Published : 09 Jun 2026, 11:22 AM
‘শিশুদেরকে হ্যাঁ বলুন’ (সে ইয়েস টু চিলড্রেন)। ইউনিসেফের এই জনপ্রিয় স্লোগানটি এক সময় বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। শিশুদের ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়, বলতে হবে। কারণ তারা যেন ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে বড় হয়ে ওঠে, নিজেদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারে। কিন্তু বড়দের ক্ষেত্রেও কি সবসময় ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে? এখানে উত্তর ভিন্ন। ইতিবাচক ও জনকল্যাণমূলক কাজে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে। কিন্তু নেতিবাচক, অযৌক্তিক কিংবা অপচয়মূলক কোনো কিছু হলে শক্তভাবে ‘না’ বলতে হবে। এই একটি ‘না’ অনেক অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতি ও অপচয় থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারে। কখনো কখনো একটি দৃঢ় ‘না’ হাজারো ‘হ্যাঁ’-এর চেয়েও বেশি জনকল্যাণ বয়ে আনতে পারে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক বাস্তবতায় এই ‘না’ শব্দটির গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা যাচ্ছে।
বাঙালি ভ্রমণপ্রিয় জাতি। তবে সাধারণ বাঙালির ভ্রমণ আর আমাদের সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভ্রমণের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সাধারণ মানুষ সারা বছর কষ্ট করে টাকা জমিয়ে কক্সবাজার গিয়ে দুই দিন সমুদ্র দেখে ফিরে এসে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আর আমাদের আমলা ও অভিজাতরা করদাতা কিংবা দাতা সংস্থার টাকায় (সেটাও কোনো না কোনো দেশের খেটে খাওয়া মানুষের করের টাকা) প্যারিস, লন্ডন, ফ্লোরিডা কিংবা জেনেভা ঘুরে আসেন ‘সক্ষমতা বৃদ্ধি’ আর ‘অভিজ্ঞতা বিনিময়’ ইত্যাদি বাহারি নামের মহৎ পতাকা উড়িয়ে। তারা কী সক্ষম হলেন, কী অভিজ্ঞতা বিনিময় করলেন, আর দেশে ফিরে বিদেশ ভ্রমণের সেই জ্ঞান কোন খাতে প্রয়োগ করলেন, এ প্রশ্ন করা অবশ্য খুবই গর্হিত একটি কাজ!
তবে সুখবর হলো, বহুদিন পর এই ‘সরকারি টাকায় বিশ্বভ্রমণ কর্মসূচি’তে একজন অন্তত ব্রেক কষেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একের পর এক ফাইলে এমনভাবে ‘না’ লিখছেন, যেন দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা জনগণের দীর্ঘশ্বাস তার কলম দিয়ে বেরিয়ে আসছে। তবে বিদেশ যেতে না-পারাদের অভিশাপও নিশ্চয়ই বর্ষিত হচ্ছে। পরের টাকায় এমন মাস্তি করার সুখ যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে রাগ হবেই। তবে সেই অভিশাপ আর রাগের যোগফল সম্মিলিত দোয়ার-বরকতে নিশ্চয়ই ভেসে যাবে। দেশের মানুষ এখন গোপনে গোপনে দোয়া করছে, এই ‘না’ যেন কোনো দিন ভুল করে ‘হ্যাঁ’ হয়ে না যায়।
সড়ক বাতির বিদ্যুৎ সাশ্রয় শিখতে ফ্রান্সে যেতে চান রাজশাহী সিটির প্রশাসক, প্রধানমন্ত্রীর ‘না’
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মহোদয় ফ্রান্স যেতে চেয়েছিলেন রাস্তার বাতির প্রযুক্তি শিখতে। শুনলে মনে হয়, রাজশাহীর রাস্তার লাইটগুলো বোধহয় এতদিন নিউটনের সূত্র মেনে জ্বলছিল না। প্যারিসে গিয়ে আইফেল টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আলোকপ্রাপ্তি ঘটবে, তারপর ফিরে এসে রাজশাহীর মোড়ে মোড়ে বিপ্লব ঘটাবেন তারা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ফাইল দেখে মনে করিয়ে দিলেন, প্রশাসক তো প্রকৌশলী নন। বিদ্যুতের জটিলতা বোঝার দায়িত্ব প্রকৌশলীদের। ফলে আইফেল টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে বাতির রহস্য আবিষ্কারের স্বপ্ন সেখানেই নিভে গেল।

এর কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কর্মকর্তারা ফ্লোরিডা যেতে চেয়েছিলেন মশা দমন শেখার জন্য। ব্যাপারটা শুনে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের মশারা বোধহয় আন্তর্জাতিক মানের হয়ে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে আমেরিকান ডিগ্রি প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বিষয়টিকে সহজভাবে দেখেছেন। তার পর্যবেক্ষণ: মশা মারার কৌশল শিখতে ফ্লোরিডা নয়, সন্ধ্যার পর দেশের যেকোনো ডোবার পাশে ১০ মিনিট দাঁড়ালেই যথেষ্ট। এই এক বাক্যে তিনি কোটি টাকার প্রশিক্ষণ প্রকল্পের চেয়ে বেশি কার্যকর শিক্ষা দিয়ে ফেলেছেন।

মশা মারা শিখতে যুক্তরাষ্ট্র যেতে চান চট্টগ্রামের মেয়র, প্রধানমন্ত্রীর ‘না’
আমাদের দেশে বিদেশ সফরের যুক্তিগুলো এতটাই সৃজনশীল যে এগুলো নিয়ে আলাদা সাহিত্য পুরস্কার চালু করা যেতে পারে। এই আমলাতান্ত্রিক প্রমোদ ভ্রমণের তালিকায় আরও কিছু মুক্তো ছড়ানো আছে। যেমন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের দুপুরের খাবারের (খিচুড়ি) পুষ্টিমান এবং তা কীভাবে চামচ দিয়ে বাটিতে পরিবেশন করতে হয়, তা শিখতে কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব! বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পুকুর ও খাল খনন শেখার জন্য ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার প্রস্তাব! আমাদের দেশের মানুষ হাজার বছর ধরে কোদাল দিয়ে পুকুর কাটছে, সেই পুকুর কাটা দেখতে নাকি আমলাদের মেলবোর্ন আর প্যারিস যেতে হবে! ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তিন তলা একটি কাঁচাবাজারের লিফট ও এসকেলেটর ঠিকঠাক নড়াচড়া করছে কি না, তা দেখতে পাঁচ কর্মকর্তার সুইজারল্যান্ড ও স্পেন ভ্রমণ! আর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘ঘাস চাষ’ শিখতে বিদেশ যাত্রার কথা তো এখন লোকগাথায় পরিণত হয়েছে। এমনকি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যসহ সাতজন কর্মকর্তা নাকি ল্যাপটপ কীভাবে অন-অফ করতে হয় এবং এর সফটওয়্যার কীভাবে চলে, তা শিখতে যুক্তরাজ্য সফরে গিয়েছিলেন! ল্যাপটপ চালানো শেখার জন্য ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড বা আইডিবি ভবনের কোনো দোকানে না গিয়ে সরাসরি লন্ডনের টেমস নদীর তীরে চলে যাওয়া—এই না হলে আমাদের শিক্ষাবিদ!
এর আগে মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) এক অডিট প্রতিবেদনের সূত্রে খবর বেরিয়েছিল যে, কৃষি ও মৎস্য অধিদপ্তরের ৭টি প্রকল্পের আওতায় ২২৮ জন কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। তাদের মধ্যে ৪৫ জনের বয়স ছিল ৫৫ বছরের বেশি। ২৩ জনের অবসরে যাওয়ার বাকি ছিল মাত্র এক বছর। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই ২২৮ জনের মধ্যে ৭৩ জনের ওই প্রকল্পের সঙ্গে সুদূরতম কোনো সম্পর্কই ছিল না। মৎস্য অধিদপ্তরের ক্ষেত্রেও ৩০ শতাংশ কর্মকর্তা প্রকল্পের বাইরের মানুষ ছিলেন। অর্থাৎ, প্রকল্প হলো একটা উছিলা মাত্র। মূল লক্ষ্য হলো—‘সরকারি টাকায় বিদেশ বিভুঁই ঘুরে আসি, বুড়ো বয়সে একটু হাওয়া বদল হবে।’
সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং কৌতুকপূর্ণ বিষয় হলো আমলাদের অবসরের ঠিক আগমুহূর্তে জ্ঞান আহরণের তীব্র ক্ষুধা। স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিডি) একজন জ্যেষ্ঠ সচিব তার চাকরির শেষ কর্মদিবসের আগের দিন বিদেশ থেকে একটি অত্যন্ত ‘গুরুত্বপূর্ণ’ শিক্ষাসফর শেষ করে দেশে ফিরেছিলেন। তার মানে, তিনি যে জ্ঞানটি অর্জন করে এসেছিলেন, তার পরের দিনই অবসরে চলে গিয়েছিলেন। সেই অর্জিত রাষ্ট্রীয় জ্ঞান এখন তিনি তার ড্রয়িংরুমে বসে নাতি-নাতনিদের গল্প শোনানোয় ব্যবহার করেছেন কি না, তা খোঁজা দরকার। একইভাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে বিদেশ সফরে গিয়ে দেশের কল্যাণ করে এসেছিলেন!
প্রকল্পের ডিপিপি এখন অনেক সময় উন্নয়ন পরিকল্পনার চেয়ে ভ্রমণ পরিকল্পনা হিসেবেই বেশি কার্যকর। রাস্তা, সেতু, ড্রেন, খাল—এসব পরে দেখা যাবে; আগে দেখা দরকার কোন দেশে ‘স্টাডি ট্যুর’ করা যায়। ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’, ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’, ‘নলেজ শেয়ারিং’—এসব শব্দ এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে এগুলোর বাংলা অর্থ এখন অনেকের কাছেই দাঁড়িয়েছে: সরকারি টাকায় বিদেশ সফরের মার্জিত নাম।
তবে এই নলেজ শেয়ারিংয়ের নিশ্চয়ই দরকার আছে। কিন্তু তার জন্য যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচিত হন খুব কমই। বাস্তবে দেখা যায়, যে বেচারা মাঠপর্যায়ে আসল কাজটি করবে, সেই প্রকৌশলী বা টেকনিশিয়ানের কপালে পাসপোর্ট জুটবার আগেই ফাইলের ওপরের চেয়ারে বসা বড় সাহেবরা স্যুট-কোট পরে বিমানে চড়ে বসেন। ফিরে এসে তারা কোনো দিন কোনো প্রশিক্ষণ প্রতিবেদন জমা দেন না, আর তাদের অর্জিত সেই ‘ঐশ্বরিক জ্ঞান’ দেশের মাটিতে কী কাজে লাগল, তার কোনো প্রমাণ তো আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে কেউ দেখাতে পারেনি।
এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষের কাছে স্বস্তির খবর। তিনি অন্তত এই বার্তাটি দিয়েছেন যে বিদেশ সফর কোনো পুরস্কার নয়, কোনো অবসরকালীন বিনোদনও নয়। কাজের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে, জনগণের টাকায় ভ্রমণের সুযোগও থাকবে না।
তবে সতর্ক থাকার কারণ আছে। আমাদের আমলাতন্ত্র সৃজনশীল। আজ যদি ফ্লোরিডায় মশা মারা দেখতে যাওয়া বন্ধ হয়, কাল হয়তো আইসল্যান্ডে গিয়ে উইপোকার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণার প্রস্তাব আসবে। আজ যদি পুকুর খনন শেখার সফর বাতিল হয়, কাল হয়তো বৃষ্টির পানি নিচের দিকে কেন নামে, তা পর্যবেক্ষণ করতে সুইজারল্যান্ড সফরের আবেদন জমা পড়বে।
তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার টেবিলে যখনই এমন কোনো ফাইল আসবে, যার ভেতর থেকে করদাতা বা বিদেশি দাতা সংস্থার টাকার কান্না কিংবা প্রমোদভ্রমণের সুগন্ধ বের হবে, তখন আপনার কলম থেকে যেন একটিই শব্দ বের হয়—‘না’।
কারণ সব ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ মহৎ নয়। অনেক সময় একটি ‘না’ই জনস্বার্থের সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষে দাঁড়ায়। শিশুদের জন্য ‘হ্যাঁ’ ভবিষ্যৎ গড়ে, আর অপচয়, অনিয়ম ও অযৌক্তিক সুবিধাভোগের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় ‘না’ রাষ্ট্রকে রক্ষা করে।
এই ‘না’ কয়েকজনের বিদেশযাত্রার স্বপ্ন ভাঙতে পারে, কিন্তু কোটি মানুষের মনে স্বস্তির বাতি জ্বালায়।
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: [email protected]