি একটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
ভোট হয়নি
আলোচনা শেষে স্পিকার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা সাধারণ আলোচনা চেয়েছেন, প্রস্তাবে সংসদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় না থাকায় তা ভোটে দেওয়া হচ্ছে না।
দীর্ঘ আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে একমত হন। বিভিন্ন বক্তা সংসদীয় টাস্কফোর্স, প্রবাসী কার্ড, দূতাবাস সংস্কার, পাসপোর্ট সেবা সহজীকরণ এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। এরপর আলোচনা সমাপ্ত ঘোষণা করেন স্পিকার।