Published : 09 Jun 2026, 06:26 PM
পৃথিবীতে স্বপ্নদর্শী অনেক রাষ্ট্রনায়ক ও উচ্চমাপের ব্যক্তি আছেন। যেকোনো সংকট সমাধানে আছেন বিচক্ষণ মধ্যস্থতাকারী ও পেশাদার কূটনীতিক। আবার এমন কিছু নির্বোধও আছেন, যারা সবকিছুতে নাক গলান এবং সাজানো বাগান তাসের ঘরের মতো তছনছ করে দেন। আর ডনাল্ড ট্রাম্প কোন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, তা সবারই জানা।
ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতি আবার যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। অসংখ্য সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। ট্রাম্পের শুরু করা, উসকে দেওয়া কিংবা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া যুদ্ধগুলো একের পর এক বেলুন হয়ে ফেটে পড়ছে। বেসবলের ভাষায় বলতে গেলে—ইউক্রেইন, ইরান-লেবানন এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে ট্রাম্পের সব প্রচেষ্টার ফলই শূন্য। ট্রাম্প মহাদর্পে বলেছিলেন, তিনি একাই সব চুক্তি করতে পারেন এবং শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারেন। অথচ এর কোনোটিই করতে পারেননি। এভাবে ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে তিনি আসলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সংকটাপন্ন করে তুলেছেন।
উনিশ শতক ছিল কূটনীতির এক গৌরবময় সময়। প্রিন্স মেটারনিখের ‘কনসার্ট অব ইউরোপ’ ঐকমত্য ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা বা বেনিয়ামিন ডিসরাইলির বলকান অঞ্চলের ‘সম্মানজনক শান্তি’র মতো বড় পদক্ষেপ এখন ইতিহাস। বেশি দূরের কথা নয়—জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান, ফিনিশ কূটনীতিক মার্তি আহতিসারি অথবা উত্তর আয়ারল্যান্ডের ‘গুড ফ্রাইডে’ চুক্তির মধ্যস্থতাকারী মার্কিন সিনেটর জর্জ মিচেলের মতো শান্তিপ্রণেতারা বিশ্বের বহু অমীমাংসিত সংঘাত সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু ডেসমন্ড টুটু, আন্দ্রেই সাখারভ বা আইজাক রবিনের উত্তরসূরিরা আজ কোথায়?
এখন যুদ্ধবিরতি কাঠামো সর্বত্র একের পর এক ভেঙে পড়ছে। ইরানের মতো বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হচ্ছে। লেবাননে সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির উদ্যোগও এ সপ্তাহে ব্যর্থ হয়েছে। সুদানে তো যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণই নেই। প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ থামানো এখন এত কঠিন হয়ে পড়ছে কেন?
একটি বড় কারণ হলো, বিশ্বজুড়ে রেকর্ডসংখ্যক সংঘাতের এই সময়ে শ্রদ্ধাশীল ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে সক্ষম নেতৃত্বের অভাব। বসনিয়ার যুদ্ধ অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মার্কিন কূটনীতিক রিচার্ড হলব্রুকের সঙ্গে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের যোগ্যতার পার্থক্য এতটাই বিশাল যে, সেটি আর্সেনালের সঙ্গে উগান্ডার কোনো ফুটবল ক্লাবের তুলনার মতো।
সত্যিকার অর্থে, ট্রাম্পের কূটনৈতিক রেকর্ড শোচনীয়। তিনি একদিনেই ইউক্রেইন যুদ্ধ সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অথচ যুদ্ধটি এখন পঞ্চম বছরে। নির্লজ্জভাবে তিনি রাশিয়ার পক্ষ নেন, কোণঠাসা ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অপমান করেন এবং অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ রাখেন। তিনি পুতিনের প্রতারণার প্রবণতা ও ইউক্রেইনের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেন। মস্কোর আলোচনায় ক্রেমলিনের কর্মকর্তারা সরলবিশ্বাসী উইটকফ ও কুশনারকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। লজ্জার বিষয়, এ প্রভাবশালী জুটি এখনো কিয়েভ সফর করেননি। মানসম্মান খুইয়ে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধে ট্রাম্পের আগ্রহও কমে গেছে। পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, জেলেনস্কি এখন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিচ্ছেন; কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, পুতিন সেটিও প্রত্যাখ্যান করবেন।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানে অবৈধ হামলার পর ট্রাম্প এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। কিন্তু ঘোষিত কোনো লক্ষ্যই পূরণ হয়নি। পুরো সময়জুড়ে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল বন্ধ ছিল। প্রতিদিন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হচ্ছে, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে চলা অস্পষ্ট ও দায়সারা শান্তি আলোচনাও ফল দিচ্ছে না এবং বিশ্ব অর্থনীতি ধুঁকছে। এবারও ট্রাম্প সংকটের গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হন। ইরান যুদ্ধে তিনি সামরিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত ভরসা করেন। নিজের খায়েশ পূরণে ইউরোপীয় মিত্রদের একপাশে সরিয়ে দ্রুত ও সহজে ইরান বিজয়ের বৃথা চেষ্টা করেন। ফলে তিনি আজ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, বিদ্রোহী কংগ্রেস এবং ক্ষুব্ধ জনমতের মুখোমুখি।
অন্যদিকে, গাজায় গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির পর ট্রাম্প যে বিশ্ব কাঁপানো বিজয়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা স্পষ্টতই অন্তঃসারশূন্য। হামাসকে নিরস্ত্র করার ২০ দফা পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। তার ‘বোর্ড অব পিস’ এবং গাজা পুনর্গঠনের মহৎ পরিকল্পনাগুলোরও কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। বাস্তবতা হলো, ফিলিস্তিনিদের অকল্পনীয় দুর্ভোগ চলছেই। ইসরায়েলি সামরিক দখলদারিত্ব থামেনি। ট্রাম্পের সহযোগী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দক্ষিণ লেবাননে এখন ঠিক সেই কাজই করছেন, যা তিনি গাজায় এতদিন করতেন। জনশূন্য এক মরুভূমি বানিয়ে ভূমি দখল করতে তিনি লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে মার্কিন-ইরান চুক্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই গত সপ্তাহে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা হয়।
ট্রাম্পের ধারাবাহিক ব্যর্থতা আরও বড় একটি সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেন, মিয়ানমার এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার উদ্যোগ এসেছে এবং আবার মিলিয়েও গেছে। কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। সুদানে, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পরও যুদ্ধবিরতি তো দূরের কথা, সামান্য মানবিক বিরতিও অধরা। এর একটি কারণ যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে গভীর অবিশ্বাস ও তিক্ততা; সঙ্গে রয়েছে চরম অনমনীয়তা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের এক ভ্রান্ত বিশ্বাস।
যুদ্ধের টেকসই সমাধানে দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার একটি বড় কারণ হলো সংগঠিত ও স্বীকৃত শান্তি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি। সেই দিনগুলো এখন প্রায় অতীত, যখন জাতিসংঘের ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা বিবদমান পক্ষগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনায় বসতেন, কার্যকর কর্মদল গঠন করতেন, আস্থা তৈরি করতেন এবং সময়সীমা নির্ধারণ করতেন।
দীর্ঘ সময় ধরে হেনরি কিসিঞ্জার, ওয়ারেন ক্রিস্টোফার ও জন কেরির মতো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা শান্তির খোঁজে সক্রিয় শাটল কূটনীতি চালিয়েছেন। এর বিপরীতে, আজকের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নীতিহীন ও অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তিনি অভ্যন্তরীণ বিরোধ এড়িয়ে চলেন, আর বস ভুল করলেও তাকে সঠিক বলে সমর্থন দেন। সম্ভবত ট্রাম্প ও রুবিও ছাড়া আর কেউ অবাক হননি যে, মার্কিন শান্তি আলোচনা থেকে বাদ পড়া হিজবুল্লাহ লেবাননের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছে।
আধুনিক সংঘাতের এ অনমনীয় ও অবাধ্য চরিত্র বর্তমান বিশ্ববাস্তবতার প্রতিফলন। এ বিশ্বব্যবস্থায় কোনো সর্বসম্মত নিয়ম কার্যকর নেই। প্রধান শক্তি ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলো আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক আদালতকে উপেক্ষা করে। ফলে যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নও ক্রমেই নৈরাজ্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। কেবল জাতীয় স্বার্থসর্বস্ব বা নীতিহীন শাসনব্যবস্থার কাছে কোনো চুক্তিই স্থায়ী নয়। চুক্তি ভঙ্গ তাদের কাছে লজ্জার নয়, বুটমুড়ির মতো ঘটনা। তাই নিয়মকানুন ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো শান্তি চুক্তিই শেষ পর্যন্ত টেকে না।
রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি এবং প্রথাগত শাসনব্যবস্থার অবক্ষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আরও প্রকট। সফট পাওয়ার, সংলাপ, যুক্তি, প্ররোচনা, নৈতিক দায়বদ্ধতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ক্রমশ অবমূল্যায়িত। বড় শক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বদলে তাৎক্ষণিক ফলাফল ও বাজারি মানসিকতাকে গুরুত্ব দেয়।
এই কাব্যহীন বিরানভূমিতে কোনোকিছুর ‘দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা’ যেন এক অচেনা ধারণা। সত্য ও ন্যায়বিচার এক হারিয়ে যাওয়া জিনিস। এমনকি এ যুগে শান্তিও এক আপেক্ষিক শব্দ; কারণ বিভিন্ন দেশে হামলা চালানো এক যুদ্ধবাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইটি-ফোর’-এর দ্ব্যর্থক ভাষায় নিজেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য বলে দাবি করেন।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে অন্তহীন ও নিষ্ফল বাগবিতণ্ডা যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব এবং সহিংসতা বন্ধের জোরালো মানবিক প্রয়োজন আড়াল করে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটির অভ্যন্তরে অন্তত ৩,৪৬৮ জন নিহত, ২৬,৫০০ জন আহত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানা গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা হামলার ঘটনাটিও আড়ালে চলে গেছে, অথচ সেখানে মার্কিন বাহিনী একশোর বেশি শিশুকে হত্যা করে। সে হত্যাকাণ্ডের এখনও বিচারিক সুরাহা হয়নি। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হলে আরও নৃশংসতা ঘটবে এবং নিরীহ জনসাধারণের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না।
বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছেই। লেবাননে আগের এক ব্যর্থ যুদ্ধবিরতির পরও হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। মে মাসের শেষ সপ্তাহের চিত্র তুলে ধরে ইউনিসেফ জানিয়েছে, ৭৭ জন শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা গাজা যুদ্ধের চরম পর্যায়ে গণহারে শিশু ও নবজাতক হত্যার ভয়াবহ স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। এ ৭৭টি শিশুর ঘটনা মনে করায়, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা ট্রাম্পের দৈনিক আত্মপ্রশংসামূলক রাজনৈতিক প্রদর্শনী বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিনোদন নয়; এটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
কোনো যুদ্ধেরই শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান হয় না। যুদ্ধ মানে কার হাতে সবচেয়ে বড় বোমা আছে বা কে জোরে নিজের বিজয় ঘোষণা করতে পারে—তা নয়। যুদ্ধ মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। ইতিহাসের অধিকাংশ ঘটনাই সে কথার সাক্ষ্য দেয়। তাই পেশাদার, সক্রিয়, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কূটনীতিই একমাত্র শান্তির পথ খুলে দিতে পারে।
লেখাটি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ থেকে অনূদিত; এর লেখক ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন টিসডাল ওই পত্রিকাটির সহযোগী সম্পাদক ও প্রধান ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমেন্টেটর। কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি গার্ডিয়ানের ফরেন এডিটর ও ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ইউএস এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মূলত ভূ-রাজনীতি, বিশ্ব নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং মানবাধিকার বিষয়ে তার ধারালো ও আপসহীন কলামের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।