Published : 23 Nov 2025, 04:13 PM
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে একাধিক ভূমিকম্প ও কম্পন অনুভূত হয়েছে। আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পরিবারের আড্ডা, অফিস সব জায়গায় একই কথা, ‘এখনও ভয়টা কাটছে না।’
ভূমিকম্পের প্রকৃত ক্ষতি না হলেও মানসিক আঘাত থেকে যাচ্ছে কারও কারও মনে। কেন এই আতঙ্ক বারবার ফিরে আসে? কেন মনের ভেতর অজানা শঙ্কা চেপে বসে থাকে?
মনোবিজ্ঞানীর মতে, এর পেছনে রয়েছে মানব-মনের গভীর প্রতিক্রিয়া এবং পূর্বস্মৃতি।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মনোবিজ্ঞানী নাদিয়া নাসরিন বলছেন, “ভূমিকম্প এমন একটি ঘটনা যা মানুষকে হঠাৎ, পূর্বাভাসহীন-ভাবে আঘাত করে। এই অপ্রত্যাশিত আঘাতই মানসিক ট্রমার মূল উৎস।”
হঠাৎ আঘাত: আতঙ্কের প্রথম ধাপ
নাদিয়া নাসরিন ব্যাখ্যা করেন, “মানুষের মস্তিষ্ক হঠাৎ কোনো বিপদে সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। সেটাই স্বাভাবিক। তবে সমস্যা হয় তখন, যখন সেই প্রতিক্রিয়া থামতেই চায় না।”
ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার মুহূর্তে শরীরে ‘অ্যাড্রেনালিন’ হঠাৎ বেড়ে যায়। এই হরমোন দেহে ‘বাঁচ অথবা মর’ অনুভূতি তৈরি করে। মানুষের হৃদস্পন্দন বাড়ে, শরীর কাঁপে, মাথা ঘোরে— আর এগুলো খুব স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া।
“তবে কম্পন থেমে যাওয়ার পরও অনেকের মস্তিষ্ক সেই অবস্থায় আটকে থাকে। ফলে তারা কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ প্রতিটি শব্দকে ভূমিকম্প ভেবে আঁতকে ওঠে।”- ব্যাখ্যা করেন নাদিয়া।
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর শিক্ষার্থী রেজবি আক্তার বলেন, “ঘুমাতে যাওয়া আগে ও উঠে এখনও মনে হয় বিছানা দুলছে, আবার মাঝে মাঝে হালকা মাথা ঘোরা বা হাওয়ার দোলাকেও কম্পন ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।”
অসহায়ত্বের অনুভূতি আঘাতকে বাড়িয়ে তোলে
ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা মানুষ থামাতে পারে না, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং আগে থেকে সঠিকভাবে জানতে পারে না।
এই নিয়ন্ত্রণহীনতার অনুভূতি মানসিক ‘ট্রমা’ বা আঘাতকে আরও গভীর করে।
নাদিয়া বলেন, “ভূমিকম্পের সময়ে মানুষ ভাবে— এ মুহূর্তে আমার জীবন পুরোপুরি অনিশ্চিত। এই ‘অসহায়ত্ব’ ট্রমার সবচেয়ে গভীর জায়গাটি তৈরি করে।”
বারবার খবর দেখা ও আলোচনা মানসিক আঘাতকে দীর্ঘায়িত করে
ভূমিকম্পের পর মানুষ সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আশপাশের মানুষের কথোপকথন থেকে প্রায়ই নতুন আতঙ্ক পায়।
কম্পনের ভিডিও, গুজব, বিশেষ করে সম্ভাব্য আরও বড় ভূমিকম্পের খবর— এসবই মনের ভেতরের শঙ্কাকে বারবার সক্রিয় করে।
এই মনোবিজ্ঞানী বলেন, “মস্তিষ্ক ভয় পেলে সেই ঘটনার সঙ্গে মিল থাকা যে কোনো তথ্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়। ফলে ভূমিকম্পের খবর যত বেশি সামনে আসে, মস্তিষ্ক তত বেশি সতর্ক অবস্থায় থেকে ট্রমাকে ধরে রাখে।”
সাম্প্রতিক কম্পনের পর রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর দেখছেন অনেকেই— এটি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, কমাচ্ছে না।
শারীরিক লক্ষণও দেখা দিতে পারে
ভূমিকম্প-পরবর্তী মানসিক চাপ শুধু মনে নয়, শরীরেও প্রভাব ফেলে।
এ সময় যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে তার মধ্যে রয়েছে- হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরা, বুকে চাপ অনুভব করা, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, বারবার আতঙ্ক অনুভব করা।
এই লক্ষণগুলো অনেককে আরও ভয় পাইয়ে দেয়। ফলে তারা মনে করেন, আবার ভূমিকম্প হচ্ছে।
আসলে এটি শরীরের স্বাভাবিক ‘স্ট্রেস’ বা চাপের প্রতিক্রিয়া।
মানুষের স্মৃতি দীর্ঘসময় ধরে আতঙ্ক ধরে রাখে
ভূমিকম্পের মতো ঘটনার সময় যে ভয় তৈরি হয়, মস্তিষ্ক সেটিকে ‘বিপজ্জনক স্মৃতি’ হিসেবে সংরক্ষণ করে রাখে। তাই ঘটনার পরে দরজা কাঁপা, গাড়ির হর্ন, হালকা দোল বা বাসার নিচের রাস্তা দিয়ে গাড়ি বা ট্রাক গেলে কম্পনের মতো শব্দ মুহূর্তে শরীরে আবার সেই প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
এটিকে বলা হয় ‘ট্রিগার’।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কম্পনে ঢাকার উঁচু ভবনগুলো বেশি দুলেছে। তাই যারা উচ্চতলার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, তাদের স্মৃতি আরও তীব্র হয়েছে।
ট্রমা কাটানোর উপায়: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
সাময়িক ভয় স্বাভাবিক, তবে এই অনুভূতি দীর্ঘ হলে অবশ্যই যত্ন প্রয়োজন।
মনোবিজ্ঞানী নাদিয়া নাসরিন কয়েকটি উপায় বলেছে।
ঘটনা নিয়ে কথা বলা: ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা চাপা রাখলে ভয় বাড়ে। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে মনের চাপ কমে।
অতিরিক্ত খবর দেখা কমানো: বিশেষ করে সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্প নিয়ে অপপ্রচার বা গুজব দেখবেন না। মনকে নিরাপদ রাখার জন্য তথ্যের উৎস বাছাই করতে হবে।
হালকা ব্যায়াম ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন: হঠাৎ উদ্বেগ বেড়ে গেলে ধীরে, গভীর শ্বাস নিলে শরীরের ‘স্ট্রেস হরমোন’ কমে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে এটি ভালো কাজ করে।
নিয়মিত ঘুম: ঘুমের অভাব উদ্বেগ বাড়ায়। তাই নিয়মিত, পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনে।
শিশুদের আশ্বস্ত করা: শিশুদের বলতে হবে ভূমিকম্প প্রাকৃতিকভাবে হয়, এবং সাধারণত বড় ক্ষতি হয় না। নিরাপদ জায়গায় থাকার সহজ নিয়ম তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে
প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য: যদি ভয় কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকে, ঘুমাতে সমস্যা হয়, বারবার মনে হয় কিছু একটা হবে, কাজকর্মে মন না বসে, তাহলে মনোবিজ্ঞানীর সাথে পরামর্শ করা জরুরি।
আরও পড়ুন
ভয়ের সিনেমা দেখে চিৎকার দেওয়ার কারণ