Published : 24 Jun 2026, 10:40 PM
খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের একটি সড়কে ঢালাইয়ের মাত্র তিন দিনেই হাতের চাপে উঠে যাচ্ছে পিচ। কোথাও কোথাও সামান্য টান দিতেই খসে পড়ছে কার্পেটিংয়ের আস্তরণ।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মঙ্গলবার বিকালে সড়কের সংস্কারকাজ বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও নিয়ম না মেনে কাজ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এলজিইডির খুলনা জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল ইসলাম সরদার বলেন, কয়রা উপজেলায় বর্তমানে কোনও উপজেলা প্রকৌশলী নেই। পাশের পাইকগাছা উপজেলার প্রকৌশলী অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এতে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিন ধরে মহারাজপুর ইউনিয়নের মাদারবাড়িয়া-রোনবাগ সড়কে পিচ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। তিন দিন আগে পিচের বিভিন্ন অংশ ওঠে যেতে শুরু করলে বাকি অংশে পিচ ঢালাইয়ের সময় এলাকাবাসী বাধা দেন।
সেইসঙ্গে সড়কের পুরনো কালভার্ট অপসারণ না করেই তার ওপর দিয়ে পিচ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় লোকজন সড়কের দুটি স্থানের কিছু অংশের পিচ তুলে ফেলেন।
মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জামাল ফারুক বলেন, সড়কের কাজ শুরুর পর থেকেই নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। স্থানীয় লোকজনের প্রতিবাদের মুখে সেই খোয়া অপসারণ করা হয়।
“এরপর দীর্ঘদিন ফেলে রাখা কাজ আবার শুরু হলেও ঢালাইয়ে খুব পাতলা করে পিচ দেওয়া হয়। পিচের নিচের অংশ পরিষ্কার না করেই ধুলাবালি ও মাটির ওপর ঢালাই করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে এলাকাবাসী বাধা দেন”, বলেন তিনি।
কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কার্যালয় থেকে জানা গেছে, পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একই প্যাকেজে মাদারবাড়িয়া উত্তর সীমানা থেকে রোনবাগ সড়কের এক কিলোমিটার উন্নয়ন, একটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ ও বেদকাশী এলাকার প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের মার্চে ‘মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুই কোটি ৬৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকার কাজটি পায়। কাজের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজের দায়িত্বে থাকা মো. হাসানের দাবি, এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। কাজে বড় ধরনের কোনও ত্রুটি নেই।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কয়রা উপজেলাজুড়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে চলমান একাধিক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। কোথাও সড়ক খুঁড়ে রাখা হয়েছে। কোথাও ইটের খোয়া কিংবা বালু ফেলে উধাও ঠিকাদার।
কয়রার বাসিন্দা সংবাদকর্মী ইউনুস আলী বলেন, উপজেলাজুড়ে এলজিইডির একাধিক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকলেও সংস্থাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোনো খোঁজ-খবর নেই। তারা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব কাজ পড়ে থাকায় বর্ষায় কাদা-পানি আর শুকনা মৌসুমে ধুলাবালু-দুই মৌসুমেই চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহান শিক্ষার্থী, রোগী, শ্রমজীবী মানুষ ও যানবাহন চালকরা।
কয়রা উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় থেকে জানা গেছে, কয়রা সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় মোড় থেকে ৪ নম্বর কয়রা গ্রাম পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়কের সংস্কারকাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত এ সড়ক সংস্কারে বরাদ্দ হয় এক কোটি ২৩ লাখ টাকা। কাজ পায় ‘মেসার্স রাকা এন্টারপ্রাইজ’।
কয়েক মাস সড়ক খুঁড়ে ইটের খোয়া ফেলার পর চলে যায় প্রতিষ্ঠানটি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চার বছর পেরিয়ে গেছে, এখনো সড়কটি পড়ে আছে বেহাল অবস্থায়।
মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বানিয়াখালী থেকে হড্ডা গ্রামের প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়কের অবস্থাও করুণ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ছয় কোটি ৪৯ লাখ টাকা। কাজ পায় ‘মোহাম্মদ ইউনুচ অ্যান্ড ব্রাদার্স’।

নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও সড়কটি খোঁড়াখুঁড়ির পর বালু ফেলে কাজ বন্ধ আছে।
আমাদী ইউনিয়নে পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২১ সালে হুদুবুনিয়া চান্নিরচক সড়কের দুই কিলোমিটার অংশ কার্পেটিং করার জন্য বরাদ্দ হয় এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা। কাজের দরপত্র পায় রাকা সিয়াম (জেভি) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
২০২১ সালের জুনে তারা কাজ শুরু করেন। কয়েক মাস রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির পর কাজ ফেলে চলে যান প্রতিষ্ঠানটির লোকজন। ২০২২ সালের ২৬ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সেই সময়সীমা পেরিয়ে প্রায় চার বছর হতে চললেও কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেই।
গিলাবাড়ি-গড়ইখালী জিসি সড়ক, বামিয়া আর অ্যান্ড এইচ-বাঁশখাতি-মালিখালী-বগা বাজার-নারানপুর সড়ক, হরিনগর-নকশা সড়ক ও বায়াল হারনিয়া মাদ্রাসা থেকে শ্রীফলতলা সড়কের কাজও বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন দুই দফায় প্রায় দশ বছর একই স্থানে দায়িত্ব পালন করায় একটি নিজস্ব ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘদিন উপজেলা প্রকৌশলী না থাকার সুযোগে তিনি একক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপসহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন।
এলজিইডির খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সরদার বলেন, কয়রাতে দীর্ঘদিন সংস্কার কাজ বন্ধ থাকা তিনটি প্রকল্প এর মধ্যে বাতিল করা হয়েছে। কাজ বন্ধ থাকা কিছু প্রকল্পে আবার টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে।
সেইসঙ্গে উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেনের নামে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।