Published : 09 Jun 2026, 02:07 PM
“১৯৭১ সাল। যুদ্ধ চলছে। কিন্তু যুদ্ধের রেশ তখনও গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায়নি। গ্রামে বসে দেশের নানা খবর নেয়া আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কাটত সময়। বাড়ির পাশেই ছিল একটি মসজিদ। একদিন মসজিদের ভেতর শুয়ে আছি। হঠাৎ নদীর দিক থেকে ছুটে আসে ছোটবোন চিনু। হাঁপাচ্ছিল সে।
কী হয়েছে? জানতে চাইলে নদীর দিকে আঙুল দেখিয়ে চিনু বলে, ‘দাদা, দুইটা লঞ্চ এদিকে আসতেছে। লঞ্চে পাকিস্তানি পতাকা। আর্মিও আছে।’
আমরা দৌড়ে নদীর পাড়ে যাই। ওর কথাই ঠিক। পাকিস্তানি আর্মিভর্তি লঞ্চ দেখা যাচ্ছে।
গ্রামের দিকেই কেন আর্মি আসছে—এটা যখন ভাবছি তখনই মনে পড়ে যায় চারদিন আগের ঘটনা। অস্ত্রসহ সাত মুক্তিযোদ্ধা ঢোকেন গ্রামে। একজনের নাম গিয়াস উদ্দিন। তিনি আর্মিতে ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন আর্মি ও পুলিশের আরও কয়েকজন বাঙালি সদস্য। সবাই ট্রেন্ড সোলজার। প্রথম সাতজন ছিলেন দু-একদিনের মধ্যেই বেড়ে তারা এগারজন হয়ে যান।
তখন গ্রামের চেয়ারম্যান খালেক সাহেব। তার বাড়িতেই ওঠেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব ছিল আমাদের ওপর। আমরা তো তখন তরুণ। মনের ভেতরও উদ্দম। আনন্দ নিয়েই দায়িত্ব পালন করেছি। গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা এসেছে এ খবরটি রাজাকাররা পৌঁছে দেয় পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে। এ কারণেই ওরা লঞ্চ নিয়ে আমাদের গ্রামটির দিকে আসছিল।”
একাত্তরের একটি ঘটনার কথা এভাবেই তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী।
ফজলুর রহমান ও নূর জাহান বেগমের বড় সন্তান রব্বানী। ছোটবেলায় দাদী আদর করে ডাকতেন দানু মিয়া। ফলে এখনও গ্রামের মানুষের কাছে দানু নামেই তিনি অধিক পরিচিত। তাদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার জয়পুর গ্রামে।
গোলাম রব্বানীর লেখাপড়ায় হাতেখড়ি জয়পুর প্রাইমারি স্কুলে। অতঃপর ষষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি হন মাছিমপুর আরআর ইনস্টিটিউশনে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ওই স্কুলেরই এসএসসি পরীক্ষার্থী।
আলাপচারিতায় ফিরি একাত্তরের ওই ঘটনায়। প্রশ্ন রাখি, লঞ্চভর্তি পাকিস্তানি আর্মি কি গ্রামে ঢুকতে পেরেছিল?
গোলাম রব্বানীর উত্তরে বলেন, “পারেনি। খালেক সাহেবের বাড়িতে গিয়ে গিয়াস উদ্দিনের গ্রুপটিকে আমরা খবরটি জানাই। তারাও পূর্বদিকে নদীর পাড়ে গিয়ে দেখেন দুটো লঞ্চ গ্রামের দিকেই আসছে। আগেই তারা অনুমান করেছিলেন। ফলে পজিশন নিতে নদীর পাড়ে বাঙ্কারের মতো বড় গর্ত করে রেখেছিলেন।
ওই গর্তে সবাই পজিশন নেন। গিয়াস স্যার সবাইকে বললেন, ‘আমি ফায়ার না করলে কেউ ফায়ার ওপেন করবে না’।
আমাকে তার সঙ্গেই রাখলেন। বললেন, ‘তুমি ছোট মানুষ। গর্ত থেকে মাথা তুলবে না। আর আমার এলএমজিটাকে ধরে বসে থাকো’। আমি তাই করি।
আর্মিদের লঞ্চ দুটো এগোয়। রেঞ্জের ভেতর আসতেই গিয়াস স্যার প্রথম ফায়ার করলেন। সাথে সাথে গ্রুপের বাকিদের রাইফেলও গর্জে ওঠে। পাকিস্তান আর্মি ফায়ার করার কোনো সুযোগই পায়নি। তীরে না ভিড়ে তারা দ্রুত লঞ্চ দুটিকে সরিয়ে নেয়। দূর থেকে তখন দেখলাম পাকিস্তানিদের রক্তাক্ত অনেক দেহ পড়ে আছে লঞ্চে।”
পৃথিবীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখন নামকরা। এ ঘটনা কোনোভাবেই তারা মেনে নেবে না। বরং শক্তি সঞ্চয় করে আবারও গ্রামটিতে আক্রমণ চালাবে। এমন শঙ্কায় সবার মনেই আতঙ্ক তৈরি হয়। লোকজনের মুখে মুখে এই আলাপ।
গোলাম রব্বানী ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেই। ফলে তাকে নিয়েও পরিবার চিন্তায় পড়েন। কিন্তু রব্বানীও বসে থাকেন না। গোপনে পরিকল্পনা করেন গ্রাম ছাড়ার। খোঁজখবর নিতে থাকেন ট্রেনিংয়ে যাওয়ার। পরিবারও তখন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তারাও চেয়েছেন ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যাক।
একরাতে একটা নৌকায় রওনা হন তারা। ওই স্মৃতির কথা রব্বানী বললেন যেভাবে, “নৌকার মাঝি ছিলেন আমারই জ্যাঠাত ভাই গফুর। গ্রামে এক লোক ছিলেন। লতিফ মাস্টার বলে ডাকে সবাই। বর্ডার পার করে দেয়ার দায়িত্ব নেন তিনি। প্রথম আমরা যাই রামচন্দ্রপুর বাজারে। বর্ডার পার হয়েই যেতে হবে ভারতের হাতিমারা ইয়ুথ ক্যাম্পে।
তখন সকাল হয়ে গেছে। লতিফ মাস্টার আমাদের রেখে আসেন দিপতি হাজীর বাড়িতে। বর্ডার এলাকা। চারদিকে আর্মির টহল। রাত না হলে এগোনোর উপায় নেই।
তখন বর্ষাকাল। একটা নৌকায় আমরা সারাদিন থাকি পাট খেতের ভেতরে। সামনেই ছিল একটা ব্রিজ। আর্মিরা টহলে থাকত ওখানে। তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ওইরাতেই ব্রিজের নিচ দিয়ে আমরা এগোই। এভাবেই দিপতি হাজী আমাদের পৌঁছে দেন সীমান্তবর্তী চাঁনমিয়া হাজীর বাড়িতে। তিনিই লোক মারফত সীমান্তঘেষা সিএমবি রোড পার করিয়ে পৌঁছে দেন ভারতের হাতিমারা ইয়ুথ ক্যাম্পে।”
হাতিমারা ইয়ুথ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন আইয়ুব আলী নামের এক আর্মি অফিসার। রব্বানীকে সেখানে একটা প্লাটুনের দায়িত্ব দেয়া হয়। হায়ার ট্রেনিংয়ে যাওয়ার আগে ওস্তাদরা তাদের বলতেন, ‘তোমরা যদি দুর্বল হও। তাহলে যেও না। এখানেই থাকো। কিন্তু যারা দেশের জন্য মরতে চাও, তারাই শুধু হায়ার ট্রেনিংয়ে আসো’।

এরপর কীভাবে হায়ার ট্রেনিংয়ে গেলেন গোলাম রব্বানীরা?
তার ভাষায়, “আমাদের ট্রাকে প্রথম নিয়ে যাওয়া হয় ছড়িলাম। সেখানে থেকে আগরতলা হয়ে পাঠানো হয় ওমপি নগর ট্রেনিং ক্যাম্পে। আসাম বর্ডারের কাছাকাছি ওটা। চারপাশে পাহাড়। একটা পাহাড়ের ওপর সমতল ভূমিতে ছিল ক্যাম্পটি। মাচাং করে থাকতাম। ওই ক্যাম্পে আমরা ছিলাম দ্বিতীয় ব্যাচ। এক মাস ট্রেনিং দেয় ইন্ডিয়ান আর্মি। ট্রেনিং খুব কঠিন ছিল। কষ্টও করতে হয়েছে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের তাড়নায় কষ্টটা তেমন ফিল করিনি।”
ট্রেনিং ক্যাম্পের স্মৃতিচারণ করে রব্বানী বলেন, “ভোরে বাঁশি দেয়ার সাথে সাথে হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরে দৌড়াতাম, পাহাড়ি পথে। এরপর নাস্তা—চা আর রুটি। প্র্যাক্টিক্যাল ট্রেনিং হতো। গ্রেনেড কীভাবে থ্রো করতে হয়, তারা তা প্রথম দেখাতেন। এরপর আমরা করতাম। বিকেলে হতো রাইফেল ট্রেনিং। ফায়ার করতাম, গ্রুপ বাই গ্রুপ।
শেষে একদিন তারা বলল, ‘আজ টার্গেট হিসেবে মানুষ দেব, মানুষকে গুলি করতে হবে’। শুনে প্রথম ভড়কে যাই। নানা ভাবনাও আসে। কিন্তু যুদ্ধে গেলে তো মানুষই মারতেই হবে। সাহস নিয়ে তৈরি থাকি। কিন্তু পরে দেখি মানুষ নয়, খড় দিয়ে মানুষের অবয়ব তৈরি করা হয়েছে।
আমাদের সঙ্গে একজন গাতক (গায়ক) ছিলেন। রাতে সে সবাইকে ডেকে বলত, ‘যার যার মন খারাপ আসো একটা গান শুনি’। ব্যারাকের সামনে খালি জায়গা ছিল। সেখানে বসে হাতে তালি দিয়ে দিয়ে মারফতি গান গাইত সে। তার গান শুনে দেশে ফেলে আসা পরিবার-পরিজনদের জন্য অনেকেই চোখের জল ফেলত। এসব স্মৃতি এখনও জীবন্ত হয়ে আছে।”
ট্রেনিং শেষে গোলাম রব্বানীদের পাঠিয়ে দেয়া হয় মেলাঘর হেডকোয়ার্টারে। সবার মনে তখন অন্যরকম আনন্দ, অন্যরকম স্বপ্ন। যুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করার পালা এবার। ক্যাপ্টেন হায়দারের নির্দেশে অস্ত্র দেয়া হয় তাদের। অতঃপর সাত দিনের জন্য পাঠানো হয় বর্ডারের যুদ্ধে।
কেমন ছিল বর্ডারের ওই যুদ্ধ?
তার ভাষায়, “ভারতের সাওয়ালপুরের অপরপাশে বাংলাদেশের বিবিরবাজার। মধ্যখান দিয়ে বয়ে চলেছে গোমতী নদী। সহযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সেলিম একদিন পরিকল্পনা করেন পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে ঢুকে আক্রমণের। আমিসহ কিছু সাহসী ছেলেদের নেয়া হলো।
আমরা গোমতী নদী পার হই। ক্ষরস্রোতা নদীতে তখন হাঁটু পানি। কিন্তু পা রাখলেই বালিতে কোমর অবধি ডুবে যেত। নদী পেরিয়ে খুব ভোরে ওদের একটা ক্যাম্পে অ্যাটাক করি আমরা। হঠাৎ আক্রমণে ওরা টিকতে পারে না। অধিকাংশই পালিয়ে যায়।
পাকিস্তানি আর্মির ক্যাম্পের বাঙ্কারগুলো চেক করতে গিয়ে বুকের ভেতরটা খামচে ধরে। দেখি, প্রতিটি বাঙ্কারে বাঙালি নারী। সবাই বিবসন অবস্থায়। রাজাকাররা তাদের ধরে এনে ওই ক্যাম্পে দিয়েছে। ওদের নির্যাতনে প্রত্যেকের দেহ ক্ষত-বিক্ষত। কেউ উঠে দাঁড়াতে পারছে না। তাদের দিকে তাকানোরও উপায় নেই। রাগে রক্ত তখন টলমল করছিল। অপারেশনে গেলে আমাদের কাছে তিনটা করে গামছা থাকত। দুটি করে গামছা আমরা নারীদের দিয়ে দিই। অতঃপর তাদের নিয়ে ফিরে আসি নদী পার হয়ে। পরে একটা ভ্যান গাড়িতে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় ভারতের সোনামুড়ি হাসপাতালে। স্বাধীনতা এমনি এমনি পাইনি আমরা। স্বাধীন দেশের জন্য জন্য বহু নারীকেই নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে।”
এরপরই রব্বানীদের গ্রুপ করে দেশের ভেতরে পাঠানো হয়। গিয়াস উদ্দিন তখন হোমনা, দাউদকান্দি আর গজারিয়া তিনটি থানার ইউনিট কমান্ডার। কাকে কোথায় পাঠাবে বা কোন গ্রুপে দেবে এটা তিনিই ঠিক করতেন। রব্বানীর অস্ত্র ছিল এসএলআর। তাদের ৮২ জনের মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটির কমান্ডার ছিলেন আব্দুল আউয়াল, ডেপুটি কমান্ডার এরশাদ হোসেন। তারা মুক্তিযুদ্ধ করেন দুই নম্বর সেক্টরে।
পঞ্চবটি নামক জায়গায় একটি অপারেশনের কথা শুনি এই বীরের মুখে।
মুক্তিযোদ্ধা রব্বানী বলেন, “তিতাস ও হোমনার মাঝামাঝি জায়গা সেটি। নদীপথে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে পাকিস্তানিদের একটা লঞ্চ আসছিল সেদিকে। আমরা ওদের লঞ্চটাকে পঞ্চবটিতে আটকাই। তীরের দিকে পজিশনে ছিলাম। পাকিস্তানি আর্মি লঞ্চ থেকে গুলি করতে থাকে। আমরাও মাঝেমধ্যে প্রত্যুত্তর দিই।
হঠাৎ ওদের ফায়ার বন্ধ। বাঙ্কারে আমার পাশেই ছিল সহযোদ্ধা মনির। তার বাড়ি ছিল পাশের মাথাভাঙ্গা গ্রামে। ফায়ার কেন বন্ধ! তা দেখতে বাঙ্কার থেকে মাথাটা একটু তোলে সে। তখনই পাকিস্তানি সেনারা ওর মাথা বরাবর গুলি করে। ছিটকে পড়ে শরীরটা কয়েকটা ঝাঁকি দেয়। এরপরই নিথর হয়ে পড়ে থাকে। চোখের সামনেই তার দমটা চলে যায়। অসহায়ের মতো শুধু তাকিয়ে ছিলাম। সহযোদ্ধা হারানোর বেদনায় বুকের ভেতরটা তখন হু হু করে ওঠে।
থেমে থেমে গুলি তখনও চলছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের টার্গেট মিস হলেও পাকিস্তানি আর্মির টার্গেট সচরাচর মিস হতো না। সন্ধ্যার পর ওরা একটা ট্রেসার গান দিয়ে ফায়ার করে। তা গিয়ে পড়ে খড়ের মধ্যে। ফলে আগুন লেগে যায়।
সে আগুন নেভাতে এগিয়ে যান ইউনিট কমান্ডার গিয়াস উদ্দিন। তখন পাকিস্তানি সেনারা লঞ্চের ভেতর থেকে তার পায়েও গুলি করে। ছিটকে পড়েন তিনি। গ্রুপে চিকিৎসার দায়িত্বে থাকতেন জয়নাল আবেদীন। তার বাড়ি ছিল বরিশাল। তিনিই গিয়াস উদ্দিনের পায়ের গুলি বের করে ও ক্ষত পরিষ্কার করে দেন। কখন কে মারা যাবে তার ঠিক ছিল না। আমরা তো মরতেই গিয়েছিলাম ভাই। বেঁচে ফিরব ভাবিনি।”
১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করলেও দেশের অনেক জায়গায় তখনও যুদ্ধ চলছিল। গোলাম রব্বানীরাও জানতেন না আত্মসমর্পণের খবরটি। তখনও তারা রক্তস্নাত রণাঙ্গনে। প্রাণপণ যুদ্ধের পর তারা স্বাধীনতার স্বাদ পান ২৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে।
ওই ইতিহাসের কথা তিনি বললেন যেভাবে, “আমরা তখনও জয়পুরে। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১। রাতে খবর পাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে পাকিস্তানি আর্মিদের ৪টা লঞ্চ আসছে।
নদীপথে বাঞ্ছারামপুর ও হোমনা দিয়ে এগোচ্ছে তারা। বাঞ্ছারামপুরের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ফায়ার করলে তারা লঞ্চ ভেড়ায় ঘাগুটিয়া ঘাটে। লঞ্চঘাটের পাশেই ছিল একটি প্রাইমারি স্কুল। চারটি লঞ্চে ওরা প্রায় ১৫০-২০০ জন। ঘাটে নেমেই আর্মিরা ওই স্কুলেই শেল্টার নেয়। অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে সেখানেই শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে।
চারপাশ থেকে ওদের ঘেরাও করি আমরা। প্রায় প্রতিদিনই গোলাগুলি চলে। কিন্তু আমরা পেরে উঠি না। পরে খবর পেয়ে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে চারটি ট্যাংক নিয়ে আসে ভারতীয় মিত্রবাহিনী। ২২ ডিসেম্বর সন্ধ্যার দিকে ট্যাঙ্কের গুলি শুরু হয়। পাকিস্তানি সেনারা তখন আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। অতঃপর ২৩ ডিসেম্বর ভারতীয় আর্মিদের কাছে ওরা সারেন্ডার করে।
দড়ি দিয়ে পাকিস্তানি আর্মিদের হাত বেঁধে লঞ্চে তুলে হোমনায় নেয়া হয়। দু-একজন পাকিস্তানি গ্রামের ভেতর পালিয়ে গিয়েছিল। পরে সাধারণ মানুষের পিটুনিতে মারা যায়। একাত্তরে এভাবেই ঘাগুটিয়া ও হোমনা হানাদারমুক্ত হয়। সেদিনের অনুভূতির কথা ঠিক বোঝাতে পারব না।”
এক রাজাকারকে শাস্তি দেয়ার দায়িত্বও পালন করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানী।
তার ভাষায়, “এক রাজাকারকে ধরে আনে গ্রামের মানুষ। গিয়াস ভাই বললেন, বাঙালি হয়েও ও বাঙালি মেরেছে, পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছে, ওর শাস্তিটা কড়া হওয়া উচিত। মাসুমপুর স্কুলের পাশে বড় একটা আমগাছে তাকে লটকাইয়া রাখবা। সবাই যেন দেখতে পারে রাজাকারের পরিণতি। পরে দুইটা গুলি কইরা দিয়ে আসবা। আমরা তাই করি। রাজাকাররা তখনও ঘৃণিত ছিল এখনও ঘৃণিত। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে তারা ঘৃণিত হয়েই থাকবে।”

৫ অগাস্ট ২০২৪, আন্দোলন পরবর্তী সময়ে অনেকেই বলেছেন একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়নি। এ নিয়ে আপনার মতটি জানতে চাই?
মুচকি হেসে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “একাত্তরে আমরা পাকিস্তান থেকে স্বাধীন করে বাংলাদেশ এনেছি। যারা এটা বলেছে তারা কোন দেশ থেকে কোন দেশ স্বাধীন করল! মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নেয়া যাদের পক্ষে কষ্টকর তারাই তা বিতর্কিত করার চেষ্টা করে। এটি বরং সচেতনভাবে একাত্তরকে অস্বীকার করাই।”
কষ্ট নিয়ে তিনি আরও বলেন, “শুনেছি, পাকিস্তান যখন আত্মসমর্পণ করে তখন তারা বলেছিল এই বাংলাদেশে আমাদেরও বীজ রেখে গেলাম। এত বছর পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা যা শুনেছি, তাহলে কি তাদের ওই কথাটারই বাস্তাবায়ন ঘটল? আমার তো টাকার জন্য, বাড়ির পাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধে যায়নি। গিয়েছি দেশটা স্বাধীন করার জন্য। পরবর্তী প্রজন্ম যেন একটু শন্তিতে থাকতে পারে, সেটাই ছিল আশা।”
পাহাড়সম আশা নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের উদ্দেশ্যেই মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন শেষ কথাগুলো, ঠিক এভাবে, “তোমরা একাত্তরকে মুছে ফেলতে দিও না। তাহলেই তোমরা দিক হারাবে। আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। এখন স্বাধীন দেশে আমাদেরকেই যদি অসম্মান করো তবে স্বাধীনতাকেই অসম্মান করা হবে। এই দায় তোমাদেরও।”

সালেক খোকন লেখক ও গবেষক