Published : 09 Jun 2026, 04:45 PM
গরমে ঘাম ঝরা বা জ্বরের কারণে ক্লান্ত লাগা, এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ইলেকট্রোলাইট ড্রিংকস পান করেন। বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়, এটি যেন জাদুর মতো কাজ করে।
তবে এই পানীয় অতিরিক্ত গ্রহণে সমস্যা হতে পারে। মাথাব্যথা, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হওয়া, বমিভাব, পেটফাঁপা এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বাস্তবে কি সবসময় ইলেকট্রোলাইটস পান করা জরুরি?
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “ইলেকট্রোলাইট শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণ পানিশূন্যতায় শুধু পানি ও সুষম খাবারই যথেষ্ট। অতিরিক্ত ইলেকট্রোলাইট গ্রহণে মাথাব্যথা, হৃদস্পন্দনের সমস্যা বা বমি হতে পারে।”
ইলেকট্রোলাইটস পানীয় আসলে কী?
লেকট্রোলাইটস পানীয় হল এমন এক ধরনের তরল, যা পানি এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু খনিজ উপাদান, যেমন- সোডিয়াম ও পটাসিয়াম দিয়ে তৈরি করা হয়। এই পানীয় শরীরে পানির অভাব দূর করতে এবং খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা কেন্দ্র ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্যানুসারে, ইলেকট্রোলাইটস হল এমন কিছু খনিজ উপাদান, যা পানিতে মিশলে সামান্য বৈদ্যুতিক চার্জ বা শক্তি তৈরি করে। মানুষের শরীরের ৬০ শতাংশই পানি। তাই শরীরের ভেতরের কোষগুলো, এই চার্জ ব্যবহারের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সচল রাখে।
ডা. আফসানা হক নয়ন বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ পানি, ফল, শাকসবজি ও সুষম খাবার থেকেই শরীরের প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট পূরণ হয়। শুধু চরম পানিশূন্যতা বা তীব্র ব্যায়ামের ক্ষেত্রে আলাদা পানীয়র প্রয়োজন পড়তে পারে।”
কার কখন এটি পান করা প্রয়োজন?
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সংস্থা ‘বুপা ইউ’-এর তথ্যানুসারে, সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের প্রতিদিন আলাদা করে ইলেকট্রোলাইটস পানীয় পানের দরকার নেই। সাধারণ খাবার ও পানি থেকেই এটি পাওয়া যায়।
তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে এটি খুব দরকারি।
তীব্র গরমে বা বেশি ঘামলে: ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে প্রচুর লবণ বের হয়ে গেলে।
কঠিন ব্যায়াম করলে: এক ঘণ্টার বেশি ভারী ব্যায়াম করলে ক্লান্তি দূর করতে এটি লাগে।
অসুস্থ হলে: ডায়রিয়া বা বমি হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও খনিজ কমে যায়। তখন এই পানীয়, যেমন- ওরাল স্যালাইন, জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস বা কিডনির রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে গ্রহণ করা উচিত।
এসব ক্ষেত্রে ওরস্যালাইন বা চিকিৎসক নির্দেশিত ইলেকট্রোলাইট ড্রিংকস উপকারী। তবে সাধারণ গরমে বা হালকা ঘামের ক্ষেত্রে শুধু পানি ও ফল-সবজি খেলেই চলে।
অতিরিক্ত ইলেকট্রোলাইটসের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
অনেকে বিজ্ঞাপন দেখে মনে করেন, ইলেকট্রোলাইটস ড্রিংকস যেন ‘ম্যাজিক পানীয়’। তবে অতিরিক্ত গ্রহণে সমস্যা হতে পারে।
ডা. আফসানা হক নয়ন সতর্ক করে বলেন, “শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইলেকট্রোলাইটস গ্রহণ করলে ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই নিজে নিজে বেশি পান করতে যাবেন না।”
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক জানাচ্ছে, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ইলেক্ট্রোলাইট পানীয় পান করলে শরীরে বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অতিরিক্ত ইলেক্ট্রোলাইট গ্রহণের প্রধান অপকারিতাগুলোর মধ্যে আছে:
অতিরিক্ত সোডিয়ামের ক্ষতি (হাইপারনেট্রিমিয়া)
ইলেক্ট্রোলাইট পানীয়তে প্রচুর সোডিয়াম বা লবণ থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের পুষ্টিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অনেক বেড়ে গেলে তাকে 'হাইপারনেট্রিমিয়া' বলে। এর লক্ষণের মধ্যে আছে-
মারাত্মক পর্যায়ে এটি মানুষের মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করে। ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং খিঁচুনি বা অজ্ঞান পর্যন্ত হতে পারে।
অতিরিক্ত পটাসিয়ামের ঝুঁকি (হাইপারক্যালেমিয়া)
আমেরিকার হার্ট অ্যাসোসিয়েশন-এর তথ্যমতে, রক্তে অতিরিক্ত পটাসিয়াম জমা হওয়াকে 'হাইপারক্যালেমিয়া' বলা হয়। এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। এর কারণে
কিডনির ওপর বাড়তি চাপ
দেহে অতিরিক্ত খনিজ উপাদান ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করার দায়িত্ব কিডনি বা বৃক্কের। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা কিডনি রিসার্চ ইউকে’র তথ্যানুসারে, ক্রমাগত প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ইলেক্ট্রোলাইটস গ্রহণ করলে, কিডনি সেই বাড়তি চাপ নিতে পারে না। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা আছে, তাদের কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
পেট খারাপ ও বমি ভাব
আমেরিকার ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশন-সহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, হঠাৎ শরীরে অনেক বেশি খনিজ প্রবেশ করলে পাকস্থলী সহ্য করতে পারে না। প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আছে:
ওজন বৃদ্ধি ও রক্তে চিনি বাড়া
বাজারে পাওয়া অনেক ‘স্পোর্টস ড্রিংকস’ বা ইলেক্ট্রোলাইট প্যাকেটে প্রচুর চিনি ও ক্যালোরি থাকে। কোনো ভারী কাজ না করে এগুলো নিয়মিত গ্রহণে রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যায় এবং দ্রুত ওজন বৃদ্ধি পায়।
মনে রাখতে হবে
‘মেডিকেল নিউজ টুডে’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, যদি টানা এক ঘণ্টার বেশি কঠোর পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা হয় কিংবা যদি ডায়রিয়া-বমি না হয়, তবে সাধারণ পানি পানই যথেষ্ট। সুস্থ শরীরে সাধারণ পানির বিকল্প কিছুই নেই।
প্রাকৃতিক উপায়ে ইলেকট্রোলাইটস পূরণের উপায়
বেশিরভাগ সময় প্রাকৃতিক খাবার থেকেই ইলেকট্রোলাইটসের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
ডাবের পানি: প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইটসের ভালো উৎস।
লেবুর শরবত: সামান্য লবণ ও চিনি মিশিয়ে পান করা।
কলা, পেঁপে, তরমুজ, শসা: পটাসিয়াম ও তরলের চাহিদা মেটায়।
ডাল, বাদাম, দই: ম্যাগনেসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ জোগায়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
যদি পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেয়— তীব্র তৃষ্ণা, গাঢ় হলুদ প্রস্রাব, চোখ বসে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
“শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা উচিত”, বলেন ডা. নয়ন।
গরমের এই সময়ে পানিশূন্যতা এড়াতে সহজ উপায় হল, নিয়মিত পানি পান করা এবং সুষম খাবার খাওয়া। ইলেকট্রোলাইটস পানীয় শুধু প্রয়োজনের সময় গ্রহণ করা যেতে পারে, তাও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে। অতিরিক্ত গ্রহণে উপকারের বদলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
আরও পড়ুন
প্রতিদিন যে পানীয় পান করা উপকারী